somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বই রিভিউ - সৈয়দ মুজতবা আলীঃ প্রসঙ্গ,অপ্রসঙ্গ

১৭ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বই - সৈয়দ মুজতবা আলীঃ প্রসঙ্গ,অপ্রসঙ্গ
লেখক- গোলাম মোস্তাকিম
প্রকাশক-স্টুডেন্ট ওয়েজ
মূল্য-১৫০

সৈয়দ মুজতবা আলী সে জাতের লেখক, যারা নিজের লেখায় নিজেকে আড়াল দিয়ে রাখেন।তিনি নিজের লেখা বা নিজের সম্পর্কে কোথাও কিছু বলেননি, বলতে পছন্দও করতেন না।আড্ডার মোড়কে নিজেকে পরিবেশন করতেন। ফলে আলী সাহেবের মনীষার বিভিন্ন দিক তার ফুর্তিবাজ মুখোশে ঢাকা পড়ে গেছে। এসব আর কখনোই জানা যাবে না।তার সম্পর্কে হাতেগোনা যেটুকু লেখা আছে,তাতে তার বাইরের খবর যেটুকু মেলে,অন্দরের ততটা নয়।

আমাদের সৌভাগ্য,লেখক গোলাম মোস্তাকিমের সৌজন্যে মুজতবা আলির মনীষার চাক কিছুটা হলেও ধরা গেছে।মুস্তাকিমের তুলে আনা সামান্যটুকুই আমাদের জন্য অসামান্য, অনেক।১৯৭১ সালে লেখক আলী সাহেবের সাথে প্রথম পরিচিত হোন। ছিলেন আমৃত্যু পর্যন্ত।এ সময়ের নানা কথা, সৃতি লেখক নিজ জবানিতে তুলে এনেছেন।এ যেন এক প্রসন্ন হৃদয়ের সীমাহীন ক্যানভাস।জীবন রসে ভরা বর্ণময় সমৃদ্ধ জগত।এক অজানা দৈবী ঘোরে আচ্ছন্ন হওয়া ছাড়া গতি থাকে না পাঠকের -সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেব এমনই মোহ জাগানিয়া।
বইটির পরতে পরতে থাকা নানা জহরতের কিছু অংশবিশেষ তুলে ধরা হল -

১) তুমি যে দেশের ভাষা শিখবে সেই দেশের লোকের কাছে শিখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।কারণ প্রথম তুমি যে উচ্চারণ শেখো সেটাই তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে।

২) আচ্ছা আমি কি সাহিত্যের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ কে সেন্টার করতে পারি ?
- না।তুমি শেক্সপীয়ার কিংবা গ্যাটেকে সেন্টার করতে পারো।
আমি বললাম , কেন?
মুজতবা আলী বললেন, দেখো, তুমি বাঙ্গালী। রবি ঠাকুর তুমি অবশ্যই পড়বে।কিন্তু তুমি যদি রবি ঠাকুরে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলো তাহলে বিশ্বসাহিত্য বুঝতে তোমার অসুবিধা হতে পারে।

৩) আমি ছাত্রছাত্রীদের বলতাম, তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে প্রথমে তোমার মাতৃভাষায় লিখবে,তারপর সেটা ইংরেজীতে অনুবাদ করবে।এর দুটো সুফল ফলবে।প্রথমত তুমি দুটো ভাষা শিখবে।দ্বিতীয়তঃউত্তরটা তোমার নিজের হবে।

৪) ঘড় ঝাঁট দেয়ার সময় কোনায় ভাল করে ঝাঁট দেবে।কারণ ময়লা সবসময় কোনায় গিয়ে জমে থাকে।( এটা এখন এপ্লাই করি ;) )

৫) একবার বঙ্কিম রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে গিয়ে বললেন, আমি হিন্দু ধর্মের সেবা করতে চাই,আমাকে আশীর্বাদ করুন। উত্তরে পরমহংস বলেন , বঙ্কিম , তোমার নাম ও বঙ্কিম , মন ও বঙ্কিম।তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।

৬) পাঞ্জাবীরা নিজেদের খাটি মুসলমান বলে দাবী করে।কিন্তু আমার জানামতে ওদের মত অসভ্য ও বর্বর জাত দুনিয়ার তে দুটি নেই।অদের মধ্যে যত লম্পট, মদ্যপ আর হোমোসেক্সুয়াল আছে দুনিয়ার আর কোন জাতে আছে কিনা সন্দেহ। সত্যি কথা বলতে কি, সত্যিকার অর্থে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই আমি ধর্মভীরু,খোদাভীরু মুসলমান দেখেছি। জানো ত দুনিয়ার সব বড় বড় পোর্টে দুনিয়ার নামকরা প্রস্টিটিউশন আছে।আমি যখন ইউরোপ গিয়েছি,তখন পূর্ব বাংলার কোন খালাসীঃসিলেট,চিটাগাং নোয়াখালীর কোন খালাসীকে আমি প্রস্টিটিউশনে যেতে দেখিনি।

৭ ) গ্রামের লোকেরা abstract কিছু বলে না, মানে তারা কোন abstractive বর্ণনা দিতে পারে না। তারা সাধারণত physically বলে থাকে।যেমনঃশিক্ষিত কিংবা শহুরে লোক বলবে,তিনি আমাকে অপছন্দ করেন। কিন্তু গ্রামের অশিক্ষিত লোক বলবে,সে আমাকে দুই চক্ষে দেখতে পারে না।

