somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিনোয়া আচেবের সাক্ষাতকার

৩০ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৪:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতি বছর অক্টোবর মাসে ম্যান বুকার অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের জন্য আয়ারল্যান্ড ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে প্রকাশিত ইংরেজি ভাষার উপন্যাসকে বেছে নেয়া হয়। এ পুরস্কারই সাধারণভাবে ম্যান বুকার প্রাইজ বলে পরিচিত। সালমান রুশদি, অরুন্ধতী রায়, কিরণ দেশাই এ বুকারের সূত্রেই আলোচনায় আসেন। রুশদি অবশ্য দুবার বুকার পান। প্রথমবার পান ম্যান বুকার প্রাইজ, পরেরবার ১৯৮১ সালে বুকার অফ দি বুকারস। ম্যান বুকার প্রাইজের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ পর্যন্ত বুকার পাওয়া সেরা বইটিকে বুকার অফ দি বুকার পুরস্কারে মনোনীত করা হলে সে পুরস্কার পায় রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন। এ দুরকম বুকারের বাইরে ২০০৫ থেকে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ নামে আরেকটি পুরস্কার চালু হয়েছে। এটি দ্বিবার্ষিক পুরস্কার। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বা অনূদিত বইয়ের জন্য এ পুরস্কারটি দেয়া হয়। প্রথমবার পুরস্কার পেয়েছিলেন আলবেনিয়ান লেখক ইসমাইল কাদারে। ২০০৭-এ পুরস্কার পেলেন চিনোয়া আচেবে। আগামীতে আরেকটি নতুন বুকার চালু হতে যাচ্ছে ম্যান এশিয়ান বুকার নামে। এশিয়ান ভাষাগুলোতে লেখা উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদের জন্য এ পুরস্কার দেয়া হবে।
নাইজেরিয়ান লেখক ও কবি চিনোয়া আচেবের জন্ম ১৯৩০ সালে। বিশ শতকের সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। পুরো নাম আলাবার্ট চিনোয়ালুমগু আচেবে। তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে থিংস ফল অ্যাপার্ট (১৯৫৮) বাংলাসহ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চিনোয়া বিশেষভাবে আফ্রিকান রাজনীতি নিয়ে উৎসাহী। নেলসন ম্যানডেলা আত্মস্মৃতিতে আচেবে সম্পর্কে লিখেছেন, কারাগারের দেয়ালগুলো তার সান্নিধ্যে ভেঙে পড়তো। তার নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার পেছনে জোসেফ কনরাডের সমালোচনা ও মুখ্যত পশ্চিমি সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনাকে দায়ী করা হয়। ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ আফ্রিকান সাহিত্যের সর্বাগ্রগণ্য এ সাহিত্যিককে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। তার বুকার পাওয়া উপলক্ষে প্যারিস রিভিউয়ে প্রকাশিত তার সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এখানে সঙ্কলিত হলো।

আমাদের কি আচেবে পরিবার, ইগবো গ্রামে বেড়ে ওঠা, আপনার প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষা ও লেখালেখি বিষয়ে বলবেন?

