শুরু হয়ে গেল রমজান মাস। সংযমের মাস। ইবাদাতের মাস। ড. ইয়াসির ক্বাদীর মতে, জীবনে আরেকটা রমজান মাস পেয়েছেন, এর মানে হচ্ছে আপনার প্রভু আপনাকে তাঁর ভিআইপি লিস্টে দেখতে চান। এখন এটা আপনার উপর যে আপনি নিজের নামকে সেই লিস্টে উঠাতে পারেন কিনা।
রমজান মাস মুসলিমদের জন্য উৎসবের মাস হবার কথা ছিল। এই মাসে কোরান নাজেল হয়েছে, এই মাসে একটা ভাল কাজের বিনিময়ে সত্তুরগুন বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। লায়লাতুল ক্বদরের রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। These are the deals on table.
কিন্তু আমাদের দেশে রমজান মাস মানেই আজাবের মাস।
বাস-রেলওয়ের টিকেট কিনতে যান। টিকিট চলে গেছে কালো বাজারীদের হাতে। দ্বিগুন, তিনগুন দামেও কেনা যাচ্ছেনা। সরকারী কর্মচারী, পিওন থেকে মন্ত্রী, সবাই ঈদ উপলক্ষ্যে ঘুষের পরিমান কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বাজারে আগুন ধরে যায়। ছোলা, বেগুন এমন কি কাঁচা মরিচ কেনার সময়েও কয়েকদফা হিসাব নিকাশ করতে হয়।
যে পাঞ্জাবির মূল্য এক হাজার টাকাও নয়, সেটাই দাম হাঁকা হচ্ছে দশ হাজার টাকা। এবং ক্রেতারাও অসহায়। "পুরানো জামা পড়ে ঈদের নামাজে যাব নাকি?"
কেউ কেউ অনায়াসেই লক্ষাধিক টাকার পাঞ্জাবি কিনে ফেলেন। কেন কিনেন? "আমার মনে হয়েছে এই পাঞ্জাবিতে আমাকে ভাল দেখাবে।"
রাস্তায় কফ থুথুর কারনে হাঁটাও যায়না। অথচ সহিহ হাদিস আছে, যে ব্যক্তি অপরের চলার পথের কাঁটা সরিয়ে দিবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এবং সেই সমস্ত মানুষ অভিশপ্ত, যারা অন্যের চলার পথে বা বিশ্রামের স্থানে মলমুত্র ত্যাগ করে।
হাদিসগুলো হিজরতের সময়ে মদিনার সংবিধান প্রস্তুতকালে নাজেল হয়েছিল।
আল্লাহ রমজান মাসকে শুধুই আপনাকে সারাদিন না খাইয়ে রাখার জন্য পাঠাননি। আপনি যাতে যাবতীয় কুকর্ম থেকে নিজেকে দূরে রাখেন সেই ট্রেনিং দিতেই এই মাসের অবতারণা করা হয়েছে।
আপনার জিহ্বা যেন পরচর্চা না করে, গালাগালি না করে, কুকথা না বলে, আপনার হাত যেন মানুষের অনিষ্ট না করে, চোখ যেন নারীর ব্লাউজে আটকে না থাকে, পা যেন খারাপ পাড়ায় না যায়, এবং কান যেন "গান্দি বাত" না শুনে।
আমরা কতখানি তা পালন করি?
সারাদিন না খেয়ে রোজা রাখছি ঠিকই, অথচ দিব্যি নির্লজ্জের মতন ঘুষের টাকা "স্যাপ দিয়ে গুনে" পকেটে ভরছি।
"এই মাসে বেশি বেশি করে কুরআন পড়ুন।" যে কেউ আপনাকে এই পরামর্শ দিবে। তবে তোতা পাখির মতন শব্দ আওরানো কুরআন নয়। যা পড়বেন, তা যেন বুঝে পড়েন। আলহামদুলিল্লাহ মানে যে "সকল প্রশংসা আল্লাহর" সেটা যেন আপনি জানেন।
একবার এক সাহাবী মদ্যপ অবস্থায় নামাজে ইমামতি করছিলেন। ফলে সুরাহ পাঠের সময়ে তাঁর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল, শব্দ ও আয়াত এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তখনও মদ নিষিদ্ধ করা হয়নি। এই ঘটনার পর বলা হলো, "মদ্যপ অবস্থায় নামাজে দাঁড়িও না।"
কেন? কারন, আল্লাহ চান আমরা যখন তাঁর বাণী পাঠ করি, আমরা যেন স্পষ্ট জ্ঞানে সব বুঝে শুনে পাঠ করি।
এখন আমরা এক ফোঁটাও মদ খাই না। তাই মাতাল হবার প্রশ্নই উঠেনা। কিন্তু যে উদ্দেশ্য মুখ্য ছিল, বুঝে শুনে কুরআন পাঠ, সেটা কতখানি অর্জন করতে পেরেছি?
খতমে তারাবিহতে প্রতিযোগিতা চলে কে কত আগে খতম দিতে পারে। আপনি জানেন, এক মাসে কুরআন খতম দেয়াটা জরুরী নয়, এটি স্রেফ একটি সুন্নত। আল্লাহ ইবাদতের "কোয়ালিটি" দেখেন, "কোয়ান্টিটি" নয়।
আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, আমাদের বাঙালিদের মাইরের চেয়ে অ্যাকশন সবসময়েই বেশি।
"কুরআন পাঠ করলেই চলবে কেমনে? তাফসির পাঠ করতে হবে। সাথে হাদিসও পাঠ করতে হবে। এইটা করতে হবে, ঐটা করতে হবে।"
ভাই, রিল্যাক্স! বোলিং করার জন্য খুব লম্বা রানআপ নিলে হুদাই হাপিয়ে উঠবেন। আগে লাইন লেন্থে মনোযোগ দেন, পেসটা বারুক, বোলিং অ্যাকশন-রান আপ এইসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে।
"তারাবিহর নামাজ বিশ রাকাত না আট রাকাত।" - এই নিয়েও প্রতি রমজানেই গন্ডগোল বাঁধে। এই গ্রুপ অন্য গ্রুপকে কাফির বলে গালাগালি করে।
সহিহ হাদিস আছে যে নবীজি (সঃ) নিজে আট রাকাত তারাবিহ পড়তেন, সাথে তিন রাকাত বিতর। তবে এটাও সহিহ হাদিস যে তিনি বলেছেন ইচ্ছে করলে বিশ-তিরিশ রাকাত নামাজও পড়া যাবে। ইবাদত লম্বা হলেই উত্তম।
কাজেই শান্ত মনে নিজের মসজিদের ঈমামকে ফলো করুন। তিনি বিশ রাকাত পড়ালে আপনি আট রাকাত পড়েই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাবেন না। তাইলে আম ছালা দুইটাই খোয়াবেন।
আবার কেউ যদি আট রাকাত পড়ান, তাহলে তিনি ভুল বলেও মনে খচখচানি রাখবেন না।
রমজান মাসের পবিত্রতা সবাইকে স্পর্শ করুক। আরও পবিত্র হয়ে উঠুক আমাদের মন।
ভুলে যাবেন না, ইসলাম ধর্ম মতে একটা হাসিও কিন্তু ইবাদত। হাসতে থাকুন। চারিদিকে হাস্যমুখী মানুষ দেখলে এমনিতেও সমাজ সুন্দর হয়ে উঠবে। আপনিই সেটা শুরু করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



