somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুনরুত্থান ঘটুক ওয়েস্টইন্ডিজ ক্রিকেটেরও।

১৭ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে যখন দুই অধিনায়ক টস করতে এলেন, তখন স্বাগতিক অধিনায়ক প্রতিপক্ষের অধিনায়ককে বলেন, "এটাই হতে পারে তোমার সাথে আমার শেষবারের মতন টস করতে আসা।"
সাউথ আফ্রিকা সিরিজের প্রতিটা ম্যাচে শোচনীয়ভাবে হেরে হোয়াইটওয়াশ হবার পর দেশের মাটিতেই অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে ভয়াবহ ব্যাটিং দুর্যোগ, দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র একান্ন রানে অল আউট হয়ে তিনশো বারো রানের পরাজয়ের পাহাড় একদম পিষে ফেলে দলটিকে। হোম সিরিজের আগেই বোর্ড নোটিস দিয়েছিল তাঁরা মাত্র দুই টেস্ট পর্যবেক্ষণ করবেন, যদি পরিস্থিতির বদল না ঘটে, তবে তৃতীয় টেস্টে নতুন অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর সাথে টস করতে নামবেন।
স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া কয়েক বছর ধরেই টেস্ট ক্রিকেটে অজেয় একটি দল। যদি ওয়ানডের মতন টেস্টেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ থাকতো, তবে অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপটাকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলত।
এই অবস্থায় ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক ব্রায়ান লারা যখন সিরিজ শুরুতেই ঘোষণা দেন "আমরা অস্ট্রেলিয়ার কাছে এই বছর সিরিজ হারবো না" - তখন প্রায় সবাই মুচকি মুচকি হেসেছিলেন। প্রথম টেস্ট পরে যে হাসি সরাসরি টিটকারিতে পাল্টে গিয়েছিল, "প্রথম টেস্টেতো অস্ট্রেলিয়া প্যান্ট খুলে নিল, এইবার না জাঙ্গিয়াটাও রেখে দেয়!"
লারার কথাটা শুনে স্টিভ ওয়াহ কেবল পিঠ চাপড়ে দিল। বিপক্ষ দলের সবচেয়ে বড় যোদ্ধার প্রতি সহানুভূতি। মাঠের লড়াইয়ে যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবেনা সেটা টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েই বুঝিয়ে দিল। অস্ট্রেলিয়া মাঠে নামে যুদ্ধ করতে, দান দক্ষিনা করতে হয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং তখন তলানিতে এসে ঠেকলেও বোলিংয়ে তখনও ব্যাটসম্যানদের রাতের ঘুম হারাম করতে এম্ব্রোস-ওয়ালস জুটি ছিলেন। তাঁদের তোপের মুখে অস্ট্রেলিয়া দুইশো ছাপ্পান্ন রানেই এটকে গেল। কিন্তু তাতেও নিশ্চিন্ত হবার কিছু নেই, আগের টেস্টের প্রথম ইনিংসে এরচেয়ে খুব বেশি রান ছিল না। উইন্ডিজের আসল "টেস্ট"তো তাঁদের ব্যাটিং। তা তারা এইবারও যথারীতি ব্যর্থ। দিন শেষে দলীয় স্কোর সাইত্রিশ, প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছেন চার চারজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। ক্রিজে আছেন অধিনায়ক লারা এবং নাইট ওয়াচম্যান কলিন্স, যে বুঝাই যাচ্ছে দুই দিনের মেহমান! ম্যাকগ্রা-ওয়ার্ন-গিলেস্পি-ম্যাকগিলদের সামনে দুই চার ওভারও টিকবে না।
সবাই ধরে নিলেন এটাই অধিনায়ক লারার শেষ ম্যাচ।