আমার ধারণা, আমাকে যে বিষয়টি চালিত করেছিল সেটা হলো গল্পের প্রতি আগ্রহ। সব সময় গল্প লেখার বিষয়টি নয়, কারণ এই ক্ষেত্রে লেখাটা কার্যকর কিছু ছিল না। ফলে সেটা নিয়ে ভাবার অবকাশও ছিল না। কিন্তু আমি জানতাম গল্প আমার ভালো লাগে। বাড়িতে আমার মা-বা-বোনরা যে গল্পগুলো বলতো, বিশেষ করে কচ্ছপের সেই গল্পটা। আলাপ আলোচনা থেকে, বাবার কাছে কোনো অতিথি এলে কাছাকাছি বসে বা ঘুরঘুর করে তাদের আলাপ শুনতাম। সেখান থেকে গল্প সংগ্রহ করতাম। স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর সেখানে পড়া গল্পগুলোও পছন্দ হলো। সেগুলো অন্য রকম হলেও আমার পছন্দসই ছিল। নাইজেরিয়ার আমাদের অংশে আমার বাবা-মা স্পষ্টতই ক্রিশ্চিয়ান হিসেবে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। শুধু ধর্মান্তরিত হওয়া নয়, আমার বাবা ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক ও ধর্মশিক্ষক। তিনি ও মা মিলে গসপেল প্রচারের জন্য ইগবোল্যান্ডে ৩৫ বছরে জুড়ে সফর করেছেন। আমি ছিলাম বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন আমার বাবা অবসর নেন এবং সপরিবারে নিজের পৈতৃক বাড়িতে চলে আসেন। স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর আমি পড়তে শুরু করলাম এবং অন্য দেশের অন্যরকম গল্পের মুখোমুখি হলাম। আমার একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম, কোন ধরনের ব্যাপারগুলো আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এমনকি এলোমেলো ব্যাপারগুলোও আমার কাছে আকর্ষণীয় ছিল। যেমন আফ্রিকার এক জাদুকর বাস করতেন, তিনি একটা বাতির খোজে চায়নায় চলে গেলেন। এগুলো আমাকে আকর্ষণ করতো কারণ বিষয়গুলো ছিল দূরবর্তী এবং খানিকটা বায়বীয়। আরো বড় হলে আমি অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাসগুলো পড়তে শুরু করলাম। আমার মনে হতো, আমি ওই কাহিনীগুলোর ভালো সাদা মানুষদের হাতে নিহত হওয়া বর্বর লোকদের দলভুক্ত। অজান্তেই আমি সাদা লোকদের পক্ষ নিয়ে ফেলতাম। তারা ছিল ভালো ও চমৎকার ! তারা ছিল বুদ্ধিমান। অন্যরা সে রকম ছিল না, তারা ছিল বোকা ও কুৎসিত। নিজেদের গল্প না থাকার কারণে এভাবেই আমি এই ভয়ঙ্কর ব্যাপারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। একটা দারুণ প্রবাদ আছে, যতোদিন সিংহদের নিজেদের ইতিহাসবিদ থাকবে ততোদিন শিকারের ইতিহাস মহত্ত্ব পেতেই থাকবে। অনেক পরে এগুলো আর আমার কাছে আসেনি। একদিন আমি অনুধাবন করলাম, আমাকে লেখক হতে হবে। আমাকে সেই ইতিহাসবিদ হতে হবে। এটা একজন লোকের কাজ নয়। কিন্তু এটা এমন কিছু যা আমাদের করতে হবে। যেন শিকারের গল্পটি শিকারিদের বীরত্বের পাশাপাশি শিকারের মর্মবেদনা ও যাতনাকে প্রকাশ করে।

আপনি ইবাদান ইউনিভার্সিটির প্রথম গ্র্যাজুয়েটদের একজন ছিলেন। সেখানকার প্রথমদিকের দিনগুলো কেমন ছিল? আপনি সেখানে কি পড়েছেন? এটা কি আপনার লেখালেখিতে সাহায্য করেছিল?

