somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"গেরিলা "(গল্প)

২২ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


'রাহাত'
'জ্বী স্যার?'
'স্কুল টা বুঝি আর থাকছেনা?'
'স্যার এখনো বলা যাচ্ছেনা কিছুই। '
'অপারেশন টা কি আজ রাতেই? '
'জ্বী স্যার।'
'একটা জিনিস জানো রাহাত?'
'কি স্যার?'
'আমার খুব কস্ট হচ্ছে।'
'কেন স্যার?'
'স্কুলটাতে এত বছরের শিক্ষকতা। আর সেই স্কুলটা এভাবে চোখের সামনে শেষ হয়ে যাবে? '
'স্যার আমাদের হাতে আর বিকল্প পথ নেই।'
'ও '

স্যার চলে গেলেন। মুখভর্তি স্যারের আফসোস। স্কুলটাকে খুব ভালোবাসেন। স্যারের বাসায় ই আমরা আশ্রয় নিয়েছি। লোকটি আশ্রয় দিতে চায় নি। যখন শুনলো মুক্তিযোদ্ধা তখন বিচক্ষণতার সহিত তাকালো আমাদের দিকে। প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
'মুক্তিযোদ্ধা?'
'জ্বি'
'আমার বাসায় কেন থাকতে চাও?'
'স্কুলটা আপনার বাসা থেকে কাছে। আর কেউ সন্দেহ করবেনা তাই।'
'বুঝলাম। এখন যদি আমি সাহায্য না করি?'
'স্যার তাহলে আমরা অন্য বাসায় যাবো।'
'আমি যে শিক্ষক তা তুমি কিভাবে জানো?'
'এই অঞ্চলের এক মুক্তিযোদ্ধা সব ইনফরমেশন দিয়েছে। সেই অনুযায়ী আসা।'
'তার নাম কি?'
'বলার পার্মিশন নেই।'
'কেন?'
'সিক্রেট।'
'তোমার নাম কি?'
'রাহাত।'
'বাড়ি কোথায়?'
'স্যার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হবেনা। ৬ টা বেজে এসেছে। কারফিউ শুরু হয়ে এলো?'
'আচ্ছা ভিতরেই আসো।'

ভিতরে ঢুকলাম। বেশ সাদামাটা একটা রুম। সামনের কক্ষে বেশ কয়েকটি ছবি ঝুলছে।আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
'স্যার বা পাসের দেয়ালের চশমা পড়া ছেলেটা কে?'
'আমার ছেলে।'
'দেখেছিলাম।'
'কি বলছো? তুমি আমার আকাশ কে দেখেছো? বেঁচে আছে এখনো?'

স্যারের চোখেমুখে ছেলের জন্য আকুল মায়া। স্যারের চোখে পানিও চলে এসেছে।
'জ্বি স্যার দেখেছি।উনি ভালোই আছেন।'
'আকাশ এখন কোথায়?'
'স্যার সিক্রেট।'
'আমাকে বিশ্বাস হয় না?'
'হয়।'
'তাহলে বলছনা কেন সে কোথায় আছে?'
'আর্মি কেম্পে যদি কোনরকমে ধরে নিয়ে যায় তাহলে সব আপনি ফরফর করে বলে দিবেন।'

স্যারের চোখে বেশ ভয় ঢুকেছিল। আর এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেন নি উনি। এরপর থেকে কয়েকদিন আমাদের কাছে কোন ইনফরমেশন আসেনি। আজ ই হঠাৎ এসেছে এবং আজই অপারেশন।

সাকিব পাস থেকে গলা খুসখুস করে মুখ খুললো
'রাহাত ভাই আক্রমণ টা কিভাবে শুরু হবে?'

