২.সকাল ১০:৪০ মিনিটে প্লেন ছাড়ার কথা কিন্তু যাত্রীদের কে চেক-ইন লবি থেকে বাসে করে প্লেনে নিয়ে যাওয়া হলো ১১ টার সময়। প্লেনে ঢুকেই মনে হলো কোন ফায়ার প্লেসে ঢুকলাম। কেবিন ক্রু'দের কাছে কারন জানতে চাইলে বল্লো, স্যার আপনারা বসেন প্লেন চালু হলে এসি কাজ করবে। বসলাম সবাই। ৫ মিনিট, ১০ মিনিট, ২০ মিনিট, ৩০ মিনিট....প্লেন ও চালু হচ্ছে না, এসি ও না। গরমে সিদ্ধ হচ্ছি সবাই। ছোট বাচ্চা সহ যারা তাদের অবস্থা আরো কাহিল। আর পারলাম না কয়েকজন আমারা সিট ছেড়ে সামনে গিয়ে জানার চেষ্টা করলাম ঘটনা টা কি? যা শুনলাম তাতে আমরা আক্কেল গুড়ুম!টেকনিক্যাল প্রবলেম তাই প্লেন স্টার্ট হচ্ছে না, এবং তাই এসি ও না। বাসে যাত্রী উঠানোর পর বাস স্টার্ট হয়না শুনেছি-কিন্তু প্লেন এরকম করে এই প্রথম অভিজ্ঞতা। ভাবছি এই প্লেনে ট্র্যাভেল করা কতটা নিরাপদ। যাত্রী উঠানোর পর স্টার্ট হচ্ছে না, না জানি আকাশে উঠার পর কি হয়। ভরসা পেলাম একটু পেলাম জিএমজি'র কর্নধার স্যুটার সাত্তার আমাদের সাথে এই প্লেনের যাত্রী। আর যাই হোক মালিকের জীবন নিয়ে তো রিস্ক তারা নিবে না। ৫৫ মিনিট গরমে যাত্রীদের সিদ্ধ করার পর কারিগরি সমস্যা সমাধান করে প্লেন আকাশে উড়লো। আকাশে উড়া, ব্যাংককে যাত্রা বিরতি সব মিলিয়ে ৯ ঘন্টা পর আমরা নামলাম কুয়ালালাম পুর আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে। এতোক্ষন একসাথে ট্র্যাভেল করার ফলে কেবিন ক্রুদের সাথে বেশ আলাপচারিতা হয়েছিল। প্লেন থেকে নামার আগে তাদের ধন্যবাদ দিয়ে জানতে চাইলাম এই ফিরতি ফ্লাইটেই তো আপনারার ঢাকা ফেরত যাচ্ছেন? একটা বিষয় পাঠকদের জানিয়ে রাখি জিএমজি'র ফ্লাইট টাইমটেবিল অনুযায়ী ১ ঘন্টা পর এই বিমানটি'ই ঢাকা ফেরত যাবে। কেবিন ক্রু বল্লো, স্যার আজ তো অনেক দেরী হয়ে গেছে,তাই আজ যাবো না কালকে যাব। আবার আমাদের আক্কেল গুড়ুম হবার দশা। বলে কি, এতো বাসের কন্ডাক্টরের মতো কথা। দেরী হয়েছে বলে আজ যাবে না!