অতীতের দিকে তাকালে মনে হয়, ইবাদান ছিল বিশাল এক প্রতিষ্ঠান। একভাবে এটি ঔপনিবেশিকতার বৈপরীত্যগুলো প্রকাশ করতো। কারণ, এটি নাইজেরিয়ায় বৃটিশ শাসনের শেষদিকে ইউনিভার্সিটি কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারা যদি ভালো কিছু করে থাকে তবে ইবাদান সেগুলোর অন্যতম। এটি শুরু হয়েছিল লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধীন একটি কলেজ হিসেবে। কারণ, বৃটিশদের অধীনে ইউনিভার্সিটি বা এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতো না। কোনো কিছুর অঙ্গ হিসেবে একে প্রতিষ্ঠা করা হতো। বিশেষ একটা সময় অন্য একটা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকতে হতো। আমরা ইবাদান ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লন্ডনের ছাত্র ছিলাম। এভাবে সে দিনগুলোতে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার অন্যতম প্রতীক হিসেবে একে পূর্ণাঙ্গ ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করা হয়।
আমি বিজ্ঞান দিয়ে শুরু করে ইংরেজি, ইতিহাস ও ধর্ম পড়েছিলাম। আমার কাছে এই বিষয়গুলো উত্তেজনাকর ও দরকারি মনে হয়েছিল। ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনাটা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয মনে হয়েছিল। কারণ এতে আমরা শুধু ক্রিশ্চিয়ান ধর্মতত্ত্ব নয়, পশ্চিম আফ্রিকান ধর্মগুলো সম্পর্কেও পড়াশোনা করেছিলাম। আমার সেখানকার শিক্ষক ড. পারিন্দার ছিলেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি পরে লন্ডন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমিরেটাস হয়েছিলেন। তিনি পশ্চিম আফ্রিকার দাহোমেতে ব্যাপক গবেষণা করছিলেন। প্রথমবারের মতো আমি আমার পদ্ধতিগুলো তার পাশাপাশি রেখে পরখ করতে পেরেছিলাম যা রীতিমতো উত্তেজনাকর একটা ঘটনা ছিল। ওই বিভাগে জেমস ওয়ালেস নামে আরেকজন ভিন্ন ধাচের প্রফেসরের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমাদের কাছে আসার আগে তিনি পঞ্চম জর্জের যাজক, বিবিসি যাজক এ রকম নানা ক্ষমতাধর স্থানে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি খুব করিৎকর্মা প্রচারক ছিলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমরা হয়তো তোমাকে তোমার যা প্রয়োজন বা তুমি যা চাও তা শেখাতে পারবো না। আমরা যা জানি তাই শুধু শেখাতে পারবো। আমার কথাটা দারুণ মনে হয়েছিল। এটা ছিল আমার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষা। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আমার প্রয়োজনীয় কোনো শিক্ষাই ওখান থেকে আমি পাইনি। আমাকে নিজের রাস্তা নিজেই বের করতে হয়েছিল। আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তার সেরা উদাহরণ ছিল ইংরেজি বিভাগ। আমাদের মধ্যে কেউ লেখক হবে এটা শুনলে লোকে হয়তো হাসতো। প্রকৃতপক্ষেই এটা তাদের মনে হতো না। মনে আছে, একবার এক অনুষ্ঠানে ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। একটা ছোট নোটিশ টাঙানো হলো : বিভাগীয় পুরস্কারের জন্য দীর্ঘ ছুটির মধ্যে একটা ছোট গল্প লেখো। আমি আগে কোনোদিনই ছোটগল্প লিখিনি। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর ভাবলাম, ভালো কথা কেন লিখবো না। আমি একটা গল্প লিখে জমা দিলাম। বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। একদিন নোটিশ বোর্ডে গল্প লেখা প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা করা হলো। বলা হলো, কোনো পুরস্কার দেয়া হবে না। কারণ কোনো গল্পই মানসম্মত হয়নি। তারা আমার নাম উল্লেখ করে বলেছিল, বিশেষভাবে এ গল্পটির কথা বলা যায়। ওইসব দিনের এবাদান এমন ছিল না যে এক হাতের মুঠোয় নস্যি নিয়ে আপনি একটা নাচ নাচলেন। ফলে এবাদান যখন বললো আপনার কথা উল্লেখ করা দরকার তো আপনি বিপুলভাবে প্রশংসিত হলেন।
যিনি এই পুরস্কারের আয়োজন করেছিলেন সেই লেকচারারের কাছে আমি গিয়ে বললাম, আপনি বলেছেন আমার গল্পটি ঠিক ভালো ছিল না তবে এটা কৌতূহল উদ্দীপক ছিল। এখন বলুন এটার সমস্যা কি? তিনি বললেন, সমস্যাটা ফর্মে। এর কাঠামোটা ভুল। আমি বললাম, আপনি এ ব্যাপারে আমাকে বলতে পারেন? তিনি জানালেন বলতে পারেন, কিন্তু এখন নয়। আমি টেনিস খেলতে যাচ্ছি। পরে আমাকে মনে করিয়ে দিও, আমি তোমাকে বলবো। প্রত্যেক দিন যখনই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে আমি জিজ্ঞাসা করেছি আমরা কি ফর্ম নিয়ে কথা বলতে পারি। তিনি বলেছেন, এখন নয়। পরে কথা বলবো। অনেক পরে তিনি আমাকে দেখে বললেন, আমি তোমার গল্পটি আবার পড়েছি। আসলে এতে কোনো সমস্যা নেই। এই হলো ঘটনা! ছোটগল্প বিষয়ে ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট থেকে আমি এটুকুই শিখেছি। প্রকৃত পক্ষেই নিজের রাস্তাটা নিজেকেই বের করতে হয়।

ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পর আপনি নাইজেরিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পরেশনে যুক্ত হলেন।

প্রফেসর ওয়েলসের হস্তক্ষেপেই এটা হলো। তিনি ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে আমার জন্য একটা স্কলারশিপ জোগাড় করতে গিয়ে নাকাল হলেও কাজ হলো না। এর পরের জায়গা ছিল ব্রডকাস্টিং ডিপার্টমেন্ট। বিবিসির অনেক লোক নিয়ে এটি নাইজেরিয়ায় নতুন কাজ শুরু করছিল। এভাবেই আমি এতে ঢুকলাম। এমন ব্যাপার নয় যে আমি সম্প্রচার নিয়ে ভাবছিলাম। কলেজ শেষ করার পর কি করবো এ নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এখনকার ছাত্রদের নিয়ে ভাবতে গেলে আমি অবাক হই। প্রথম দিন থেকেই তারা জানে তারা কি হতে যাচ্ছে। আমরা জানতাম না। শুধু তীরে ভিড়ে গিয়ে ছিলাম। আমরা শুধু জানতাম, কিছু একটা হবে। আমরা সংখ্যায় বেশি ছিলাম না। এখন এটা করে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। এভাবেই ব্রডকাস্টিংয়ে যুক্ত হলাম। আর আবিষ্কার করলাম, যেখানে আমি কাজ করি সেই স্পোকেন ওয়ার্ড বিভাগ, টক ডিপার্টমেন্ট পছন্দসই জায়গা। আমি যেমন চেয়েছিলাম তেমন জায়গাই এটা। স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা করা। লোকে কথা বলার পর সেটা কেটে ছোট করা। আমি সম্পাদনা ও স্টোরি ছোট করার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। নতুন স্বাধীনতা পাওয়া দেশে দ্রুত সবকিছু ঘটছিল। আমি দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে এই উত্তেজনাকর জায়গা থেকে ম্যানেজমেন্টে চলে গেলাম।

আপনার প্রথম দুই বইয়ের নাম থিংস ফল অ্যাপার্ট ও নো লঙ্গার অ্যাট ইজ আধুনিক আইরিশ ও আমেরিকান কবিদের কবিতা থেকে নেয়া। অন্য কালো লেখকরা, যেমন বিশেষ করে পাওলে মার্শাল ইয়েটস থেকে ঋণ নিয়েছেন। আমার ধারণা, ইয়েটস ও এলিয়ট আপনার প্রিয় কবিদের তালিকায় আছেন।

