আমার জন্ম চিটাগংয়ে, মে মাসে। যেখানে প্রতিবছর এই মে মাসেই নিয়ম করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, এবং যাবার সময়ে হাজার খানেক প্রাণ নিয়ে যায়। ১৯৯১ সালের একটি ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটেছিল চট্টগ্রামে। আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, এবং মস্তিষ্কের ক্ষমতা এত তীব্র নয় যে ছবির মতন সব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলবে। তবুও মনে পড়ে ঝড়ের কবলে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বাসার উল্টোদিকের মসজিদ-কবরস্থানের বুড়ো আমগাছ। এক হাটু জল জমেছিল সামনের রাস্তায়। শহরে বিদ্যুৎ ছিল না প্রায় একমাস। টিভি টাওয়ার মাঝ বরাবর ভেঙে গিয়েছিল। মৃতের সংখ্যা কত ছিল মনে নেই, তবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণবায়ু সে ঝড় কেড়ে নিয়েছিল - এটি মনে আছে। এখনও একটি দৃশ্য চোখ বুজলে দেখতে পাই, একটি গাছের চূড়ায় একজন নগ্ন পুরুষের মরদেহ। নিজের বাড়ি থেকে উড়িয়ে এনে গাছে আছড়ে মেরেছে প্রলয়ংকরী ঝড়।
পানি ছিল না খাবার। এক দাদির বাসার টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যেতে হতো।
হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে গিয়েছিল সেদিন। কোন খাবার নেই। কোন পানি নেই। সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটেছে এমন।
আমার জন্মদিন সেবার পালন করেছিলাম রুটি এবং গুড় বিতরণ করে। বুয়া রুটি বেলে যাচ্ছে, মা চুলায় রুটি সেঁকছেন, সেকা রুটি কাগজের কার্টুনে ভরছে আমাদের এপার্টমেন্টের দারোয়ান জামাল ভাই। বাবা মাত্রই বাজার থেকে গুড় কিনে ফিরলেন।
শুনলাম এইবার দেশের একটি অঞ্চলের বিশহাজার লোক শত অনুনয় বিনয় সত্বেও আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে রাজি হননি। প্রবলমাত্রার ঝড় আঘাত হানলে সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে জেনেও।
তাঁরা কেন যায়নি সেটা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। প্রাণ বাঁচলে তারপরেই না সম্পদ।
হয়তোবা তাঁরা শেকড়ের টানেই নিশ্চিৎ মৃত্যু জেনেও থেকে গেছেন। বাস্তুভিটা তলিয়ে গেলে তাঁদের যে আর কিছুই থাকেনা!
আমার এক নিকটাত্মীয়ের বড়ভাই ভেসে গিয়েছিল ঘূর্ণিঝড়ের স্রোতে। সেই সত্তুরের দশকের কথা। মা কিছুতেই ধরে রাখতে পারলেন না তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে। বাকিটা জীবন আর সেই মা কিছুতেই নিজের স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেননি।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হাজার হাজার প্রাণ যায়, হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ একে নিয়ে হাসি মজাক তামাশা করতে পারেনা। কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষ্যে এই দুর্যোগ নিয়ে হাসি মজাক তামাশা করা সম্ভব নয়। যারা করেন, তাঁদের মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করেনা।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১৭ রাত ৯:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



