somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"কোরবানির নামে অবলা পশুহত্যার" জবাবে...

০৭ ই অক্টোবর, ২০১৪ রাত ১২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলা থেকেই দুই ঈদের মধ্যে আমার কাছে বেশি প্রিয় ছিল কোরবানির ঈদ।
কারন একটাই - এই ঈদে আমরা অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও গরু ছাগলের 'মালিক' হতে পারতাম।
পশু জবাই করাটা আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল না। দাম দর করে গরু-ছাগল কিনতে হাঁটে যাচ্ছি, ভূষি-ঘাস খাওয়াচ্ছি, গরুর গলায় হাত বুলিয়ে আদর করছি - এটাই ছিল আনন্দের মূল কারন।
গরুর গলায় যখন ছুরি চালানো হতো, আমার মনে পড়েনা আমি কিংবা আমার বন্ধুরা কখনও পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছি। বরং জবাই হওয়া পশুর ছটফটানি দেখে আমাদের খুবই খারাপ লাগতো। আমার বাবা কখনও জবাই করার সময়টাতে পশুর সামনে থাকতেন না। তিনি এই কষ্ট নিতে পারতেন না।
আমরা পিচ্চিরা সম্ভবত ছিলাম 'লৌহ-হৃদয় মানব।' আমরা জবাইর সময়ে স্বেচ্ছায় সামনে থাকতাম। কারন, এটাই নিয়ম। নিজের ভাল লাগা-মন্দ লাগা ছাপিয়েও কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতেই আমরা পশু জবাই দিই।
আল্লাহ বলেন, "না পশুর রক্ত, না তার মাংস আল্লাহর কাছে পৌছে। যা পৌছে, তা হচ্ছে মানুষের 'তকওয়া।'" ইংরেজীতে যাকে বলা হয় God-consciousness.
এর মানে হচ্ছে, কোরবানির পশুর মাংস শুধু আমাদেরই খাবার জন্য। আমরা, আমাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী এবং গরীবদের নিয়ে একসাথে আনন্দ উদযাপন করতে করতে মাংস খাব। আল্লাহ কোথাও বলে দেননি তাঁর উদ্দেশ্যে এক ভাগ মাংস ফেলে দিতে। মাংস অপচয়ের প্রশ্নই আসেনা।
কোরবানির সময়ে অনেককেই দেখি "ধর্মের নামে পশু হত্যার" বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। নানান যুক্তি দিয়ে প্রমান করার চেষ্টা করেন এটি একটি বর্বর প্রথা। বিয়ে বাড়িতে গেলে তাঁদেরকেই দেখি ওয়েটারকে অনুরোধ করতে যাতে তাঁকে আরেক পিস চিকেন রোস্ট বেশি দেয়। প্লেটে খাসীর রেজালার ভিড়ে পোলাও নজরে পড়ে না। গো-মাংস থাকলেতো কথাই নেই।
তাঁদের বাড়িতেও যখন দাওয়াতে যাই, তখনও দেখি টেবিলে মাংসের আইটেম শোভা পায়। তিনিও পশু পাখির মাংস দিয়েই 'উৎসব' পালন করেন।
একে কি হিপোক্রেসী বলবেন? নাকি মৌসুমী মাতবর বলবেন?
আমি কেবল বলবো, lac of knowledge. আরও সহজ ভাষায়, ignorance.

অবশ্য আরেকদিক বিবেচনা করলে ওরা খুব একটা ভুলও নয়।
ইসলামে নিয়ম হচ্ছে গৃহপালিত সবচেয়ে প্রিয় এবং নিখুঁত গবাদি পশুটিকে আল্লাহর নামে কোরবান করা।
শহরে থাকায় আমাদের গৃহপালিত পশু থাকতো না। বাজার থেকে কিনে আনা পশুই ভরসা। এবং অবশ্যই অবলা প্রাণীগুলো মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই আমাদের 'প্রিয়' হয়ে যেত।
আমরা মাঝারি আকৃতির গরুই জবাই দিতাম। বাবার আর্থিক সামর্থের সাথেও আরেকটা যুক্তি ছিল মাঝারি বলদের মাংস খেতে মজা বেশি। গরু যত বড়, টেস্ট তত কম। প্রমাণ, অ্যামেরিকায় এসে পেয়েছি। এখানে হাতির সাইজের একেকটা গরুর মাংস বিক্রি করা হয়। টেস্ট দেশের বলদের ধারে কাছেও যায় না।
ছোটবেলায় আমারও বাজারে গিয়ে বড় বড় গরু দেখে ইচ্ছে হতো কেনার। লক্ষ্যাধিক টাকার উপরে হওয়ায় সামর্থ্যে হতো না।
গরুর সাইজের কারনে লোভে পড়িনি কখনও। আমার নিজের সাইজ দেখে নিশ্চই সবাই বুঝে গেছেন আমি কেমন ভোজন রসিক।
আসলে একটা হাদীছ শুনেছিলাম যে, কোরবানির পশুর প্রতিটা পশমের জন্য আল্লাহ সওয়াব দান করেন। যত বড় প্রাণী, তত বেশি সওয়াব।
বাজার থেকে যারা বড় বড় গরু কিনে নিয়ে যেতেন, তাঁদের এই কারনেই একটু হিংসা হতো। তাঁরা বেশি সওয়াব পেয়ে গেছেন।
বড় হবার পর একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করলাম।
বড় বড় গরুর ক্রেতাদের অনেকেই সরকারী কর্মচারী। পুলিশের ওসি, এসপি, সরকারী আমলারা, সরকারী-বেসরকারী দলের নেতারা প্রমুখ। একেকটি গরুর দাম যাদের বার্ষিক বেতনের চেয়েও বেশি। তাঁরা কী তবে সারা বছর না খেয়ে কেবল একটা কোরবানির গরুই কেনেন?
ইসলামে কোরবানির সময়ে পশুর গলায় ছুরি চালাবার কথা বলা হলেও আসলে বলা হয়েছে নিজের ভিতরের পশুর কোরবানী দিতে। বলা হয়েছে নিজের হৃদয়ে যে শয়তানটার বাস, তার গলায় ছুরি চালাও।
যেমন, আমি সারাজীবন মিথ্যা বলে অভ্যস্ত। কোরবানির দিন আমাকে শপথ নিতেই হবে আমার এই বদভ্যাসের গলায় আমি ছুরি চালাবো - বাকি জীবনে একটাও মিথ্যা কথা বলবো না।
আমি ঘুষ খাই, আমি ইভটিজার, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ণ ছবি দেখি, আমি মানুষে মানুষে দ্বন্দ লাগিয়ে মজা পাই - আমারতো দোষের অভাব নেই। কোরবানির ঈদে আমি কয়টার গলায় ছুরি চালাই? একটিও না। এইদিকে একশো গরু কোরবান করে ফেলেছি।
দূর্নীতির টাকায় আমি বাজারের সবচেয়ে বড় গরুটা কিনে এনে ফেসবুকে 'কাউফি' আপলোড করে দিলাম। লোকে বাহ্ বাহ্ দিল। এতেই আমি খুশি।
সেক্ষেত্রে অবশ্যই আমার কোরবানী কেবল একটি মাংস খাওয়ার উপলক্ষ্য ছাড়া কিছুই না। শুধু শুধুই অবলা প্রাণীগুলোকে ধরে ধরে এনে জবাই দিয়ে দিচ্ছি। সহজ ভাষায় হত্যা করেছি।
ওরা মানুষের গলায় ছুরি চালিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় বড় গরু কিনতে যায়। একে কি হিপোক্রেসী বলবেন? নাকি আহাম্মক?
আমি আবারও বলবো, Ignorance.

