somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আপেক্ষিক
কারও কাছে আমি ভাল, কারও কাছে খারাপ, কারও কাছে আমি বন্ধু কারও কাছে শত্রু; পরম নয় কোন কিছুই, সব কিছুই আপেক্ষিক

অভিজ্ঞতাঃ লাশ কাটা ঘর (দুর্বল চিত্তের হলে এড়িয়ে যাওয়ার অনুরোধ)

০২ রা জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলের লাশ কাটা ঘরটা কলেজের পেছনের খোলা মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত।এক তলা একটা ভবন,একটু আড়ালে। কেউ প্রথম পেছনের খোলা মাঠে আসলে সহজে চোখে পড়বে না। প্রতিদিনই দেখা যায় লাশ আসে,এম্বুলেন্স এর সাথে সাথে কৌতুহলী মানুষের ভীড়ও দেখা যায় সেখানে। মেডিকেলের ১ম বর্ষে এনাটমি এবং ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে ফরেনসিক মেডিসিনের জন্য লাশ কাটা বা তা দেখার অভিজ্ঞতা সবারই আছে। আজ এ নিয়েই লিখছি।কারো কাছে খারাপ লাগতে পারে পড়তে।সরাসরি অনেক কিছু লিখেছি তাই।

লাশ কাটা ঘরের পরিবেশ সাধারনত খুবই শান্ত  থাকে।আমাদের যে লাশ কাটা ঘর তাতে দুটো বিশাল রুম রয়েছে। যার একটাতে একটা বিশাল ফ্রিজের মত দেখতে লাশ সংরক্ষণাগার আছে। সেই রুমে আছে একটে টেবিল,চেয়ার,কয়েকটা টুল ও মাথার উপর ফ্যান। ডোমের যাবতীয় কিছু জিনিস এখানে রাখা।আর অন্য রুমটায় কিছুই নেই তেমন শুধু কতগুলো ট্রলি বেড ছাড়া। এগুলাতেই লাশ রেখে কাটাকাটি হয়। আর রুমের সামনে একটা বারান্দা আছে। বারান্দার মাথার উপর এক পাশের কিছু অংশে ছাদ নেই,কারন পোস্টমর্টেম করার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে যথেষ্ট আলো বাতাসের ব্যাবস্থা থাকতে হবে। ওই পাশটাতেই সাধারনত পোস্টমর্টেম করা হয়। আমাদের দুজন ডোম রয়েছেন। ডোম দুজনকে মনে হয় রোবট। যন্ত্রের মত সবকিছু করল।এর মধ্যে একজন ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা।ওনাকে দেখলে ভয় লাগে। অন্যজন কেমন টাল মাতাল থাকেন। কারো সাথেই তেমন কথা বলেন না।

১ম দিনের ঘটনা।একটা পঁচা বোটকা গন্ধ সারা ঘরে জমে আছে।নাক মুখ আটকে আমরা সবাই জড়ো হই লাশ কাটা দেখতে।

সুইসাইড এরই কেস হবে।একটা মেয়ে। হ্যাংগিং মানে হচ্ছে গলায় ফাস। প্রথমে জামা কাপড় সরিয়ে নেয়া হল। সেইসময় বুকের ভেতর টাকা পাওয়া যায় মেয়েটির। আমাদের বলা হয়েছিল যে মেয়েটি নাকি টাকার অভাবে আত্মহত্যা করেছে।টাকা পাওয়ার ব্যাপারটার সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। এরপর আস্তে আস্তে ডোম দুজন লাশটাকে নিয়মমত কাটা শুরু করলেন। পাশে স্যার ছিলেন একজন।উনি পর্যবেক্ষণ করছেন হ্যাংগিং এর সাইন বা চিহ্নের জন্য। কারন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট লেখার সময় এসব বিষয়গুলো লিখে দিতে হবে।
আর একটা স্কালপেল এত ধারালো হতে পারে ধারনাই করা যায় না। একটানে খাচার হাড়গুলি কেটে নিল একজন ডোম। ওহ কড়কড় একটা শব্দ হলো যেন। দেওয়ালে আঁচড়ের সময় যে শব্দ ও অনুভূতি ঠিক সেরকম লাগল আমার কাছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য হল যখন মাথার চামড়া ছিলে উল্টো দিকে টেনে এনে মুখ ঢেকে দেওয়া হয়। এটা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। কি বিভৎস। এমনিতে যদিও ১ম বর্ষের ক্লাসে লাশ কাটাকাটি বা দেখার অভিজ্ঞতা আছে তারপরও কেমন লাগছিল যেন। শেষে সব কাজ শেষ,স্যারের সাইন দেখাও শেষ তখন সব কিছু আগের মত রেখে লেপ কাঁথা সেলাইয়ের মত চামড়া সেলাই করে দেওয়া হল।এই পোস্টমর্টেম এর সময় আমার এক বন্ধু মাথা ঘুরে নিচে পড়ে যায়।১ম বর্ষেও এমন কাহিনী অনেক আছে পড়ে যাওয়ার।