ঠিক। এর থেকে আমি বিশেষ কিছু বানাতে পারিনি। অন্য কোনো কিছুর চেয়ে দেখানোর ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি যেমনটা আপনাকে বলেছি আমি একটা সাধারণ ডিগ্রি নিয়েছিলাম। ইংরেজি ছিল এর একটা অংশ। আর এর কিছু নমুনা তো দেখাতে হবে। কিন্তু আমি ইয়েটসকে পছন্দ করতাম। সেই পাগলাটে আইরিশম্যান। আমি সত্যি তার ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে পছন্দ করতাম। তার প্রবাহমানতা, তার কোলাহলময় আইডিয়াগুলোকে একজন কবির জন্য উপযুক্ত মনে হতো আমার কাছে। অনুরাগের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবসময় সঠিক অবস্থানে। তার মাথা হয়তো ভুল জায়গায় গেছে, কিন্তু তার হৃদয় সবসময় সঠিক অবস্থানে ছিল। তিনি দারুণ কবিতা লিখেছেন। যে জাদুকরের কথা বলেছিলাম, তার কবিতা আমার কাছে ছিল ও রকমই। মাথায় যা কিছু আসতো, যা কিছু ভালো শোনাতো সে লাইনগুলোই আমি সাজাতে চাইতাম। ইয়েটস আমার কাছে সে ধরনের এক ব্যক্তি ছিলেন। পরে আমি চক্র তত্ত্ব বা সভ্যতার চক্র বিষয়ক তত্ত্ব আবিষ্কার করলাম। যখন বইয়ের নাম খোজার দরকার হলো তখন এ নিয়ে আমি বেশি কিছু ভাবিনি। থিংস ফল অ্যাপার্ট ফ্রেজটি আমার কাছে যথার্থ মনে হলো।
টি এস এলিয়টের ব্যাপারটা আলাদা ছিল। এবাদানে আমাদের তার সম্পর্কে পড়তে হয়েছিল। তার এক ধরনের যাজকীয় বিদ্যা ও কুশলতা ছিল। কিন্তু যে কবিতা থেকে আমি নো লঙ্গার ইজ লাইনটা নিয়েছিলাম সেটা ছিল বাইবেলের তিন জ্ঞানী ব্যক্তিকে নিয়ে। আমার ধারণা, এটা ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি। এই ব্যক্তিরা তাদের দেশ ছেড়ে গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছিল। তারা আর স্বস্তির মধ্যে ছিল না। আমার ধারণা, এটা দারুণ ব্যাপার। সামান্য কথা দিয়ে বড় কোনো চলমান ও বৃহত্তর ব্যাপারকে বোঝানো যায়। এর সব কিছুই এতে ছিল। কিছু আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন প্রথম দুটির পর আমি এভাবে আর নেইনি।

আমি একবার শুনেছিলাম কিভাবে আপনি ইংরেজ প্রকাশক অ্যালান হিলের কাছে থিংস ফল অ্যাপার্টের পা-ুলিপি পাঠিয়েছিলেন।