সাকিব ছেলেটির দিকে তাঁকালাম। ছোট্ট একটা ছেলে। কলেজ পড়বার বয়স আর সেই ছেলে আজ মানুষ মারতে জানে।
'কি রাহাত ভাই কিছু বলেন?'
ছেলেটির দিকে আবার তাকালাম
'ভয় করছেনা তোমার সাকিব?'
'জানি না ভাইয়া। তবে মায়ের কথা খুব মনে পড়তেছে।'
'তোমার মা এখন কোথায়?'
'জানি না ভাইয়া।'

চারপাশে তাকালাম সবাই শকুনের মতো তাকিয়ে আছে আমার কথার অপেক্ষায়।সবার উদ্দেশ্যে বললাম,
'স্টেনগান মোট কয়টা আছে? '
'২ টা।'
'আর এলএনজি?'
'তাও দুইটা ভাই।'
'৩ টা থাকার কথা ছিল?'
'ভাই একটা কম আসছে।'
'ওহ। আর গ্রেনেড?'
'ভাই গ্রেনেড প্রচুর আছে।'

আমি বসে বসে অপারেশন এর ছক কষছি। হঠাৎ করেই অর্ডার আসলো অপারেশন এর তাই গুছিয়ে উঠতে পারি নি। ভাবছি আমরা পাঁচজন মানুষ ৪ টা রাইফেল। মঞ্জুকে ডাক দিলাম
'মঞ্জু?'
'জ্বি ভাই?'
'গ্রেনেড চালাতে পারো তো?'
'জ্বি ভাই ভালোই পারি।'
'তোমাকে যদি রাইফেল না দিয়ে গ্রেনেড দেই তবে কি তুমি কিছু মনে করবে?'
'না ভাই।'
'গ্রেনেড কতক্ষণ পরে ফাটবে মনে আছে তো?'
'৭ সেকেন্ড পর ভাই।'
'পারবে তো?তোমার জন্য কোন রাইফেল নেই আবারো বললাম। ইচ্ছে হলে থেকে যেতে পারো।"
'না ভাই আমি যাবো।'
'ওকে গুড।'

শুনো সবাই, আমরা যেহেতু গেরিলা গেরিলা এট্যাক ই করবো কোন সম্মুখ যুদ্ধ নয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য পশ্চিম দিকের কক্ষটা উড়িয়ে দেয়া। কি সবাই শুনছো?

'জ্ব ভাই।'

আমি থাকবো ফ্রন্ট স্কোয়াড এ, সাকিব ব্যাকআপ দিবে পিছনে থেকে। আর ডানে থাকবে কবীর আর বামে নীরব।

'আর ভাই মঞ্জু?'সাকিব বললো।
'মঞ্জু আমার পিছনে অর্থাৎ সাকিবের সামনে থাকবে। '

'ভাই প্রথম এট্যাকটা কে করবে ভাই?' নীরব জানতে চাইলো।

"মঞ্জু শুরুতেই সাথে সাথে দুইটা গ্রেনেড ছুড়বে। যাতে পশ্চিম দিকের কক্ষটি কোনভাবেই রক্ষা না পায়।' আমি বললাম

আমাদের আমাদের কথার মাঝেই স্যার আবার প্রবেশ করলো।

'রাহাত।'
'জ্বি স্যার?'
'আমার ছেলে আকাশ ও তোমাদের সাথে থাকবে তাই না?'
'স্যার জানি না।'
'আমি জানি তুমি জানো কিন্ত আমায় বলবেনা। টপ সিক্রেট তাই না?'
'জানি না স্যার।'
'অপারেশন কখন হবে?'
'রাতে।'
'এখনো তো রাতই।রাত কয়টায়?'
'সংকেত আসলে তখন।'
'সংকেত কি? আর কারফিউ চলছে কেউ আসার সম্ভাবনা নেই।'
'স্যার আপনার বাসায় রেডিও আছে?'
'হুম।'
'রেডিও টা একটু চালু রাখবেন?'
'দিচ্ছি।' স্যার রুম থেকে বেড়িয়ে গেলেন রেডিও উদ্দেশ্যে।

রাত তখন দুইটা রেডিও তে হঠাৎ করেই বেজে উঠলো,,, চল চল চল,, রনসংগীত টা।

শিক্ষক মজিদুর রহমান খেয়াল করলেন ছেলে গুলা বাহির হওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছে। উনি হতচকিত হয়ে বললেন,
'সংকেত নিয়ে তো কেউ আসেনি তাহলে তোমরা এখন যাচ্ছো যে?'
'স্যার অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়েন।'
'বাবা তোমরা আবার ফিরবে তো?'
'জানি না স্যার। যদি বেঁচে থাকি তবে আপনার সাথে আবার দেখা করবো।'
'কিন্ত সংকেত ছাড়া বের হওয়া কি ঠিক হবে?'
'বেতারে যে চল,, চল,, রনসংগীত টা বেজেছে অইটাই আমাদের সংকেত।যাচ্ছি স্যার। '

