প্যারিসে হামলা হলো, এখন আইসিস বুঝবে ঠ্যালা কত ধানে কত চাল। ন্যাটোভুক্ত সব দেশ এখন আইসিস নির্মূল অভিযানে অংশগ্রহণে "বাধ্য"। প্যারিসেতো মাত্র দেড়শ লাশ পরেছে, এখন ইরাক ও সিরিয়া বুঝবে লাশের পাহাড় কাকে বলে। অ্যামেরিকা মশা নিধনের মতন আকাশ থেকে কয়েক হাজার টন বোমা ফেলে শহরের পর শহর নিশ্চিহ্ন করে দিবে। তারপর স্থলপথে সেনাবাহিনী এসে আসল যুদ্ধে আসল বদমাইশদের নিধন করবে। এর আগেরগুলো ছিল কোলাটেরাল ড্যামেজ।
মাঝে দিয়ে কয়েকটা মাথানষ্ট উন্মাদের জন্য হাজার হাজার নিরীহ জনগণ সর্বস্ব হারাবে।
খুব মজা! দে তালি!
অবশ্য তাঁদের কিছুই যাবে আসবেনা। প্যারিসের জন্য যেটা এক রাতের দুঃস্বপ্ন, সিরিয়া-ফিলিস্তিন-ইরাকের জন্য এটা প্রতিদিনের ব্যপার। মরতেতো তাঁদের এমনিতেও হতো।
ফিল পিটি ফর ইউ মাই রিফিউজি ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স! তোমরা জলেও মরবে, স্থলেও মরবে। তোমরা মুসলিমের হাতেও মরবে, অমুসলিমের হাতেও মরবে। তোমাদের বাচ্চারা ওপারে গিয়ে আল্লাহকে সব বলে দিলেও কারো কিচ্ছু যাবে আসবে না। তোমাদের সন্তানেরা এই পারের জীবনে অকাল মৃত্যুর অভিমানে মুখ থুবড়ে পরে থাকলেও কোন কিছুর বদল ঘটবে না। তোমরা ভুল সময়ে ভুল দেশে জন্মেছ। স্যরি ফর ইউ অল।
একটা বিষয় অনেকেই নোট করেছেন বলে আমার বিশ্বাস, প্যারিসে কনসার্ট হলে এলোপাথারি গুলি করা উন্মাদের দলগুলোর হাতে ছিল একে৪৭ রাইফেল, রাশিয়ান মেড। একটু খোঁজ নিন, জানতে পারবেন এই ফকিরগুলির হাতে এই দামী ও ভয়াবহ অস্ত্রগুলো তুলে দেয়ার পেছনে সরাসরি জড়িত আছে আমারই দেশ মহান অ্যামেরিকার কোন এক অস্ত্র দালাল। যুগে যুগে আমরা এক শত্রুকে দমন করতে Frankenstein সৃষ্টি করি, এবং প্রতিবারই ওরাই আমাদের পেছনে কামরাতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। তারপরও আমাদের বিদেশ নীতি কখনই শুধরায় না!
অ্যামেরিকা চাইলেই এইসব আইসিস ফাইসিস এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারে। সেই ক্ষমতা এই দেশটির আছে। কিন্তু প্রথম অধ্যায়েই যদি রাবন মরে যায়, তাহলে রামায়ণ লেখা হবে কিভাবে? আমাদের দেশের বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে এই অস্ত্র উৎপাদন, পৃথিবী যদি স্বপ্নের দেশে পরিণত হয়, কোথাও কোন যুদ্ধ না ঘটে, তাহলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চলবে কিভাবে? হাজার হাজার অ্যামেরিকান সৈন্যকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে, মিলিটারী চাকরি থেকে ডিসমিস করতে হবে - এদের নতুন চাকরি দিবে কে? ইকোনমির যে বারোটা বাজবে - কে আসবে আমাদের খাওয়াতে?
এরচেয়ে ভাল ওরা কামরাকামরি করে মরুক, আমার দেশের বর্ডারের বাইরে থাকলেইতো হলো।
অাহ্ রাজনীতি! আভিধানিক অর্থে সে ছিল রাজার নীতি! সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেই আমরা এর মধ্যে পলিটিক্স ঢুকিয়ে সব বর্বাদ করে দিয়েছি।
আরেকটা ব্যপার অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। প্যারিসে হামলাকারী বদমাইশগুলো যেমন মুসলিম, তেমনি এক উন্মাদ আত্মঘাতী হামলাকারীকে স্টেডিয়ামে ঢুকতে বাঁধা দেয়া পুলিশ অফিসারটিও ছিলেন একজন মুসলমান। এই বীরের কারনেই আরও কয়েকশো লোকের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। জোহের নামের এই লোকটির খবর কয়টা নিউজ কভার করেছে? খুব বেশি নয়।
আবারও বলি, সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই হয়ে থাকে, তার একটাই ধর্ম - সে সন্ত্রাসী। তার শাস্তিও একটি - ধরে ধরে ঝুলিয়ে দাও। ওদের সাথে আর কোন কথা নাই।
এবং সন্ত্রাসী হামলার শিকার মানুষ মানুষই হয়ে থাকে। তাঁকেও নয় মাস মাতৃগর্ভে থেকে জন্ম নিতে হয়। কষ্টে তাঁরও বুক ফেটে যায়, আনন্দে সেও হেসে উঠে খিলখিলিয়ে।
ধর্মের নামে মানুষ হত্যাকারীদের নিয়ে নতুন করে বলবার কিছুই নেই। এইসব ফ্যানাটিকদের হযরত উসমানের(রাঃ) গলায় ছুরি চালাবার সময়েও বুক কাঁপেনি, হযরত আলীর (রাঃ) হত্যার জন্যও এরাই দায়ী, হযরত হোসেইনকেও (রাঃ) কারবালায় মস্তকছিন্ন করেছিল এইসব উন্মাদের দল। আমি নিশ্চিত এইসব ঘটনায় প্রতিবারই আমাদের নবীজি (সঃ) স্বর্গের সর্বোচ্চ আসনে বসেও হাউমাউ করে কেঁদেছেন, এবং বারবার আফসোস করে বলেছেন, "আমিতো এই বাণী প্রচার করিনি!"