এরপর রুমের ভেতরে আরো তিনটা লাশ রাখা।একটা ড্রোওনিং মানে পানিতে ডোবা লাশ। তার সারা শরীর থেকে "ম্যাগোট" সম্ভবতঃ মাছির লার্ভা, সেগুলো জোকের মত বের হচ্ছিল। আর প্রচন্ড গন্ধ বের হচ্ছিল। শরীর ফুলে আছে। ওহ কি ভয়াবহ।

আরেকটা ট্রাফিক এক্সিডেন্ট এর কেস ছিল এক বাচ্চার। আমি দেখলাম হাড়গোড় কিছুই আর বাকি নেই সব জয়েন্ট ভেঙে গেছে।মাথার হাড় ভাঙা।জামাকাপড় রক্তে ভিজে চুপচুপ হয়ে আছে।চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। হাড্ডি মাংসের স্তুপের মত লাগছিল।  এগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব না। আমি নিজেও মাঝে মধ্যে অন্য রুমে গিয়ে বসে ছিলাম।

সেদিনের মত সব শেষ হলে আমি রুমে ফিরে আসি। কিন্তু রাতে কয়েকদিন ঠিকমত ঘুমাতে পারিনি। কিসব বাজে বাজে যে স্বপ্ন দেখতাম।ঘুমের মধ্যে লাশগুলো যেন আমার স্বপ্নে এসে হানা দিত বারবার।কতদিন যে ঘেমে প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়ে ঘুম ভেঙেছে হিসেব নেই। এখন আর তেমন হয় না।
এরপর আরো বহু পোস্টমর্টেম দেখেছি। ওইদিনের মত আর কখনই খারাপ লাগে নাই।নার্ভ শক্ত হয়ে গিয়েছে হয়ত।

১ম বর্ষের এনাটমি ক্লাসের একটা ঘটনা বলিঃ
নতুন ফ্রেস বডি এসেছে। বেওয়ারিশ। এক জোয়ান লোকের। মাথায় একটা বিশাল আঘাত। সম্ভবত এর জন্যই মরে যায়।তার গলায় একটা  "আল্লাহু" লেখা তাবিজ ছিল। তার ডিসেকশন এর সময়ে ঘটা ঘটনাটা একটু ভৌতিক হয়েছিল সেদিন।
আমরা আমাদের বিশাল ক্লাশ রুমের উত্তরে জানালার কাছে নিয়ে লাশ কাটা আরম্ভ করি।সোজাসুজি উপরে একটা লাইট জ্বলছিল। আমরাও সবাই জড়ো হয়ে ডিসেকশন দেখছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি ও বন্ধু সাব্বির খেয়াল করলাম যে লাইটটা জ্বলছে আর নিভছে। হয়ত টেকনিকাল সমস্যা ছিল যেভাবেই হোক। আমাদের কাছে ব্যাপারটা যথেষ্ট ভৌতিকই লেগেছিল তখন। দেখলাম একবার জ্বলছে একবার নিভছে। এরকম কেন হয়েছিল সেদিন জানি না। যা হোক সত্যি বলতে কি এরপর বা এর আগে আমরা কখনই লাইটটা ওভাবে জ্বলতে নিভতে দেখি নাই। শুনেছি লাশ এর সৎকার যতক্ষণে না হয়,ততক্ষণ নাকি আত্মাও পাশে পাশে ঘোরে? সত্যি কিনা জানি না। যদি সেরকম কিছু হয় তাহলে ওই আত্মাই দায়ী এই লাইটের সমস্যার জন্য।
হা হা মজা করলাম ভয় পাবেন না।এরকম কোন ব্যাপার নেই বাস্তবে।ব্যাপারটা কাকতালীয় ছিল শুধু।

এভাবেই প্রতিদিন যাচ্ছে।মর্গে লাশ আসা বন্ধ হয় না কখনও।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০২৪ বিকাল ৫:০৯
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পিনাকী ভট্টাচার্য কেন দেশে আসে না, জানেন?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯


Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য তিনিঞ্চি কেন দেশে আসে না জানেন? তার পাসপোর্টই তাকে সে অনুমতি দেয় না। Meghna Alam থেকে প্রাপ্ত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার পাসপোর্টে স্পষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের সেই এন্টিনিয়ার।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮

কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি এবং নানীর বাড়ি



আমি বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিশেষ ধরনের স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নের কথায় যাওয়ার আগে কিছু পেছনের গল্প বলা প্রয়োজন।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে অনার্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×