somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিধবা? ডিভোর্সি? বিপত্নিক? বিয়ে করতে চাও? সর্বনাশ!

২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দেশের খুব কমন একটা দৃশ্য বর্ননা করি।
ধরা যাক মুনিয়ার স্বামী সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। জাতিসংঘ মিশনে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তাঁদের সংসারের বয়স মাত্র দুই বছর, তাঁদের ছয়মাসের একটি সন্তান আছে। বোঝাই যাচ্ছে মুনিয়ার বয়স বিশের ঘরেই আছে, সামনে তাঁর একটা বিরাট লম্বা জীবন পরে আছে, তাঁর মতন একটি মেয়ের সিঙ্গেল জীবন কাটানো খুবই অন্যায়। কাজেই তাঁর বিয়ে করা উচিৎ।
কিংবা ধরা যাক মালতির ডিভোর্স হয়েছে। স্বামীর অনেক দোষ ত্রুটি ছিল, কোনভাবেই কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। এখন বাধ্য হয়েই ডিভোর্স নেয়া। কিন্তু তাঁর সাথে তাঁর দুই সন্তান আছে, যাদের সে স্বামীর হাতে তুলে দিতে চায়না। এখন তাঁরও বয়স কম, এবং তাঁরও বিয়ে করা উচিৎ।
এখানে বাঙালি সমাজে কয়েকটা সমস্যার সৃষ্টি হবে। নানান গুণী তাঁদের বিজ্ঞ মতামত নিয়ে হাজির হবেন।
১. বিধবা মেয়ে কেন বিয়ে করবে? কয়টা ব্যাটার সাথে শুইতে চায়? তাঁর উচিৎ সেই স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে একটা জীবন পার করে দেয়া।
২. বিধবা মেয়ে? এক স্বামী খেয়ে সাধ মিটে নাই। এখন আরেক স্বামীর প্রাণ খেতে চায়। রাক্ষসী কোথাকার! কুফা! এই মেয়ের বিয়ে করাই উচিৎ নয়।
৩. বিধবা মেয়ে...সে কী আর সিঙ্গেল ছেলে পাবে? ওর জন্য খোঁজ আরেকটা বিপত্নীক বা ডিভোর্সি ছেলে।
যদি সম্বন্ধ আসা কোন ছেলেকে সে ফিরিয়ে দেয় -
৪. তুই হচ্ছিস বিধবা/ডিভোর্সি। তোরে যে বিয়ে করতে চাইছে, এইতো তোর চৌদ্দ পুরুষের ভাগ্য! তুই ফেরানোর কে? কী মনে করিস নিজেরে?

এবং যদিও বা কথাবার্তা এগুনো শুরু করে, তাহলে ১০০ এর মধ্যে নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাবে ছেলের বাড়ির লোকেরা শর্ত দিবে মেয়ে তাঁর আগের ঘরের সন্তানকে আনতে পারবে না। খুব কম পুরুষ/নারী তাঁর পার্টনারের আগের ঘরের সন্তানদের নিজের সন্তানের মতন ভালবাসতে পারে। আমি বলবো তাঁদের কলিজা বিশাল। তাঁদের পেলে বুট ঠুকে স্যালুট দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবেন।

পুরুষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি অত সহজ নয়। বিপত্নীক পুরুষ মানেই সেকেন্ড হ্যান্ড মাল, বিয়ের পাত্র হিসেবে ডিমান্ড কম। সিঙ্গেল মেয়েরা তাঁদের কেবল আগের বিয়ের রেকর্ডের কারণেই বিয়ে করবে না। এবং যদি সেই ছেলের আগের ঘরের সন্তান থাকে, তাইলেতো কথাই নাই। সেই শিশুগুলোর স্থান হয় এতিম খানায় কিংবা দাদা দাদি/নানা নানীর বাসায়।

