somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবাই নাম দিয়েই জাতে উঠতে আগ্রহী, কাম দিয়ে নয়।

২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লন্ডন ফেরত আমাদের গ্রামের এক ভদ্রলোক আমার দাদির সাথে দেখা করতে এসেছেন। ভদ্রলোক যৌবনে লন্ডনে গিয়ে ব্যবসা করে প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হয়েছেন। কোটিপতি বললেও তাঁকে ছোট করা হবে। কয়েকদিনের জন্য দেশে এসেছিলেন। দাদী অ্যামেরিকা থেকে দেশে ফিরেছেন খবর শুনে দোয়া নিতে এসেছেন।
দাদী যথাযথ গম্ভীর চেহারায় ড্রয়িং রুমে (এখন যাকে সবাই লিভিং রুম বলে, একটা সময়ে আমরা তাকে ড্রয়িং রুম বলতাম) এসে বসলেন। ভদ্রলোক তেলতেলে মুখে দাদির সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। চেয়ারে বসছেন না।
দাদী আমাকে বললেন একটা মোড়া এনে দিতে।
আমি চোখ কপালে তুলে ফেললাম। বলে কী! এত ধনী একজন মানুষ মোড়ায় বসবেন? যেখানে সবকটা সোফা খালি পড়ে আছে।
আমি মোড়া এনে দিলে পরে ভদ্রলোক মোড়ায় বসলেন। এবং মুখের তেল চকচকে ভাবের এতটুকু পরিবর্তন হলো না। যেন এটাই স্বাভাবিক।
ভদ্রলোক চলে যাবার পরে আমি দাদির কাছে তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করলাম। দাদী বললেন, কোন এক কালে যখন আমাদের জমিদারী ছিল, তখন তাঁর পূর্বপুরুষ এবং তিনি নিজেও আমাদের প্রজা ছিলেন। "চৌধুরী বাড়িতে" এসে তাঁদের চেয়ারে বসার নিয়ম কখনই ছিল না।
জমিদারী গিয়েছে সেই কবে, এখন ভদ্রলোকের বর্তমানে এত টাকা যে আমাদের মতন কয়েকটা চৌধুরীকে নিজের অফিসে কাজ দিতে পারবেন, তবুও সেই "সামাজিক প্রথা" আজও দূর হলোনা।
সেদিন কথা উঠেছিল "কাস্ট সিস্টেম" বা "বর্ণ প্রথা" নিয়ে।
প্রসঙ্গটা উঠলেই আমরা চোখ বন্ধ করে হিন্দুদের উপর দোষ চাপিয়ে দেই। কেউ ব্রাক্ষণ হিসেবে জন্ম নিলে তার লটারি লেগে যায়, আর যদি কেউ শুদ্র হিসেবে জন্মায়, তাইলেই খেল খতম। ইংরেজিতে চমৎকারভাবে একটি বাক্যের সাহায্যে এ অবস্থার সঠিক বর্ণনা করা যায়, কিন্তু অশ্লীল বলে এখানে উল্লেখ করলাম না।
হিন্দু সমাজে ব্রাক্ষণের সাথে কায়স্থের বিয়ে সম্ভব না। একজন ব্রাক্ষণ যুবক যতই ফটকাবাজ হয়ে থাকুক না কেন, তিনি সমাজের এলিট হিসেবেই পরিচিত হবেন।
একজন কায়স্থ যুবক কঠোর পরিশ্রম করে, নিজ যোগ্যতায় দেশের প্রধাণমন্ত্রীও যদি হয়ে যান, একজন টোল পন্ডিতের মেয়েকে বিয়ে করার যোগ্যতা তিনি এই জন্মে অন্তত অর্জন করতে পারবেন না।
আর শুদ্ররাতো সব জাতের কাছেই অস্পৃশ্য।
আরেকটি জাত আছে, ক্ষত্রিয়, এরা যোদ্ধা জাত। এদের অবস্থানও ব্রাক্ষণদের কাছাকাছি। বাংলাদেশে আমার সাথে কোন ক্ষত্রিয়ের দেখা হয়নি। হয়তো এরা সবাই ভারতেই থাকে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বর্ণ প্রথা কী ইসলাম ধর্মে আছে?
উত্তর হচ্ছে, ইসলামে বর্ণ প্রথা নেই, তবে মুসলমানদের মধ্যে অবশ্যই চালু আছে।
আমার দাদী, যিনি জীবনেও এক ওয়াক্ত নামাজ বাদ দেননি, তিনি "সাবেক প্রজার" সাথে যেই আচরণ করলেন, সেটাকে বর্ণবাদী বলবেন নাতো কী বলবেন?
আরেকটা উদাহরণ দেই। আমার বোনের জন্য একবার এক ছেলের বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। লসএঞ্জেলেসে থাকেন। নিজের বাড়ি আছে। ভাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। দেখতেও সুন্দর। এমন এক ছেলের সাথে বাংলাদেশের যে কোন বাবা মা নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চাইবেন।
কিন্তু ছেলে রিজেক্টেড হয়ে গেল। কেন? কারন ছেলের দাদার বাবা, আমার দাদার বাবার (গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার) ঘোড়ার দেখাশোনা করতেন। ছেলের বাবা সময় মত অ্যামেরিকা এসে টাকা পয়সা কামিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করে ফেলেছেন। কিন্তু অবশ্যই 'চৌধুরী বাড়ির' মেয়েকে বিয়ে করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।