মজিদ সাহেব তাঁকিয়ে আছেন,,, পাঁচজন ছেলে উনার ঘর থেকে বের হচ্ছে কিন্ত উনার কেন যেন বুকের ভিতরে ধুক ধুক করছে। ছেলেগুলো বের হয়ে গেল। তাদের বসে থাকার জায়গাটা ফাঁকা হয়ে আছে। মজিদ সাহেবের চোখ দুটো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে উঠলো এর উত্তর উনার নেই।

এলএনজি টা হাতে ধরে আছি আমি। সবার সামনে হওয়ায় কিছুটা ভয় ও লাগছে। স্কুলের পাসের ঝোপটা নড়ে উঠলো। আমি ফিসফিসালাম,
'আকাশ ভাই নাকি?'
'হুম। সব ঠিকঠাক তো রাহাত ভাই?' উত্তর আসলো অইপাস থেকে

'সব ঠিক ঠাক।'উত্তর দিলাম

মঞ্জুর দিকে তাকালাম
'পিন খুলো মঞ্জু। আরেকটু এগিয়ে মেরে দাও আমরা ব্যাকাপ দিচ্ছি।'
'ভাই ভয় করছে।'মঞ্জুর উত্তর এলো
'ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। সাত সেকেন্ড সময় পাবে ঠিক সময়ে ফেলেই শুয়ে পড়বে। তোমার কিচ্ছু হবেনা দেখো।'

মঞ্জু দুটো গ্রেনেডের পিন খুলে নিল ভয় হচ্ছে পারবে তো? আগেই ফাটবে না তো? মঞ্জু এগিয়ে গেল আমার বুকটা ধুক ধুক করছে। জানি না ওর কিরকম লাগছে।

মঞ্জু আমার দিকে তাকালো ভাই মারলাম
'জয় বাংলা। ' বলেই ছুড়ে মারলো মঞ্জু।

সাথে সাথেই পর পর দুইটা বোম ফাটলো চারিদিকে আলোকিত হয়ে উঠলো। ঝাকে ঝাকে আসতে লাগলো শত্রু পক্ষের বুলেট। এলএনজি টা চালাতে শুরু করলাম। বোমা তখনো ফাটছিল বুঝলেন তাদের অস্ত্রের কক্ষে ঠিক আঘাত হেনেছে আর ভিতরে যেসব গোলাবারুদ ছিল তাই ফাটছে।

শত্রুপক্ষকে বেশ শক্তিশালী ই মনে হচ্ছে গুলির পরিমাণ বাড়তেই আছে। আমাদের মূল কাজ শেষ এখন এখান থেকে সেফলি ফিরাটাই লক্ষ্য। মঞ্জু আরো কয়েটা গ্রেনেড ফাটালো। পুরো অঞ্চল কেঁপে উঠলো। আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে।

কোনভাবেই পিছু হটা যাচ্ছে না। শত্রু পক্ষ এগিয়ে আসছে। সবাইকে পিছু হটার নির্দেশ দিলাম। হঠাৎ করেই যেন কানের কাছে কিছু ফাটলো কানে তালা লেগে গেছে শুনসান নীরবতা। কানে হাত দিতে চাইলাম কিন্ত হাতে কোন শক্তি নেই মনে হচ্ছে হাতটি হাতের জায়গায় নেই।

কে যেন বার কয়েক টানলো আমায় উঠতে পারলাম না আমি ঠায় উপরের দিকে তাকিয়ে আছি। টেনে তুনে তুলার আবার চেষ্টা চালালো পারলো না। তারপর আর কোন নাড়াচাড়া নেই।

মাথার উপরে কয়েকটা মুর্তি ভেসে এলো সবার হাতে রাইফেল আর মুখভর্তি অট্রহাসি। আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে ফেলতে চাইলাম, "এই কুত্তা গুলোর ছবি দেখতে চাই না।"

মুখভর্তি বাতাস নিলাম নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে চিৎকার দিলাম,"জয় বাংলা।"

তারপর কয়েকটি গুলির আওয়াজ আর হায়েনাদের অট্রহাসি আর আমি চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লাম।

[উৎসর্গ : সকল মুক্তিযোদ্ধাদের যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। আর শহীদদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করি। ]

............. এ. এস. এম. রাহাত
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×