আমার একটা বাচ্চা আছে, আল্লাহ না করুক, কালকে আমার স্ত্রী যদি গত হয়, এবং আমাকে আরেকটা বিয়ে করতে হয়, স্বয়ং ঐশ্বরিয়া রায়ও যদি এসে বলে আমার ছেলেকে ছেড়ে তাঁর সংসারে যেতে, আমি বলবো, আসসালামু আলাইকুম।
সেটা কোন ভালবাসাবাসির সংসার হবেনা, যদি আসলেই হতো, তাহলে অবশ্যই সে আমার আগের ঘরের বাচ্চাকে নিজের বাচ্চার মতোই স্নেহ করতো, আমিও তাঁর আরাধ্যকে নিজের মেয়ের চোখেই দেখতাম।
যেই ছেলে/মেয়ে আশা করে বাবা মাকে তাঁদের সন্তান থেকে আলাদা করে নিজের ভালবাসা দিয়ে পুষিয়ে দিতে পারবে, তার চেয়ে বড় আহাম্মক পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং নিজের নতুন জীবন সঙ্গীর মন পাবার সবচেয়ে সহজতম মাধ্যম হচ্ছে তাঁর সন্তানদের মন পাওয়া।
বিদেশে আমরা অনেক সময়ই অবাক হয়ে দেখি কিভাবে এখানে একেকজন আরেকজনের বাচ্চাকাচ্চাদের নিজের বাচ্চার মতোই বড় করেন। উইকেন্ডে স্টেপ ড্যাড সকার প্র্যাকটিসে নিয়ে যাচ্ছেন তো স্টেপ মমের সাথে বাচ্চারা যাচ্ছে সুইমিং প্র্যাকটিসে।
দেশে কেউ কেউ আবার বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স নিয়েও মুলামুলি করে। আমার বন্ধুর পার্টনারের বয়স এত, আমি যদি এত বয়স্ক একজনকে বিয়ে করি, তাহলে লোকে কী বলবে? আরে, বিয়েটা কী আমি করবো নাকি লোকে করবে? আমি দেখবো আমি আমার পার্টনারের মধ্যে কী চাই সেটা, তাঁর বয়স এখানে ম্যাটার করবে কেন? আমি চল্লিশ বছরের ধামরা ব্যাটাকেও ইমম্যাচিওর আচরণ করতে দেখেছি, আবার তেইশ চব্বিশ বছরের তরুণীর ম্যাচুরিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আবার উল্টোটাই স্বাভাবিক। আমাকে বুঝতে হবে আমি কেমন পার্টনার চাইছি।

