somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মাহফুজ
আমি হচ্ছি কানা কলসির মতো। যতোই পানি ঢালা হোক পরিপূর্ণ হয় না। জীবনে যা যা চেয়েছি তার সবই পেয়েছি বললে ভুল হবে না কিন্তু কিছুই ধরে রাখতে পারিনি। পেয়ে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে।

অমৃত ভান্ডারে রুনু

১২ ই আগস্ট, ২০১৬ সকাল ৭:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



"অমৃত ভাণ্ডারে রুনু"
রুনু আমার হাত ধরে বসে আছে। কোন কথা বলছেনা। আমিও চুপ করে বসে আছি। কেন জানি মনে হচ্ছে এই নীরবতা ভাংগার অধিকার আমার নেই।
গাছের ডালে একটা শালিক কোত্থেকে একটা পোকা ধরে এনেছে। এক পা দিয়ে ধরে রেখেছে কিন্তু খাচ্ছেনা। তীক্ষ শব্দ করে ডাকছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তারপর আরেকটি শালিক আসলো সেখানে। প্রথম শালিকটির ডাকাডাকি আর খাবার নিয়ে অপেক্ষার কারণ বুঝা গেল। রুনুর চোখ দেখলাম একই ঘটনা অবলোকনে ব্যস্ত। দ্বিতীয় শালিক উপস্থিত হতেই সে আমার আমার হাতে একটু চাপ দিল। ইচ্ছে করেই নাকি অজান্তে জানিনা। জোড়া শালিক দেখলে নাকি ভালো হয়। কি ভালো হয় আমার জানা নেই। কিংবা কাদের ভালো হয় তাও জানা নেই। আমরা তো প্রেমিক প্রেমিকা, আমরা জোড়া দেখেছি বলে কি বিয়ে হয়ে যাবে? দ্বিতীয় শালিক না আসলে মনে হয় ব্রেকাপ হয়ে যেত। হাহাহা। নীরবতা ভেংগে বেশ জোড়েই হেসে দিলাম। রুনু বিরক্ত হল, অবাকও হল খুব। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-কি ব্যাপার!.
রুনু কপাল কুঁচকালে আমার হাসি পায়। মনে হয় ওকে বলেছি- এই তুমি হিপপপটেমাস উচ্চারণ কর। আর রুনু চেষ্টা করেও পারছেনা। ছোটবেলা নাকি ওকে স্কুলে এ নিয়ে অনেক যন্ত্রণা পেতে হয়েছে। জলহস্তীর ইংরেজি কি জিজ্ঞেস করলে সে হিপ বলেই থেমে যেত। আর পারতনা। স্কুলের অনেকেই হিপ বলে ক্ষেপাত। আরেকটা রুনু ছিল স্কুলে। সেই রুনুকে রুনুই ডাকা হত আর এই রুনুকে বলা হত হিপরুনু। কি অদ্ভুত, কি কঠিন হিপরুনু নাম। মিনি হিপপপটেমাস যেন।

কল্পনার টাইমমেশিন ধাবিয়ে আমি রুনুর স্কুল জীবনে চলে গিয়েছিলাম। রুনুর ধমক শুনে ফিরে এলাম বাস্তবে।
-ওই কি হইছে, কথা বলছনা কেন?
-নাহ তেমন কিছু না।
-তেমন কিছু না হলে যেমন কিছুটা কি?
-না মানে শালিক আর জলহস্তী।
-কি!
-আরে কিছু না, হঠাত মনে হল তোমার হিপপপটেমাসের কথা।
-শালিক দেখে হিপপপটেমাসের কথা মনে পড়ল? কি বল এসব পাগল হয়ে গেছ নাকি!
-পাগল হয়ে যাইনি। জোড়া শালিক দেখে ভাবনায় পড়েছি।
-কিসের ভাবনা?
-জোড় শালিক দেখলে কি হয় সে ভাবনা।
-তুমি জাননা জোড়া শালিক একসাথে বসে দেখলে ভাগ্য ভালো হয়, ভালো কিছু ঘটে?