৩.হোটেল থেকে ট্যাক্সি করে যাচ্ছি কুয়ালালাম পুর আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে। সন্ধা ৬:১০ মিনিটে জিএমজি'র ফ্লাইটে ঢাকা ফিরবো। সপিং আর ঘোরাঘুরি করে সাথে আনা টাকা-পয়সা মোটামুটি সব খরচ করে ফিরছি ঢাকায়। মালয়শিয়া আসার উদ্দেশ্যে বিমান বন্দরে যাবার সময় যে ধরনের প্রশান্তি'র হাসি মুখে ছিল ঠিক একই হাসি আমাদের সবার মুখে। ট্যাক্সি থেকে নেমে ট্রলি আনতে গিয়ে বিমান বন্দরে কর্মরত এক দেশী ভাই'য়ের সাথে দেখ ও কথা। জিএমজি'তে যাব শুনে বল্লো এতো আগে আসছেন কেন, জিএমজি তো সবসময় লেট। কথা না বাড়িয়ে ট্রলি নিয়ে চলে এলাম লেভেল ৫ এ, যেখান থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডির্পাচার। ইলেকট্রনিক বোর্ডে কোন তথ্য না পেয়ে অনুসন্ধান কর্মীদের সরনাপন্ন হলাম। "হু জিএমজি, তোমরা ১ নাম্বার কাউন্টারে চলে যাও। কিছুক্ষনের মধ্যে জিএমজি'র লোকজনদের সেখানে যাওয়ার কথা"। জিএমজি'র লোকজন এলো ১ ঘন্টা পর, এবং খুব সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে বল্লো আজ থেকে আগামী ৪ দিন পর্যন্ত টেকনিক্যাল প্রবলেমের কারনে আমাদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মাথায় মনে হয় বাজ ভেঙ্গে পড়লো। কাল অফিসে জয়েন করার কথা, পকেটে টাকা নেই, আমার সাথে লিংক করা কতগুলো কাজ এগুলোর কি হবে। আর ভাবতে চাই না। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এক নির্জন গ্রাম এলাকার হোটেলে আমাদের ট্রান্সফার করা হলো। ইতিমধ্যে যাত্রীদের মধ্যে যাদের পরিচিত লোকজন জিএমজি'র স্টাফ সেখান থেকে তথ্য আসলো এয়ারক্রাফ্ট মেরামত হয়ে আমাদের উদ্ধার পর্যন্ত ৭/৮ দিন লেগে যাবে। সহজ সমাধান জিএমজি দিয়ে দিল, যাদের দেশে ফেরার প্রয়োজন বেশী ক্যাশ টাকা দিয়ে অন্য এয়ারল্ইন্সের টিকেট কেটে তারা চলে যান। চমত্কার সমাধান! চিত্কার চেচামেচি করে কোন লাভ হবে না বলে যাদের কাছে টাকা আছে তারা তাই করতে শুরু করলো। আটকে রইলাম আমারা হতভাগারা যাদের পকেট শূন্য। ২৪ ঘন্টা পর জিএমজি থেকে পেলাম আরো দুঃসংবাদ, অল্প কয়েকদিনে এয়ারক্রাফ্ট ঠিক হওয়ার সম্বাবনা খুব কম। নিজেকে বললাম, কি বেড়াতে আসা হয়েছে তাই না! খুব মজা করলা তাই না! এখন বুঝো ঠেলা। তিন বন্ধূ মিলে ঠিক করলাম জিএমজি'র আশায় থাকলে হবে না, আমাদের কোন অল্টারনেট ওয়ে বের করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের চৌদ্দ গুষ্টি বা পরিচিত কেউ মালয়শিয়ায় থাকে না। তারপরের কথা অত্যন্ত লজ্জাকর, পাঠকদেরকে বলতেও লজ্জা লাগছে। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করা, প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হওয়া, মালয়শিয়া বিমান বন্দরে ক্লিনিং কাজ করা চার বাংলাদেশী শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা ধার করে টিকেট কেটে ৩৬ ঘন্টা পর দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। জয়তু আসলাম, রাজ্জাক, রিপন,সেলিম। তোমাদেরকে ভালো রাখার জন্য আমারা কিছুই করিনি, কিন্তু তোমরা আমাদের জন্য করেই যাচ্ছো। জিএমজি কি এরপরেও শিক্ষা নেবে না, জিএমজি এরপরেও তাদের শ্লোগানের "ফার্স্ট ক্লাশ" শব্দটা চেন্জ করে "লাস্ট ক্লাশ" করবে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০০৯ সকাল ৯:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