এখন আসা যাক ইসলামিক উদাহরণে। কারন এই ব্যাপারটাও আমাদের বাংলাদেশি সামাজিক ব্যাপার। ধর্মে এর অস্তিত্ব নেই।
আমাদের নবীজি (সঃ) প্রথম বিয়ে করেন হজরত খাদিজাকে (রাঃ)। বয়সে বড় এক নারী (সবাই জানে তাঁর বয়স ছিল ৪০ বছর, আমার জানা মতে ২৮, পরে এ নিয়ে আলোচনা করা যাবে) বিধবা এবং সন্তানের মা। নবী (সঃ) সেই মহিলার সাথেই জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন। তাঁর গর্ভেই নবীজির কমপক্ষে ৬ সন্তানের জন্ম হয়েছে। তাঁর প্রেম এতটাই গভীর ছিল যে তাঁর মৃত্যুর বহুবছর পরেও যখন নবীর বাড়িতে মাংস রান্না হতো, তিনি তাঁর থেকে দুয়েক টুকরা হজরত খাদিজার (রাঃ) বান্ধবী বা প্রিয়জনদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। হজরত খাদিজার (রাঃ) বোনের পদধ্বনির সাথে নিজের বহুবছর আগে মৃতা স্ত্রীর পদধ্বনির মিল পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। হজরত আয়েশা (রাঃ) নিজেই বলেছেন যে তিনি কখনই হজরত খাদিজাকে (রাঃ) দেখেননি, কিন্তু তারপরেও তাঁর প্রতি নবীর (সাঃ) ভালবাসা দেখে সেই মহিলাকে তিনি প্রচন্ড হিংসা করতেন।
রাসূলের এক স্ত্রী ছিলেন উম্মে সালামা (রাঃ)। সেই মহিলার বিয়ে হয়েছিল আবু সালামার (রাঃ) সাথে। এবং আবু সালামের মৃত্যুর পরে আবু বকরেরও বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এই মহিলা। (তখনকার সময়ে সিঙ্গেল থাকার কনসেপ্টই ছিল না। বিধবা হলে আবার বিয়ে করো, কোনই সমস্যা নাই। বাঙালিদের মতন সমাজ কানাঘুষা করবেনা।)
তখন রাসূল (সঃ) নিজে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান।
উম্মে সালামা বললেন, "আমার তিনটা শর্ত আছে।"
নবীজি (সঃ) বললেন, "শোনাও তাহলে তোমার শর্ত।"
তিনি বললেন, "আমি একজন নারী, এবং আমার ঈর্ষা রোগ আছে। আমি চিন্তিত এই নিয়ে যে আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের প্রতি আমার ঈর্ষা আপনার অসন্তুষ্টির কারন হতে পারে।"
নবীজি (সঃ) বললেন, "আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো। তোমার ঈর্ষা রোগ যেন সেরে উঠে।"
"আমার বয়স বাড়ছে। দ্রুতই আমি বার্ধক্যে পতিত হবো।"
"আমিও তোমার মতন একই দুর্যোগে আক্রান্ত।" (তিনি লিটারেলি এই বাক্যটিই বলেছিলেন। তিনি মাঝেমাঝে রসিকতাও করতেন)
"তোমার তৃতীয় শর্ত বলো।"
"আমার পরিবার আছে। তাঁদেরও দায়িত্ব নিতে হবে আপনার।"
"তোমার পরিবার আজ থেকে আমারও পরিবার।"
এবং তারপর চতুর্থ হিজরী সনের কোন এক মাসে উম্মে সালামার (রাঃ) সাথে নবীজির (সাঃ) বিয়ে হয়।
দেখুন, এখানে উল্লেখযোগ্য পয়েন্টগুলো। মহিলার বয়স অনেক, মহিলার আগেও সন্তান ছিল। সাধারণ বাঙালি মুসলমান নারীর এই অবস্থা হলে বাঙালি মুসলমান ভাই কী করতেন? টাটা বাইবাই।
নবী (সঃ) শুধু শুধু সবার জন্য উদাহরণ নন।
কেউ কেউ রাসূলের (সঃ) উদাহরণে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা আলীকে (রাঃ) খুব মানেন। সেই হজরত আলীর ঘরেই আবু বকরের বিধবা স্ত্রী বধূ হিসেবে এসেছিলেন। মুহাম্মদ বিন আবুবকর হজরত আলীর (রাঃ) ঘরেই বড় হয়েছিলেন। সাহাবীদের প্রায় প্রেত্যেকেই এমন উদাহরণ। সবাই বিধবা কিংবা ডিভোর্সি মহিলা বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের আগের সন্তানদের আপন করে নিয়েছিলেন।
তো - ধর্মের নামে আমরা মাঝেমাঝে একদম উন্মাদ হয়ে যাই। হালাল হারাম নিয়ে তুলকালাম ঘটিয়ে দেই। তাহলে আমাদের সমাজে বিদ্যমান এইসব অধর্মগুলোকে কেন প্রশ্রয় দেই? নিজেরা সুবিধা ভোগ করবো বলে? যতক্ষণ না নিজের ঘরে এসে পরে ততক্ষন চুপ থাকি? একটা হলিউড সিনেমায় একটা কালজয়ী ডায়লগ শুনেছিলাম, সেটাই এখানে এপ্লিকেবল।
অ্যামেরিকান ক্যাথলিক চার্চগুলোতে শিশু যৌন নির্যাতনের উপর বানানো সেই সিনেমায় একজন বলে উঠেন, "যদি একটি শিশুকে সেক্সুয়ালি এবিউজ না করতে একটি গ্রামের সবাইকে একত্র করার প্রয়োজন হয়, তাহলে একটি শিশুকে সেক্সুয়ালি এবিউজ করতেও আস্ত গ্রামবাসীর সহযোগিতা লাগে।"
মানেটা খুব পরিষ্কার। অন্যায় হতে দেখে আমি চুপ করে আছি, মানে সেই অন্যায়ে আমার সমর্থন আছে। যারা চুপ করে আছেন, সবার সমর্থন আছে। পুরো দেশ চুপ করে থাকলে পুরো দেশের সমর্থন আছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ২:৫৩
২১টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে বিলের কোনো রসিদ নেই

লিখেছেন রাজসোহান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৪



ঢাকার পাইপলাইন গ্রাহকদের একটা বড় অংশ এই জুলাইয়ে জানিয়েছেন, দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি গ্যাস তাঁরা পান না। সেই এক-দুই ঘণ্টাও আসে গভীর রাতে কিংবা ভোরের আগে। ফলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি।

একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট : পর্ব- ১

ভুমিকা
১.১ গবেষণার পটভূমি
একবিংশ শতাব্দীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×