এরা তখনও ছিল, এইযুগেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহ ইবলিস সৃষ্টি করেছিলেন - ঘটনার পেছনের উইজডম বুঝতে খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।
প্যারিসে হামলার সাথে নাকি ওদের দেশেরই আইসিস সমর্থকরা জড়িত। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যপার হচ্ছে ইউরোপের সর্বত্র, এমন কি ইংল্যান্ডের মতন একটি দেশেরও ঝাকে ঝাকে যুবক এই আধুনিক ইবলিস, আইসিসের খাতায় নিজেদের নাম লেখাচ্ছে। এদের ছাগল না বলে আর কী নামে ডাকা যায় আমার মাথায় আসে না। এর কারনও মাত্র একটা - ফ্যামিলি আপব্রিংগিং। শুনেছি প্যারিসে হামলার পর নাকি সেখানে আইসিসের সমর্থনে সভা সেমিনার হয়েছে। যে সমস্ত মা বাবা তাদের সন্তানদের সামনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে সমর্থন করবে, তাদের সন্তানেরা সন্ত্রাসী হবে নাতো কী সুফী দরবেশ হবে? সাধারণ লজিক কী বলে?
এমন বহু নমক হারাম বাঙালিকে চিনি যারা ইংল্যান্ডে থেকে, কোন কাজ না করে, রানীর ভাতায় সংসার চালিয়ে সেই দেশেরই বদনাম করে বেড়ায়। বিশেষ করে বুড়ি রানীর। এতই যদি সমস্যা, তাহলে এই কাফির নাসারাদের দেশে পরে থাকা কেন? চলে যাও সাউদি অ্যারাবিয়া। সেখানেও সমস্যা - মেয়েদের একা ড্রাইভ করতে দেয়া হবে না। চুরি চামারি করা যাবেনা, সোজা হস্ত কর্তন। এবং তারচেয়েও বড় কথা, ওখানে সিটিজেনশিপ পাওয়া যাবেনা। যদি সেই দেশে জন্মও হয়, এবং তার ছেলের এবং নাতিরও জন্ম হয় - তারপরেও ওরা আরব থেকে যাবে, এবং আমাদের মাথা নষ্ট বাঙালিগুলি সারাজীবন "মিসকিন" থেকে যাবে।
আমার কথা হচ্ছে, যেই দেশ আমাদের থাকতে দিচ্ছে, জীবনের নিরাপত্তা দিচ্ছে, আমার নিরাপত্তার জন্য যেই দেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা বর্ডারে লড়ে মরছে - সেই দেশের নমকহারামি করতে এতটুকু সংকোচ হয় না? তাহলে সেই দেশে থাকা কেন?
এইদিকে আমরা দেশীয় বাঙালিরা ব্যস্ত কে প্রোফাইল পিকচার বদলালো কে বদলালো না তা নিয়ে। একদল আরেক দলকে মারায় কাটায় সময় ব্যয় করছি। ইতিহাস ঘেটে ঘেটে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি ফ্রান্সের ঘটনা আসলে ওদেরই কৃতকর্মের শাস্তি। আইসিস কেবল একটি বাহানা মাত্র।
সিরিয়ায়, ফিলিস্তিনে, ইরাকে এবং লেবাননে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে - তাই বলে প্যারিসে নিহত হওয়া মানুষের জন্য শোক প্রকাশ করা যাবেনা - এ কেমন মানসিকতা? সমদ্র সৈকতে ভেসে আসা নিস্পন্দ দেহটি যেমন একটি মানব শিশুর, আইফেল টাওয়ারের শহরের রাস্তায় বোমায় ছিন্ন হওয়া দেহটিও আরেক মানব শিশুর। আপনাদের সবাইকে অনুরোধ, প্লিজ, মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখুন! মানবতার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না।
আমি ভয়ে আছি যেদিন আমরা আল্লাহর মুখোমুখি দাঁড়াবো, তখন যদি তিনি বলেন, "আমি তোমাদের ভূমি দিয়েছিলাম, তোমরা তাতে দেশ বানিয়েছ। আমি তোমাদের আঙ্গুর দিয়েছিলাম, তোমরা তাকে মদ বানিয়েছ। আমি তোমাদের লাঠি দিয়েছিলাম, যাতে দুর্বলের চলতে পারতো, অন্ধেরা পথের দিশা পেত। তোমরা তা দিয়ে একে অপরের মাথা ফাটিয়েছ। আমি তোমাদের মস্তিস্ক দিয়েছিলাম যাতে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করতে পার - তোমরা সেই বুদ্ধি খরচ করে বুলেট, বন্দুক, বোমা বানিয়েছ! হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছিলাম। কেন তোমরা সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীবে পরিণত হলে?"
ইয়া আল্লাহ, প্রশ্নকর্তা যখন তুমিই, উত্তরটাও তুমিই শিখিয়ে দাও।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