রবিবার, ১৪ই মার্চ, ১৯৯৯, সাবিনা পার্ক টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি লারা শুরু করেছিলেন ৭ রান দিয়ে, দিন শেষে তিনি ২১২ রানে অপরাজিত। ততক্ষণে ক্রিকেট বিশ্ব দেখে ফেলেছে ইতিহাসের সেরা টেস্ট ইনিংস। যদিও ক্রিকেট পন্ডিতদের মতে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সর্ব সেরা ইনিংসটি লারা খেলেন ঠিক তার পরের ম্যাচেই, কিন্তু লারার নিজের কাছে এই ২১৩ রানের ইনিংসটিই সবকিছু থেকে এগিয়ে। এই এক ইনিংস সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়াকে অন্তরিক্ষ থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছিল। এই এক ইনিংসই পাতালের অতল থেকে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটকে টেনে তুলে এনে মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে দিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার অতি অতি বিখ্যাত বোলিং লাইনআপ হতভম্ব হয়ে দেখেছিল একজন মানব কিভাবে অতিমানব হয়ে উঠতে পারে।
ওয়েস্টইন্ডিজ সেই টেস্ট জিতে যায় ১০ উইকেটে। পরের টেস্টও লারার আরেকটি অলৌকিক ইনিংসের কল্যানে তিনশোরও বেশি রান তাড়া করে এক উইকেট হাতে রেখে জিতে সিরিজে এগিয়ে যায়।
লারা তাঁর কথা রেখেছিলেন, সেই বছর ফ্র্যাংওরাল ট্রফি ওয়েস্টইন্ডিজ অস্ট্রেলিয়াকে বাড়িতে নিয়ে যেতে দেয়নি।
আমি আমার যেকোন গল্প এইভাবেই সাজাই। আমার গল্পের নায়ক নায়িকা বিরুদ্ধ স্রোত সাঁতরে জয়ী হন। আমার বিজয়ীদের নিয়ে গল্প লিখতে ভাল লাগে। কেউ যদি বলেন আমি কার কাছ থেকে আইডিয়া পাই - আমি বলবো আমাদের আশেপাশের বাস্তব মানুষের জীবন থেকে। বাস্তবের চেয়ে নাটকীয় ঘটনা বইয়ের পৃষ্ঠায় পাওয়া অসম্ভব।
এবং কেউ কেউ জানতে চান বাংলাদেশ বাদে কোন দলটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। উত্তর সাউথ আফ্রিকা, তবে সেটা ব্রায়ান লারার রিটায়ারমেন্টের পর।
আমার চোখে এখনও সর্বকালের সর্বসেরা ব্যাটসম্যানের নাম ব্রায়ান লারা। অন্যরা যতই রেকর্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি করুক না কেন, লারার ডিফেন্সিভ শট খেলার মধ্যেও শিল্প ঝরে ঝরে পড়ত। চাপের মুখে ব্রায়ান লারার মতন হারা ম্যাচ একাই বের করে আনার মতন ক্রিকেটার আজ পর্যন্ত মর্ত্যে পা ফেলেনি।
আমাদের জন্মেরও আগে একটা সময়ে এই ওয়েস্টইন্ডিজ পুরো ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করেছে। ওয়াসিম আকরাম সেদিন ভিভিয়ান "দ্য কিং" রিচার্ডসকে বললেন, "তোমাদের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগের রাতে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম আউট করাতো বহুদূর, তোমার হাতে যেন আমি পিটুনি না খাই।"
এই সেই রিচার্ডস যিনি জীবনেও হেলমেট পরে মাঠে নামেননি। প্রতিপক্ষে লিলি-টমসন-ইমরান-বোথাম আছেতো কী হয়েছে? ফাস্ট বোলার যদি দেখে ব্যাটসম্যান তাঁর ভয়ে মাথায় হেলমেট পরেছে, তাহলে সে সাহস পেয়ে মাথায় উঠে বসবে। সামান্য একটা চামড়ার বলের গতিকে অত পাত্তা দেয়ার কী আছে?
এই নাহলে তিনি কিং? মাঠেতো কত ব্যাটসম্যানই আসলো গেল, কয়জন কিং হতে পেরেছে? সম্রাট হতে হলে কেবল ভাল খেললেই হয়না, পার্সোনালিটিও দাপুটে হতে হয়।
মার্শাল, হোল্ডিং, গ্রিনিচ, সোবার্সরা যে কত ক্রিকেটারের দুঃসপ্নে হানা দিতেন তার হিসাব কে রাখবে? অথচ তাঁদের উত্তরসুরীদের যখন দেখি সবধরনের ক্রিকেটেই মার খেতে - তখন খুবই কষ্ট হয়। এককালের দোর্দন্ড প্রতাপশালী মহারাজাকে ভিখিরির বেশে দেখতে কারই বা ভাল লাগে?
কিন্তু এমনতো নয় যে ওদের ট্যালেন্টেড ক্রিকেটার নেই। ওদের ক্রিস গেইল, সুনীল নারীন, পোলার্ড, স্যামিরাইতো বিশ্ব জুড়ে টি২০'র ফেরিওয়ালা। গেইল যেমন গর্ব ভরে বলেন, "আমিই দেশে দেশে টি২০ লীগ তৈরী করি।" - কথাটাতো এক বিন্দুও মিথ্যে নয়।