৮) আরবী ভাষাভাষী দেশে বিশেষ করে মিশরে এক বন্ধু সম্ভব হলে আর এক বন্ধুর মেয়েকে বিয়ে করে। কারণ তাদের বিশ্বাস বন্ধু হয়ে সেতো তার বন্ধুকে আজেবাজে মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে পারে না ।

৯) যদি কোনদিন সাহিত্য চর্চা করতে চাও তাহলে দুটো বই খুব ভাল করে পড়বেঃআরব্যপোন্যাস ও জাতক।জাতকের মত ভাল বই খুব কম আছে।বাংলায় সাহিত্য চর্চা করতে চাইলে তোমাকে জাতক অবশ্যই পড়তে হবে।

১০ ) জানো ত শ্রীকৃষ্ণ ছোটবেলায় খুব দধি খেতেন।একবার তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কতটুকু দধি দিতে হবে।শ্রী রাধা সামনেই ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ রাধার স্তনের দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, 'অতটুকু দিতে হবে'।তা হলেই বোঝো।ঐটুক বয়সের ছেলের যদি ঐ রকম রসবোধ হয় তাহলে বড় হয়ে সেতো প্রেমিক হবেই।

১১)টলস্টয়ের যে কোন উপন্যাস ই তোমাকে কমপক্ষে তিনবার পড়তে হবে।

১২) হিটলারের একটা মজার কথা আছে।তিনি বলতেন, ১০০ টা বই পড়ে নব্বইটা ভুলে যাওয়ার চেয়ে ১০ টা বই পড়ে ৯টা মনে রাখা অনেক ভালো।

১৩)আমাদের রসুলের (দঃ) কাছে এক কবি আসতেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নি। কিন্তু তিনি নবীজীর কাছে আসলেই নবীজী তাকে খুব খাতির করে বসাতেন। অন্যান্য সাহাবীরা বেশ অবাক হয়ে যেতো। সেই কবি চলে যাওয়ার পর সাহাবীরা হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করতেন, হে নবী, আপনি ঐ বিধর্মীকে এত সম্মান করেন কেন? সেতো আপনার ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করে নি। নবীজী উত্তরে বলতেন, ঐ কবি আল্লায় বিশ্বাস না করলেও আল্লাহ ওকে ঠিকই ভালবাসেন।কারণ আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কেউ কবি হতে পারে না।
পাঠক হিসেবে আমি বলব, যে কোন বইপ্রেমীর বইটা সংগ্রহে রাখা উচিত।নিজেকে সমৃদ্ধ করার মত অনেক উপকরণ রয়েছে বইটিতে।

( পূর্বে বইপোকাদের আড্ডাখানা গ্রুপে প্রকাশিত )




সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৫
৩৯টি মন্তব্য ৩৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটা জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানদন্ড কি হওয়া উচিত?

লিখেছেন গিলগামেশের দরবার, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:৫৩


ঘটনা প্রবাহ-১

সল্টলেক কলকাতা, ২০১৮ সাল

আমি রাস্তার এক টং দোকানে চা খাবো বলে দাঁড়ালাম, চা দিতে বললাম। দাদা আমাকে চা দিল, আমি চা শেষ করলাম। যখন টাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের জন্ম প্রক্রিয়ার ইতিকথা -" মানুষ কিভাবে ও কিসের তৈরী" - মানব জীবন - ১ ।

লিখেছেন মোহামমদ কামরুজজামান, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২০ বিকাল ৫:২০



মহান আল্লাহ পাক রাববুল আলআমিন এই পৃথিবীতে প্রায় ১৮,০০০ মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন ।আর এই সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ট হল মানুষ। মানুষকে আল্লাহ পাক তৈরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেমন আছেন সবাই?

লিখেছেন ফটিকলাল, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৯



হিংসার চাষে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে।মানুষের মনে তার যাতায়াত সাবলীল। এমন যাতায়াতের জন্য প্রয়োজন হয় না কোনো আমন্ত্রনপত্র, ক্রোড়পত্র অথবা সামান্য আকুতি মিনতি। মানুষের মনে হিংসার ক্ষুধা সবসময়ই ছিলো, আছে, থাকবে। তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাস্কর্য/মুর্তি নিয়ে সাধারন মানুষ যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৩



১। মূর্তি আর ভাষ্কর্য এক নয় কথাটা আসছে কেনো! মূর্তি হলে আপনি সেটা ভেঙে দেওয়ার অনুমতি দিতেন?

২। আপনি গান করবেন না বলে আর কেউ গান করবে না? আপনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষানচর স্থানান্তর কোন সমাধান নয়।

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৫২



রোহিঙ্গাদের জন্য সুশ্রী আবাসন গড়ে উঠেছে ভাষানচর, ইতিমধ্যে সেখানে কিছু রোহিঙ্গা স্থানান্তর হয়েছে আরো কিছু হবে আর শেষ পরিনতি হচ্ছে একই আর্বজনা দুই জায়গায় স্থায়ী। রোহিঙ্গাদের এই স্থানান্তর অর্থ হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×