আল্লাহ আমাদের সব পক্ষকেই সঠিক জ্ঞান দান করুন। সবাই জোরে বলেন, আমীন!

উপসংহারে একটি গল্প বলি।
আমাদের পাড়ায় ফজল (কাল্পনিক নাম) নামে একটা ছেলে থাকতো। তার বাবার সামর্থ্য ছিল না পশু কোরবানী দেয়ার। ঈদের আগে আগে তারা পিতাপুত্র খুব আগ্রহ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। কেউ গরু-খাসি কিনে হাঁট থেকে ফিরলে মহানন্দে দাম জিজ্ঞেস করতেন। দাম শুনে তাঁদের চোখ আনন্দে চকচক করতো।
ফজলের বাবাকে দেখে আমার সুনীলের কবিতার সেই বাবার কথা মনে পড়ে যেত, যিনি পুত্রের কাঁধে হাত রেখে বলেন, "দেখিস, একদিন, আমরাও...."
যেসব বাড়িতে ফজলের প্রবেশের অনুমতি ছিল, সেসব বাড়ির পশুকে ঘাস খাওয়ানোর ব্যপারে ফজলের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। দেখা যেত আমাদের চেয়েও আমাদের গরুর প্রতি তার মায়া কয়েক গুণ বেশি।
একদিকে তার ভাগ্য আমাদের চেয়েও ভাল ছিল। আমাদেরতো মাত্র একটি গরু থাকতো, পাড়ার সব গরুই যে ফজলের!
পশু জবাইর সময়েও ফজলকে দেখতাম ভীষণ ব্যস্ত থাকতে। হুজুরের সাথে এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি ছুটে যাচ্ছে। গরু জবাই দেখতে।
কিন্তু যখন গরীবদের মাংস বিতরণের সময় আসতো, তখন ফজল বা তার পরিবারের কাউকেই, কখনই আমি দেখিনি থালা হাতে মাংস ভিক্ষা চাইতে।
তার বাবা নাকি সেইদিন বাজার থেকে মাংস কিনে আনতেন শুধু একবেলা মাংস খাবার জন্য। বছরের কেবল সেই দিনটাতেই নিজেদের টাকায় কিনে তাঁদের গো-মাংস ভক্ষণ হতো।
কোরবানির মাংসের তিনভাগের একভাগ ফজলদের মত প্রতিবেশীদের জন্য বরাদ্দকৃত। ফজলরা আপনার কাছে এসে হাত পেতে মাংস খুঁজবে না। আপনার দায়িত্ব তাঁদের খুঁজে খুঁজে বের করা।
আশা করি ঈদ এবং পূজার মত দেশের সবচেয়ে বৃহৎ দুটি ধর্মীয় উৎসব সবারই আনন্দে কেটেছে।
https://www.facebook.com/groups/canvasbd/
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৪ রাত ১:১৬
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০০




জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth....

জেফরি আর্চারের A Prisoner of Birth মূলত এমন এক উপন্যাস, যেখানে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণিবৈষম্য, বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধ এবং বুদ্ধিমত্তার লড়াই একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। উপন্যাসটির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসার মোল্লা হুজুর থেকে আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখুন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

গতকাল রাতে একটা বাচ্চার পা**র ছবি দেখেছিলাম ফেইসবুকে, অনেকেই শেয়ার করেছেন। পা কেটে হাসপাতালে আসার পর ডাক্তার সাপোজিটরি দিতে গিয়ে দেখে গর্তের মতো হয়ে গেছে। মাদ্রাসার হুজুরে বিকৃত কাজ করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

×