-জানি তবে বিশ্বাস করিনা।
-তোমার বিশ্বাসে কিছু আসে যায়না।
মুখ গোমড়া করে বলল রুনু।
আমি আর কিছু বলতে গেলামনা। হীতে বিপরীত হতে পারে।
-আমি উঠব।
আচমকা ঘোষণা দিল রুনু। এই মেয়ের একটা বিরাট সমস্যা। অল্পতেই অভিমান উপচে পড়ে। রাগ হোক অভিমান হোক উনার এক কথা। আমি উঠব, বাসায় যাব।
-রাগ করেছ?
-নাহ আমি বাসায় যাব।
-জোড়া শালিকের কি হবে তাহলে?
-জোড়া শালিকের কি হবে মানে!
-চিরাচরিত কথাটা মিথ্যে হয়ে যাবেনা?
-এত প্যাঁচাও কেন তুমি সবকিছু? পরিষ্কার করে বল।
-মানে এইমাত্র তুমি বললে জোড়া শালিক দেখলে ভালো হয়। অথচ তুমি রাগ করে চলে যাচ্ছ। এটা কোন দিক দিয়ে ভালো হচ্ছে?
আমার কথা শুনেই রুনু খিলখিল করে হেসে উঠল। মেয়েটার এই হাসিটা সুন্দর। শুধু সুন্দর বললে ভুল হবে। অতি সুন্দর, ভয়াবহ রকম সুন্দর। ভয়াবহ সুন্দর জিনিসগুলোর ইতিহাস কষ্টে ভরপুর থাকে। ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিল হেলেনের সৌন্দর্যর জন্যে। ক্লিয়পেট্রাকে নিয়েও গল্পের শেষ নেই। হালের প্রিন্সেস ডায়ানার সৌন্দর্য নিয়েও হয়েছে কতকিছু। রুনুর হাসিতে ঢাকা শহর ধ্বংস হবেনা, রুনুর পরিণতি প্রিন্সেস ডায়ানার মত হবার সম্ভাবনাও নেই। তবে ওর অস্তিত্বহীনতা আমাকে নি:স্ব করে উড়িয়ে নিয়ে যাবে ট্রয়ের ধুলোবালির মত।

রুনুর হাসি থামাতে বলে ওকে জিজ্ঞেস করলাম-আচ্ছা আমার সাথে একটা চুক্তি করবে?
-কি চুক্তি?
-আগে বল করবে কি না?
-চুক্তিতে কে কি পাবে, কি শর্ত না জেনে করব কিভাবে?
-তুমি চাইলে আমার প্রাণটা তোমার কাছে বন্ধক দেব বিনিময়ে তোমার হাসিটা শুধু আমার জন্যই বরাদ্দ করতে হবে। বল রাজি?
-হুমম রাজি, তবে বিনিময়ে তোমার প্রাণ আমি নেবনা। ছোট একটা শর্ত আছে।
-কি সেটা?
-আমার হাসিটা শুনার জন্য, আমার হাসিটা দেখার জন্য আজীবন পাশে থাকতে হবে। বার বার, হাজার লক্ষবার বলতে হবে, রুনু তোমার হাসিটা সুন্দর, তোমার হাসির পাহারাদার হয়ে থাকব আমি।
-হুমম আমি রাজি।
-আমিও রাজি।
-ওকে ডিল?
-ইয়েস ডিল।
তারপরেই রুনু আমাকে জড়িয়ে ধরলো, মনে হল যেন আমি এখনি কোথাও চলে যাব, সে সমস্ত শক্তি দিয়ে আগলে রাখবে আমায়। বুকের মাঝে ভেজা উষ্ণতা অনুভব করলাম। মেয়েটা কেঁদে নিজের চোখ আর আমার বুক ভাসাচ্ছে।অনেক কষ্টে ওকে ছাড়ালাম।
-ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে আমার, চল কিছু খাই।
-কোথায় খাবে?
