somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিরিয়া থেকে বগুরা

২৯ শে নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার ছেলের বয়স আগামী ডিসেম্বরের তিন তারিখে ছয় মাস হবে। এখনও দাঁত গজায়নি। এখনও সে বসতে পারেনা। কথা বলাতো এখনও বছর খানেক দূরের ব্যপার।
সে শুধু কাঁদতে ও হাসতে পারে। দুইটাই পিওরেস্ট ইমোশন। যখন কাঁদে, চোখ দিয়ে মোটা দানার অশ্রু গড়ায়। এবং যখন হাসে....এই হাসির লিখিত বর্ণনা দেয়ার মতন প্রতিভা আমার নেই। আমার ফেসবুকে তাঁর কিছু হাস্যোজ্জ্বল ছবি আছে, দেখে নিলে বুঝে নিবেন।
রাতে সে আমার এবং তাঁর মায়ের মাঝখানে ঘুমায়। ক্রিবে শোয়ানো নিয়ম, কিন্তু বাঙালি বাবা মা বলেই হয়তো বাচ্চা বুকে জড়িয়ে না শুলে নিজেদেরই ঘুম আসেনা।
সেও খুব শান্তিতে বাবা মায়ের মাঝখানে ঘুমায়। মাঝরাতে উঠে গলা ছেড়ে গান গায়। ঢুলু ঢুলু চোখে আমি আর তাঁর মা চেষ্টা করি আবারও ঘুম পাড়াতে। কিন্তু সে এতে আরও উৎসাহিত হয়ে গলা ছেড়ে দেয়।
ক্ষুধার্ত হলে সে দুধ খায়। খেতে খেতেই সে বারবার ফিরে ফিরে দেখে আমি তাঁর পাশে আছি কিনা। আমাকে দেখেই সে যে হাসি দেয়, শুধুমাত্র এই হাসি দেখার জন্য আমার হাজারটা বছর পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে।
তাঁর মা যখন বাড়িতে থাকেনা, তখন তাঁর চেহারা দেখেই বুঝা যায় সে পরিপূর্ণ সুখী নয়। মা আসলে সে যে হাসিটা দেয়, মায়ের প্রচন্ড কর্মব্যস্ত দিনের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তে দূর হয়ে যায়।
এই বয়সেই সে বুঝে গেছে বাবা মার যে কোন একজনের উপস্থিতি ছাড়া তাঁর পরিবার পূর্ণতা পায়না।
আমি নিশ্চিত, সন্তান আছে এমন প্রতিটা বাড়িতেই একই ঘটনা ঘটে।
মা, বাবা তাঁদের সন্তানের ছবি তুলে ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার বানান। সন্তানের ঘুমের সময় হলে জমজমাট আড্ডা ছেড়ে খুশি মনেই বাড়ি ফিরে যান। সন্তান অসুস্থ হলেতো কথাই নাই, দুনিয়া অন্ধকার!
জ্বী, আরও লাখ খানেক পরিবারের মতন আমরাও একটি সুখী পরিবার।
এবং এই সুখ চিরতরে ধ্বংস করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট।
আকাশ থেকে নেমে আসা একটি বোমা, কামান থেকে ছুটে আসা গোলা কিংবা একটি সামান্য বুলেট খুব সহজেই আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। হয়তো আমরা তিনজনই মারা যাব। কিংবা যে কোন একজন বেঁচে থাকবে বাকি দুইজনের স্মৃতি নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করতে।
জ্বী ভাই, প্যারিসে বোমা হামলায় এমন দেড়শটি পরিবার চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং এর বদলা নিতে সিরিয়ায় এখন প্রতিদিন হাজার খানেক পরিবার ধ্বংস হচ্ছে। এক দুইটা আইসিস সদস্য মারার জন্য আকাশ থেকে টনকে টন বোমা ফেলা হচ্ছে। তেলাপোকার মতন মানুষ মরছে।