একটা বিষয়ে আমিও আমার পূর্বপুরুষদের সাথে একমত, বিয়ের সময়ে অবশ্যই ভাল পরিবারের খোঁজ খবর নেয়া উচিৎ। একটি ছেলে যদি দেখে তার বাবা তার মাকে মারধর করে, এবং তার মা অতি স্বাভাবিকভাবেই মার হজম করেন, তবে নব্বই শতাংশ সুযোগ রয়েছে, এই ছেলে কথায় কথায় তার বউকে পেটাবে।
একটি মেয়ে যদি দেখে তার মায়ের এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার আছে, এবং সে এটাকে 'পাপ' হিসেবে গন্য করেনা, তবে অতি অবশ্যই এই মেয়েরও সুযোগ রয়েছে বিয়ের পর পরকিয়া সম্পর্কে গড়ে তুলার।
আবার একটি ছেলে যদি এমন এক পরিবেশে বড় হয়ে থাকে, যেখানে মাগরিবের আযান শেষ হবার আগে পরিবারের সবাইকে ঘরে উপস্থিত থাকতেই হবে - সেই ছেলের 'বদ' হবার সুযোগ তুলনামূলকভাবে একটু কম।
নামের আগে সৈয়দ, দেওয়ান বা নামের পিছনে চৌধুরী, খন্দকারের সাথে এর কোন সম্পর্ক থাকা ঠিক নয়।
আমার দাদারা তাঁদের এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে ফেলেছিলেন একজন 'কমজাত নারীকে' বিয়ে করার দোষে। সেই মহিলা তাঁদের বাড়ির চাকরের মেয়ে ছিল - এইটাই দোষ।
আমাদের ধর্ম ইসলাম, যা আমাদের শিখায় মানুষকে তাঁর কর্মের বিনিময়ে বিচার করতে, আমরা কী তা করি?
ইসলাম শিক্ষা দেয় আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ), আমরা হিসাব করি কে আমাদের গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের চাকর ছিল!
আমার অনেক আত্মীয় আছেন, দেশে থাকতে যারা জীবনে কিছুই করতে পারেননি। লন্ডনে যাবার পরেও কিছু করেননা, কারন, চৌধুরীর ছেলে হয়ে রেস্টুরেন্টে কাজ করবেন? অসম্ভব!
বউ সারাদিন বাইরে বাইরে কাজ করে সংসারের খরচ যোগান, স্বামীরা ঘরে থেকে টিভি দেখেন, আর বাচ্চা সামলান। এতে "চৌধুরী" বাড়ির সম্মান খুউব অক্ষুন্ন থাকে।
মজার ব্যপার হলো, তাঁদের স্ত্রীদের এতে কোনই কমপ্লেইন নেই। চৌধুরী বাড়ির বউ হতে পেরেই যেন তাঁদের জীবন ধন্য হয়ে গেছে!
সিলেটে এই কারনেই বুঝিবা এখন সবার নামের পিছনেই "চৌধুরী" টাইটেল দেখা যায়। হাজী মোহাম্মদ মখলু মিয়ার পুত্রের নাম রাখা হয় "মোতালেব হুসেন চৌধুরী।" সবাই নাম দিয়েই জাতে উঠতে আগ্রহী, কাম দিয়ে নয়।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরো...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫২

বাংলাদেশের জেন-জি ইন্ডিয়ার ককরোচ.....

বিপ্লবের লক্ষ্য কী- পরিবর্তন, নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে জেন-জি স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে; কিন্তু প্রশ্ন- স্বৈরাচার গেছে, স্বৈরাচারী মানসিকতা কি গেছে?
যে তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র, অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে রাজপথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্য: পর্নের সেকাল একাল!

লিখেছেন গেছো দাদা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৬

গুরুত্বপূর্ণ একটা টপিক নিয়ে অনেকদিন ধরে লিখব লিখব করছিলাম। সময় হচ্ছিল না। আজ এই গভীর রাতে মনে হলো, লিখেই ফেলি। কেন মনে হলো, সে আলাপে আর না যাই। টপিক হলো:... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

হয়তো আজ টেলিফোনও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো স্মার্ট হতো!



একসময় মানুষের দূর-দূরান্তে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিফোন। মোবাইল ফোনের মতোই টেলিফোন দিয়ে কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×