-হোটেল শেরাটনে।
রুনু আবার হেসে উঠল, আমার ক্ষুধা যেন কিছুটা কমে গেল।
-তুমি কখনো খোলা আকাশের নীচে লাঞ্চ বা ডিনার করেছ?
-পিকনিকে অনেক করেছি।
-আরে পিকনিক না এমনি।
-নাহ, করিনি।
-এক জায়গায় নিয়ে যাব তোমাকে যদি তোমার ঘৃণা না লাগে।
-কোথায়?
-শাহবাগ মোড়ের কাছেই।
-ওখানে কি খোলা আকাশের নীচে রেস্টুরেন্ট আছে?
-না, বসার জায়গাও নেই কিন্তু ক্ষুধা আছে বেসুমার আর আছে ক্ষুধা মিটানো অসংখ্য নিষ্পাপ অনুভূতি।
-আবার প্যাঁচাচ্ছ?
-আরে না, আসলে ওখানে ফুটপাতে দিনমজুর আর খুব অল্প আয়ের মানুষেরা খায়। আসা যাওয়ার পথে প্রায় দেখি। তুমি বিশ্বাস করবেনা রুনু, একেক লোকমা ভাত যখন ওরা মুখে দেয় মনে হয় অগনিত সুখ চিবিয়ে খাচ্ছে। ওদের মুখয়ব দেখে মনে হয় অমৃত খাচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছে হয় একদিন ওদের সাথে খাই কিন্তু একা ভাল্লাগেনা। তুমি যাবে আমার সাথে?
আমাকে অবাক করে দিয়ে রুনু নীলক্ষেতের দিকে হাটা শুরু করলো। বলল-চলো, সামনে গিয়ে রিকসা নেব তারপর সোজা তোমার শাহবাগ অমৃত ভাণ্ডারে।
-অমৃত ভাণ্ডার, বাহ বেশ সুন্দর নাম দিয়েছ তো।
♦♦♦♦
মাত্র দুপুর একটা বাজে। খদ্দেররা এখনো আসা শুরু করেনি ঠিকমতো। দুই চারজন আছে খাবারের অপেক্ষায়। এমন সময় আমি হাজির হলাম রুনুকে নিয়ে। একজন মহিলা অমৃত ভাণ্ডারের সার্বিক দায়ীত্বে। কোন ওয়েটার নেই, ম্যানেজারও নেই।
-খালা আজ কি রান্না করেছেন?
-ক্যান বাবা, খাইবেন নাকি?
-খাব বলেই তো সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে আসলাম। সাথে করে মেহমানও নিয়ে আসছি , দেখেন।
মহিলা সহ সবার নজর ঘুরে গেল রুনুর দিকে। এক খদ্দেরের লুংগি ছিল হাটুর উপরে সে জলদি তা ঠিক করল, আরেকজন কান চুলকাচ্ছিল দিয়াশলায়ের কাঠি দিয়ে। সেও কাঠি ফেলে রুনুর দিকে তাকালো। রুনু বেশ অস্বস্তিতে পড়লো। এ যেন অতিথিশালায় নতুন অতিথির পরিচিতি পর্ব। রুনু কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করল আমার দিকে তাকিয়ে।
-বাজান, মেহমান নিয়া আইছেন ভালা করছেন কিন্তু এগুলা কি আফনেরা খাইতে পারবেন?