সে এক বিশাল কাহিনী। পা-ুলিপির প্রথম অংশটি তো প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছিল। ১৯৫৭ সালে আমাকে বৃত্তি দিয়ে লন্ডনে পাঠানো হলো বিবিসিতে কয়েক মাস পড়াশোনা করার জন্য। আমার সঙ্গে থিংস ফল অ্যাপার্টের পা-ুলিপি ছিল, আমি ভেবেছিলাম সঙ্গে নিয়ে যাই। ওখানেই শেষ করবো। আমার এক বন্ধু, আমরা দুজন নাইজেরিয়া থেকে ওখানে গিয়েছিলাম, বললো তুমি এটা মি. ফেলপসকে দেখাচ্ছো না কেন? বিবিসির ইন্সট্রাকটরদের একজন গিলবার্ট ফেলপস ছিলেন ঔপন্যাসিক। আমি বললাম, কি বলো। না। এভাবেই কিছু সময় গেল। ঘটনাক্রমে আমাকে কাজটা করতে বাধ্য করা হলো। আমি পা-ুলিপিটা ফেলপসের কাছে দিলাম। তিনি বললেন, ভালো, ঠিক আছে। এখন কেউ আমাকে পা-ুলিপি দিলে আমি যেমন করি সেভাবে। আসলে তিনি খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। কেনইবা হবেন? তারপরও তিনি সাদরে এটি নিলেন। আমার বাইরে তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন, এটা আকর্ষণীয়। তিনি এমনভাবে ব্যাপারটা অনুভব করেছিলেন যে, এক শনিবার আমাকে খুজে বের করে তিনি এটা বলেছিলেন। আমি লন্ডনের বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলাম। তিনি আমার হোটেলে ফোন করে বলেছিলেন, ফিরলে যেন তাকে ফোন দেই। কথাটা শুনেই আমি ভূপাতিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বললাম, হয়তো তার ভালো লাগেনি। কিন্তু যদি তার ভালো না লাগে তবে ফোন দেবেন কেন? তাহলে অবশ্যই তার ভালো লেগেছে। যাহোক আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। আমি লন্ডনে ফিরলে তিনি বললেন, এটা দারুণ। তুমি কি চাও আমি এটা আমার প্রকাশককে দেখাই? আমি বললাম হ্যা। কিন্তু এখনই নয়। কারণ আমার মতে, কাঠামোটা এখনো ঠিকঠাক হয়নি। তিনটি পরিবারের ইতিকথা বলতে গিয়ে আমি প্রথম খসড়ায় খুব বেশি পটভূমি তৈরি করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, কার্যকর কিছু করতে হলে আমাকে আরো কিছু যোগ করতে হবে। মি. ফেলপসকে বললাম, ধন্যবাদ। কিন্তু এটা আমি নাইজেরিয়ায় ফিরিয়ে নিতে চাই। সেটাই আমি করেছিলাম।
ইংল্যান্ডে থাকার সময় আমি টাইপিং এজেন্সিগুলোর বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। শিখেছিলাম, ভালো মনোভাব তৈরি করার জন্য পা-ুলিপিটাকে সুন্দরভাবে টাইপ করে দিতে হয়। তাই বোকার মতো আমি নাইজেরিয়া থেকে আমার হাতে লেখা পা-ুলিপিটির একমাত্র কপিটা আমি লন্ডনের একটা এজেন্সির কাছে পার্সেল করে দিয়েছিলাম। এ এজেন্সির বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল স্পেকটেটর পত্রিকায়। একটি পা-ুলিপি এসেছিল সাভানার এন্থহিল থেকে, পাঠিয়েছিলেন চিনোয়া আচেবে। ফিরতি চিঠিতে তারা জানালো, পা-ুলিপির জন্য ধন্যবাদ। এর মজুরি ৩২ পাউন্ড। দুই কপি পা-ুলিপির জন্য এই টাকাটা কাজ শুরু আগে তাদের হাতে পৌছাতে হবে। আমি বৃটিশ পোর্টালের মাধ্যমে এই লোকদের কাছে ৩২ পাউন্ড পাঠালাম। কিন্তু আর কোনো খবর এলো না। সপ্তাহ আর মাস চলে যেতে থাকলো। আমি তাদের চিঠি লিখতেই থাকলাম আর লিখতেই থাকলাম। কোনো উত্তর নেই। কোনো একটি শব্দ নেই। আমি শুকিয়ে যাচ্ছ
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা ভয়ংকর

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪৯



বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!

শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:০১


জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭



জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাংগুক অচলায়তন

লিখেছেন মাসুদ রানা শাহীন, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৯


ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।

ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।

নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতিসত্তার পরিচয়ের বাজার

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:২১

ইতিহাসে কোনো আদর্শ সত্যিকার অর্থে মরে না। সে শুধু নাম বদলায়, পরাজিত আদর্শেরও পুনর্জন্ম হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ একটি আসনও পায়নি। কিন্তু সেই রাতে মুসলিম লীগ মরেনি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×