হয়তো বাবার হাত ধরে বাজার করতে একটি শিশু বাড়ির বাইরে গিয়েছে। হঠাৎ সাইরেনের শব্দে বাবা তাঁকে নিয়ে দৌড় শুরু করলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ, এবং ধোঁয়া কেটে যেতেই দেখা গেল রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পিতাপুত্রের মৃতদেহ। বাড়িতে মহাতংকে অপেক্ষারত মায়ের অবস্থা কী কল্পনা করতে পারছেন? এরাও কিন্তু আইসিসকে দেখতে পারেনা। এরাও চায় আইসিস ধ্বংস হোক। প্রতিবেশীদের মতন তাঁদেরও ইচ্ছে হয় সমুদ্রে নৌকা ভাসিয়ে ভিনদেশে শরণার্থী হতে। কিন্তু মাতৃভূমির ভালবাসা বড় শক্ত পিছুটান হিসেবে কাজ করে! কে চায় চৌদ্দ পুরুষের ভিটে ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দিতে? শুন্য থেকে জীবন শুরু করা কী এতই সহজ?
আধুনিক বিশ্ব কিছু বুঝতে চায়না। সবার সহানুভূতি মিডিয়া কভারেজের উপর নির্ভরশীল। মিডিয়া যদি বলে প্যারিসের জন্য কাঁদো, সবাই অশ্রুর বন্যা ছুটিয়ে দিবে। মিডিয়া যদি বলে সিরিয়ায় বোমার আঘাতে টুকরো হয়ে যাওয়া ছয় বছরের নিচের শিশুটি একটি সন্ত্রাসী, সবাই চোখ বন্ধ করে তাঁকে ভর্ত্সনা করবে। মিডিয়া! আজকের যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ হাতিয়ার! এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ অতি সহজেই এর শিকার।
ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, লেবাননের অসহায় ভাই বোনদের জন্য একটাই দোয়া করতে পারি যা আমাদের নবীজি(সঃ) বলেছিলেন সুমাইয়া ইয়াসিরের (রাঃ) পরিবারকে, "ধৈর্য্য ধরো! আল্লাহর সাহায্য একদিন আসবেই।"
দোয়াটি আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও ব্যপকহারে প্রযোজ্য।
একবার এক স্কুল জীবনের বন্ধুর সাথে দেখা করতে তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসায় গিয়েছিলাম। ফেরার সময়ে আসরের নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল। তিন বন্ধুই ঢাকা শহরে মোটামুটি নতুন। মোহাম্মদপুরের কিছুই চিনিনা। মসজিদ দেখে ঢুকে গেলাম ভিতরে। পরে জেনেছি ওটা ছিল মোহাম্মদপুরের বিখ্যাত শিয়া মসজিদ। বগুরায় শিয়া মসজিদে বোমা হামলার ঘটনায় মনে পড়ছে সেই দিনটির কথা। যদি সেদিন মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদে বোমা হামলা হতো, তাহলে তিনটা সুন্নি ছেলেও মারা যেত। আমাদের কারও চেহারায় লেখা থাকেনা কে সুন্নি, কে শিয়া। বন্দুকের বুলেট বা বোমার স্প্লিন্টার কখনও বুঝতে পারেনা সামনের মানুষটি হিন্দু নাকি মুসলমান। সর্বক্ষেত্রেই মৃত মানুষটির একটি পরিবার থাকে। হয়তো সে কোন সন্তানের পিতা-মাতা, কিংবা সে নিজেই কারও সন্তান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একটি পরিবারের শান্তি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়!
অথচ কেউ বুঝতে চায়না!
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১২:০৫
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০০




গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য


সময়টা যেন হুট করেই থমকে যায়, যখন ইথারে ভেসে আসে সেই অতিপ্রাকৃত সুরের মূর্ছনা। চোখ বন্ধ করলেই মনের ক্যানভাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×