-কেন পারবনা, অবশ্যই পারব। খাবার আইটেম কি বলেন।
-আইটেম হইতাছে, চিংড়ি ভর্তা, ডাইল, ছোট মাছের ঝোল।
-ওয়াও! আর কি চাই। দেন দেন তাড়াতাড়ি দুই প্লেট দেন।
আমাদের খাওয়া শুরু হল। আমাদের বসার জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটা ইংরেজি পত্রিকা ছিড়ে দুজনকে দেয়া হয়েছে। নামটা খোঁজে পাইনি।
আমার খেতে সমস্যা হচ্ছেনা কিন্তু ছোট মাছের ঝোলে ঝাল একটু বেশী মনে হয়। রুনুর চোখে জল দেখছি।
-সমস্যা হলে খেয়না, এই নাও পানি।
ঢক ঢক করে অর্ধেক গ্লাশ পানি খেয়ে রুনু মুখে করুণ হাসি ফুটিয়ে বলল-না, না ঠিক আছে।
কৃতজ্ঞতায় আমার নিজের চোখেই পানি চলে এসেছে। একমাত্র আমাকে খুশী করতেই মেয়েটা এই অনভ্যস্ত পরিবেশে দিনমজুরদের সাথে খাচ্ছে। নিজের বাসায় হয়ত চাকর বাকরদের জন্যেও আলাদা বাবুর্চি আছে কে জানে। ওর পারিবারিক অবস্থা নিয়ে কখনোই আলাপ হয়নি তবুও মনে হয় ও সাধারণ পরিবারের কেউ না। মেয়েটা আসলেই বোকা। বোকা না হলে আমার সাথে প্রেম করতনা। আমাকে খুশী করার জন্য এভাবে খোলা আকাশের নীচে বসে ছোটলোকদের সাথে খেতনা। হঠাৎ নিজেকে অপরাধী মনে হল। আচ্ছা আমি কি মেয়েটাকে আমার খেয়াল খুশীমত চালিয়ে কষ্ট দিচ্ছি?
-রুনু?
গুরুগম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখি পাওয়ারফুল চশমা চোখে একলোক রুনুকে ডাকছেন প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে মাথা বের করে। রুনু যেন মানুষটাকে দেখে কেঁপে উঠল। হাতের প্লেটটা নামিয়ে গ্লাশটা হাতে নিল পানি খাবে বলে।
-গাড়ীতে পানি আছে, তাড়াতাড়ি আস।
ভদ্রলোক হাঁক ছাড়লেন আবার।
রুনু পানি না খেয়ে অসহায় ভাবে আমার দিকে একবার তাকিয়ে গাড়ীতে গিয়ে উঠল। বুঝলাম লোকটা রুনুর বাবা। ইনি যেই সেই বাবা না অতি বাবা টাইপ বাবা। রুনুর মত উনারও কপাল কুঁচকায়। মনে হয় জেনেটিকলি কপাল কুঁচকে যাওয়ার রীতি তাদের। রুনুর মায়েরও কপাল কুঁচকায় কি না কে জানে।
♦♦♦♦
রাত প্রায় দুইটা বাজে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি, ঘুম আসছেনা। দুদিন আর রুনুর সাথে কোন যোগাযোগ হলনা। মোবাইল সুইচ অফ। ওর বাবা মোবাইল কেড়ে নিয়েছেন হয়ত। সেই সাথে কেড়ে নিয়েছেন আমাদের সেদিনের অলিখিত চুক্তিটি। জোড়া শালিকের কথা মনে পড়ে গেল আমার। জোড়া শালিক এখনো একসাথে আছে কি না জানার উপায় নেই তবে ওদের দেখে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।
♦♦♦♦
-এই ছেলে ঘুম থেকে উঠ।
কর্কশ কণ্ঠ শুনে প্রথমে মোবাইলে সময় দেখলাম। ৮ টা ৪৪ বাজে। চোখ কচলাতে কচলাতে তাকিয়ে দেখি আমার বিছানার সামনে চেয়ারে এক লোক বসে আছে। লোকটার মাথায় চুল নেই বললেই চলে। লোকটা পকেট থেকে বের করে তার চশমা চোখে দিল। আমার ঘরের আলো খুব কম। আমি আলো পছন্দ করিনা। তাই "আলো, আলো, আলো কখনো আমার হবেনা" গানটা অনেক পছন্দ। লোকটা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। নিজেকে গিনিপিগ মনে হচ্ছে। লোকটার চাহনীতে নিজেকে ছারপোকা বা পিঁপড়ে সদৃশ কীট মনে হতে লাগল। হঠাৎ চিনে ফেললাম লোকটা কে? রুনুর বাবা। যেই সেই বাবা না অতি বিশেষ বাবা তিনি। সাত সকালে একা একা আমার বাসায় কেন আসলেন তিনি। কথাটা ভেবে আমার নিজের কপালই কুঁচকে গেছে নিশ্চিত। আরো নিশ্চিত হতে যে জায়গাটা কুঁচকে যায় সেখানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করলাম। নাহ, ঠিকই তো আছে। কুঁচকে যায়নি।
-কপালে কি হয়েছে?