গেইল না থাকলে সেই লীগ দেখার মজাই ফিকে হয়ে যায়।
কিছুদিন আগেই ওদের যুবদল আমাদের দেশের মাটি থেকে বিশ্বকাপ জিতে গেল। আমাদেরও হারিয়েছে, কিন্তু ফাইনালে ওদের জয়টা সেই কষ্ট দূর করেছে। আমরাতো অগা মগার কাছে হারিনি, টুর্নামেন্টে ওরাই চ্যাম্পিয়ন।
আজকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওদের বড় দলের দাপুটে কায়দায় জিততে দেখে এত ভাল লাগছে! ক্রিস গেইল সাতচল্লিশ বলে একশো করলো, এই নাহলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ! এই নাহলে লারার উত্তরসুরী!
তবে সবচেয়ে বড় ব্যপার আজকের তারিখটা।
১৬ই মার্চ ১৯৯৯ পোর্ট অফ স্পেনের সাবিনা পার্কে অধিনায়ক লারার ২১৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংসের জোরে ওয়েস্টইন্ডিজ সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল ১০ উইকেটে।
আজ ১৬ই মার্চ ২০১৬ তারিখে গেইল যেন মুম্বাইকেও সাবিনা পার্ক বানিয়ে ছাড়লেন।
গত বছর থেকেই ঈর্ষনীয় গতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থান ঘটছে। ক্রিকেট বিশ্ব এখন আর বলার সাহস পায় না "আমরা বাংলাদেশকে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছি না।" বরং মাশরাফির এগারোটা বাঘকে তুলনা করা হয় ৯৬এর অর্জুনা রানাতুঙ্গার দিগ্বিজয়ী সিংহদের সাথে। আমাদের সাব্বির, মাহমুদুল্লাহ, তামিমরা নিয়মিতই অন্য দেশের খেলোয়ারদের স্রষ্টার কাছে বাড়তি প্রার্থনা করতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশী হিসেবে অবশ্যই এতে গর্বিত।
তবে সেই সাথে পুরানো ভক্ত হিসেবে মনে প্রাণে চাই পুনরুত্থান ঘটুক ওয়েস্টইন্ডিজ ক্রিকেটেরও।
কর্পোরেট এবং পলিটিক্সের দাগে নোংরা হয়ে যাওয়া ক্রিকেটের সৌন্দর্য্য ফিরিয়ে আনতে নকশী কাঁথার পাশাপাশি ক্যারিবিয়ান ঝড়েরও বিকল্প নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ২:৪৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, ছেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২১

মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। কুমিল্লার এমনই একটি ঘটনার কথা বলেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা -

কুমিল্লা শহরের উত্তর দিকে রসুল আহমদ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের সীমা (জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা!)

লিখেছেন আবু সিদ, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০

“সুন্দর শব্দ মধুচক্রের মতো, আত্মার জন্য সুমিষ্ট এবং অস্থির জন্য আরোগ্য।” — প্রবচন ১৬:২৪, বাইবেল

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হলেই হাজারো শব্দ উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আমাদের কানে। দূর ও নিকট... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন কর্মী ও তার ন্যায্য পাওনা

লিখেছেন কিরকুট, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিনিয়োগ, মুনাফা, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্যোক্তার ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মীর শ্রম নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×