-জ্বী না, কুঁচকেছে কি না দেখছিলাম।
-কি!
রুনুর বাবা অবাক হলেন।
-বিরক্ত হলে বা টেনশনে থাকলে রুনুর কপাল কুঁচকে যায়, আপনারও যায়। আমার একই রকম হয় কি না দেখলাম।
-তুমি যে চরম মাত্রার একটা মানসিক রোগী জান?
-আপনি কি সাইক্রিয়াটিক?
-স্টুপিড, আমি সাইক্রিয়াটিক হতে যাবমক্স কেন?
-না বিছানা থেকেই নামলামনা এখন অবধি, অথচ আপনি বলে দিলেন আমি পাগল।
-তুমি অবশ্যই পাগল, তবে লোভী পাগল।
-আপনি নিশ্চিত?
-অবশ্যই আমি নিশ্চিত, তুমি রুনুর সব কিছু খবরাখবর নিয়েই ওকে ফাঁসিয়েছ। শর্টকাট ওয়ে টু বি রিচ।
-প্রত্যেক বড়লোক বাবার এই ভাবনাই মাথায় থাকে যে, তার মেয়ের পিছু পিছু ঘোরে সব হাড় হাভাতের দল। স্বীকার করি ঘটেও এমন কিন্তু ব্যতিক্রম তো থাকতে পারে।
-নিজেকে ব্যতিক্রম সবাই বলে।
-হয়তো, কিন্তু এটাই সত্য যে রুনু ভুলেও কোনদিন আমাকে বলেনি তার বাবার কত কোটি টাকার প্রপার্টি আছে আর বাড়ীতে কয়জন চাকরানি আছে। আমিও সেটা জানার চেষ্টা করিনি।
-তোমার লেকচার শুনতে আমি আসিনি। একটু পরেই তোমাকে থানায় ধরে নিয়ে যাবে। আমার মেয়ের সাথে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে তোমার বিরুদ্ধে।
কেন জানি রুনুর বাবার কথা শুনে আমার সেদিনের মত হাসি পেল তাই হেসে উঠলাম।
-হাসছো কেন?
রুনুর বাবা অবিকল রুনুর মত কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি উনার কপালের দিকে তাকিয়ে আছি। কপাল আর ভ্রুর মাঝখানটায় যেন কেউ ইংরেজি এম অক্ষরটা লিখে রেখেছে। ভদ্রলোক অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন আমাকে উনার কপালের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। নিজের অজান্তেই কপালে হাত উঠে গেল উনার।
-আপনাকে কপাল কুচকালে সুন্দর দেখায়না, রুনুকে অনেক সুন্দর দেখায়।
ভদ্রলোক আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেননা।
-হারামীর বাচ্চা, এইসব বলে বলে আমার মেয়ের মাথা নস্ট করেছিস। থানায় নিয়ে গিয়ে এমন ধোলাই দিতে বলব যে, রুনুর নামটাও মনে থাকবেনা। ছোটলোক কোথাকার, আমার মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় বসে খাস!
আমি রুনুর বাবাকে রাগ ঝাড়তে দিলাম ইচ্ছামতো।
তারপর বিছানা থেকে নামতে নামতে বললাম-পুলিশের ধোলাইয়ে আমি না হয় রুনুর নাম ভুলে গেলাম কিন্তু আমার নাম ভুলাতে রুনুকে কার ধোলাই খাওয়াবেন? আপনি নিজে নাকি রেবের হাতে তুলে দেবেন মেয়েকে?
-কুত্তার......
-ছি ছি মুখ খারাপ না করেই কথা বলেন না! আশেপাশে মানুষ আছে। এটা মেসবাড়ী। পুলিশ তো আসছে তাই না? আমি না হয় কাপড়টা একটু চ্যাঞ্জ করি আপনি বসেন।
♣♣♣♣♣
হাত মুখ ধুয়ে চ্যাঞ্জ করে রুমে এসে দেখি রুনুর বাবা ঠায় বসে আছেন।
-এক কাপ চা খাবেন পুলিশ আসতে আসতে?
-আমি কি তোমার এখানে চা খেতে এসেছি নাকি আমার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি?
-জ্বী না আপনি এসেছেন আমাকে পুলিশে দিতে। আমি এখন চা খাব তো তাই বললাম। রুনু যদি কোনদিন শুনে আমি আপনাকে না দিয়ে আপনার সামনে বসে চা খেয়েছি তাহলে ভীষণ রাগ করবে। এক খাবলা চুল ছিড়ে ফেলবে মাথা থেকে।
-চুল ছিড়ে ফেলবে মানে!
-জ্বী ও খুব রেগে গেলে আমার মাথায় খাবলা দিয়ে চুল তুলে ফেলে। এই দেখেন আমার মাথার মাঝখানে চুল অনেক পাতলা। ভদ্রলোকের চুল দেখায় কোন আগ্রহ নেই। তার কপাল আবার কুঁচকে গেল। আমি কিছু না বলে চুলোয় গরম পানি বসাতে গেলাম। দুইটা কাপ আছে ঘরে, একটার ডাটা নেই। রুনু একবার বলেছিল এক সেট কাপ প্লেট কিনে আনবে, পরে নিশ্চই ভুলে গেছে। আমি ডাটা বিহীন কাপে চুমুক দিতে দিতে ভালো কাপটা নিয়ে রুনুর বাবার সামনে রাখলাম। উনি চিরাচরিত ভাবে কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলেন কাপের দিকে। কাপটাকে ন্যাংটা ন্যাংটা লাগছে নীচে প্লেট না থাকায়। আমি গায়ে মাখলামনা বিষয়টা। ব্যাচেলর মানুষ কাপ যে আছে তাই যথেষ্ট। ধারণা করলাম উনি আমার সামনে চা খাবেন না তাই আমি বেলকনিতে চলে আসলাম। সিগারেটের প্যাকেটটা বালিশের নীচে রাখা। রুনুর বাবার চোখ এড়িয়ে গিয়ে আনা সম্ভব না। আর আনলেই কি? উনিত আর আমার শ্বশুর না। এসেছেন আমাকে পুলিশে দিতে। রুনুর সাথে একবার কথা বললে ভালো হত। কাহিনীটা ওকে বলতাম আর ওপাশে তার কপাল কুঁচকে যাওয়া কল্পনা করে হাসতাম। আচ্ছা রুনু কি ঘুমাচ্ছে এখনো? নাকি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা বলে কেঁদে কেঁদে গাল ফুলাচ্ছে?
-এই ছেলে , কই তুমি?
আমি ঘরে ঢুকতেই উনি বললেন-আমাকে তোমার ডায়াবেটিক রোগী মনে হয়? চায়ে চিনি নাই কেন?
আমি তো চায়ে চিনি দিয়েছিলাম, নিজেও খেলাম। এই লোক বলে কি? আমি কাপে আরো দুই চামচ চিনি দিয়ে উনাকে দিলাম। উনি আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে লাগলেন। তখনি দৃশ্যপটে হাজির হলেন অল্পবয়সী এক পুলিশ অফিসার।
এসেই রুনুর বাবাকে এভাবে চা খেতে দেখে হকচকিয়ে গেলেন। কি বলবেন বুঝতে পারছেন না।
-স্লামালিকুম দুলাভাই। কোন ছেলেটাকে ধরতে হবে?
বুঝতে পারলাম পুলিশ অফিসার উনাদের আপনা মানুষ। এই রকম মানুষদের পুলিশ, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার,প্রফেসর সব পেশার লোকেদের সাথে আত্মীয়তা না হয় পরিচয় থাকে।
-এই ছেলেটাকে ধরে নিয়ে যাও। আর কোনদিন যেন রুনুর ধারেকাছে না দেখি ওকে।
-জ্বী আচ্ছা দুলাভাই। এই তোর নাম কি রে? কতদিন ধরে এই ধাব্দায় আছিস?
রুনুর বাবা ঘন্টাখানেক হল আমার রুমে কিন্তু একবারও আমার নাম ধরে ডাকার প্রয়োজন হয়নি। প্রথমবারের মত নিজের নাম বলার সুযোগ পেয়ে খুশী হলাম।
-জ্বী আমার নাম আহসান আহমদ।
-আহসান হোস আর তাহসান ই হোস থানায় নিয়ে গিয়ে তোকে বুঝাব বড়লোকের মেয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করার ফল।
কথাটা বলেই জিবে কামড় দিল অফিসার। আড়চোখে দেখল রুনুর বাবাকে। নাহ তিনি খেয়াল করেন নি।
-দুলাভাই নিয়ে চলে যাই তাহলে?
-তোমাকে এনেছি কেন তাহলে?
খেঁকিয়ে উঠলেন রুনুর বাবা। আমি হাসি আটকে রাখতে পারলামনা। এটা আমার একটা মারাত্মক সমস্যা। হাসি আসলে হাসি আটকাতে পারিনা। আমার নানা যেদিন মারা গেলেন সবাই দেখতে গেলাম। বাড়ী ভরতি মানুষ। লাশটা লিভিং রুমে রাখা। সবাই শেষ দেখা দেখছে। আমি সে রুমেই ছিলাম কিন্তু শেষ দেখা দেখিনি। আমার ভয় লাগে লাশের মুখ দেখতে। বড়খালু হন্তদন্ত হয়ে কোত্থেকে এসে বললেন -কই আব্বা কই, আব্বা কই?
উনাকে ধরে ধরে আনা হলো লাশের সামনে। চোখে পানি নেই কিন্তু পকেট থেকে রুমাল বের করলেন চোখের জল মুছতে। বিপত্তি ঘটলো অন্যখানে। রুমালের সাথে এক শলা সিগারেট বেরিয়ে এল। সেই সিগারেট সোজা গিয়ে নানার মুখে। আমি তা দেখে হাসি শুরু করলাম। বড়খালু ভীষণ লজ্জা পেলেন এই কান্ড দেখে। মুরব্বীরা আমাকে ধমক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলেন। সেদিনের পর থেকে বড়খালু আমার সাথে কথা বলেননি। আজ তিনি এখানে থাকলে খুশীতে বগল বাজাতেন।পুলিস অফিসারের ধমকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
-খুব হাসি বের হচ্ছে না! হারামজাদা থানায় চল মজা টের পাবি।
-জ্বী আচ্ছা চলেন তাহলে।
তারপর হঠাত রুনুর বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-রুনু কি জানে আমাকে পুলিশে দেয়া হচ্ছে?
-রুনুর নাম মুখে নিবিনা বেয়াদপ ছেলে।
-জ্বী আচ্ছা। আপনাদের বাসাটা কয়তলা?
-কেন! চারতলা।
-চারতলার উপর থেকে যদি কেউ লাফ দেয় তাহলে বেঁচে যাবার সম্ভাবনা আছে?
-হোয়াট?
রুনুর বাবার মুখ হা হয়ে গেছে।
শেষ অস্ত্রটা চালান দিলাম।
-রুনু প্রচণ্ড অভিমানী। ওকে দেখে রাখবেন আর হ্যাপি নিউ ইয়ার জানিয়ে দেবেন আমার হয়ে। চলেন পুলিশ মামা। নতুন বছরের প্রথম দিন থানা হাজতে থাকার দারুণ অভিজ্ঞতা হবে।
-মিচকে শয়তান,অভিজ্ঞতা একটু পরেই টের পাবি কিন্তু আমাকে ভুলেও মামা চাচা বলবিনা। বের হো। দুলাভাই গেলাম শয়তানটাকে নিয়ে।
-দাঁড়াও, তুমি তোমার ডিউটিতে যাও। ওকে নিতে হবেনা।
রুনুর বাবা একেবারে ঘেমে গেছেন। আমার দিকে একবার বিষদৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। তারপর সোজা বের হয়ে গেলেন। চায়ের কাপটা উনার হাতে নিয়েই বের হয়ে গেছেন। পুলিশ মামাও উনাকে ফলো করলেন। দুই তিন সেকেন্ড পর পুলিশ অফিসার আবার ফিরে আসলেন, হাতে আমার চায়ের কাপ। আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে মেঝেতে এক আছাড় দিলেন কাপটাকে। তারপর ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলেন।
-আপনার দুলাভাইকে গিয়ে বলে আসব নাকি কাপটার কথা?
দুলাভাইকে বেচারা খুব ভয় পায়। পেছন না ফিরেই থামলো। তারপর গরগর আওয়াজ করে বললো, সরি।
আমার খুব আলসেমি পেয়েছে। ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো না সরিয়েই বিছানায় উঠে বসলাম। আমি এখন সিগারেট ধরাব। নতুন বছরের প্রথম সিগারেট। সময় নিয়ে সিগারেট টানব আর রুনুর ফোনের অপেক্ষা করব। ফোন দিলে প্রথমেই বলব, শুভ নববর্ষ। রুনু ধমক দিয়ে বলবে-এটা নিউ ইয়ার নববর্ষ না। আমি জিজ্ঞেস করব আচ্ছা দেখ তো তোমার কপাল কুঁচকে গেছে কি না?
রুনুর কপাল তখন আরো বেশী কুঁচকে যাবে। তারপর খিলখিল করে হেসে উঠবে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০১৬ সকাল ৭:২৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পড়ালেখার গুরুত্ব

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৫



পড়ালেখার গুরুত্ব কি, আর কেনো পড়ালেখা করতে হবে? আমার মনে হয় উত্তর সকলের কম বেশি জানা আছে। কিন্তু আমরা বাস্তবে কি করছি? আমাদের দেশে মনে হয় ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাহিনীটা কী?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৭

কাহিনীটা কী?
বিএনপিকে যারা ২৪ ঘণ্টা অভিশাপ দেয়, গালমন্দ করে, "বিএনপি দেশটা শেষ করে দিয়েছে- আর ছয়মাসও টিকবে না", তারাই আবার বিএনপি কাকে মন্ত্রী বানালো, কাকে উপদেষ্টা করলো- এই হিসাব... ...বাকিটুকু পড়ুন

জজ মিয়া চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মিত হোচ্ছে ভয়ংকর নতুন সিক‍্যুয়াল!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:৪৭



বিএনপির পুলিশ এতো করিৎকর্মা যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে । খুনের তদন্ত করে একেবারে আদালতের রায় সহ রিপোর্ট দিয়ে দেয় ! পৃথিবীর সবচেয়ে আপগ্রেডেড আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন শিলং সালাউদ্দিনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালবেলার মুগ্ধতা থেকে নবকুমারের গ্ল্যামার দুনিয়ায়

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০



সমরেশ মজুমদার আমার বরাবরই প্রিয় লেখকদের একজন। কৈশোর আর যৌবনের এক বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমার মনোজগতে। বই কিনে পড়া, পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার যদি ৩% হারে লোন দেয় দেশের প্রতিটি বাড়ীর ছাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করলে বিদ্যুের কস্টের অনেকটাই কিছুটা সমাধান হইতে পারে।

লিখেছেন নতুন, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:০৬


দেশে বর্তমানে Net Metering Guideline–2025 অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যায় এবং তা বিলের সঙ্গে সমন্বয় হয়। এটা খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা, সরকারের উচিত এটাকে আরো উতসাহিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×