খলিফা উমারের (রাঃ) একটা স্বভাবের ব্যাপারে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তিনি গভীর রাতে অতি সাধারণ বেশে মানুষের অবস্থা দেখতে বেরুতেন। আফসোস, ক্ষমতায় গিয়ে কেউই সেটা ফলো করার চেষ্টা করিনা। আকবর দ্য গ্রেট অবশ্য করতেন মাঝে মাঝে। বা এখানে ওখানে দুয়েকজনও হয়তো করেছেন - কিন্তু উমারের (রাঃ) স্টাইলই অন্যরকম।
যাই হোক, একদিন এক বেদুইন নারীর তাবুর পাশ দিয়ে যাবার সময়ে দেখলেন মহিলা হাড়িতে খাবার চড়িয়েছে, তাঁর শিশুরা শুয়ে শুয়ে খাবারের অপেক্ষা করছে। মহিলার চোখে কষ্টের ছাপ খলিফা স্পষ্ট দেখতে পেলেন। তিনি গল্প করতে থামলেন। সেই যুগটা এমনই ছিল। পথিক রাস্তায় যেকোন বাড়ির আতিথ্য নিতে পারতো। যে হোস্ট করতো, সে এই জনসেবাকে অতি সম্মানের চোখে দেখতো।
তা রান্না হতে হতে মহিলার একে একে সবশিশু ঘুমিয়ে যাচ্ছে।
খলিফা জানতে চাইলেন, "তুমি চুলায় কী চড়িয়েছো যে সিদ্ধই হচ্ছে না? তোমার বাচ্চারা না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছে।"
মহিলা বললেন, "আমার বাড়িতে কিছু নেই। হাঁড়িতে পাথর সিদ্ধ বসিয়েছি। যাতে আমার বাচ্চারা এই আশায় ঘুমিয়ে পরে যে মা তাঁদের জন্য খাবার তৈরী করছে।"
মহিলা ফুঁপিয়ে উঠলেন। নিজের কোলের শিশুরা অভুক্ত আছে, অথচ তাঁর কিছুই করার ক্ষমতা নেই - এই বোধটা যে কত কষ্টের সেটা বাবা মা ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারবেনা।
উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, "খলিফা উমারের শাসনে তোমার এই দুরবস্থা কেন? ও কী জানে তোমার এই হালের কথা?"
মহিলা তেজি স্বরে বললেন, "যদি খলিফা না জানে যে তাঁর রাজ্যে শিশুরা অভুক্ত হয়ে ঘুমাতে যায় - তাহলে কোন যুক্তিতে সে খলিফা হয়েছে?"
কথাটা একদম তলোয়ার হয়ে উমারের (রাঃ) কলিজায় লাগলো।
তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন। রাষ্ট্রীয় খাদ্যভাণ্ডার থেকে এক বস্তা আটা কাঁধে তুলে নিলেন। তাঁর সাহায্যে লোক এগিয়ে এলে তিনি ধমক দিয়ে বললেন, "কেয়ামতের দিন কী তুমি আমার পাপের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিবে?"
সবাই নির্বাক হয়ে পিছিয়ে গেল।
সেই গভীর রাতে আমিরুল মু'মিনিন আটার বস্তা কাঁধে রওনা হলেন সেই বেদুইন মহিলার কাছে। নিজে বস্তা থেকে আটা বের করে নিজেই রান্না শুরু করলেন। আগুনের ছিটা এসে তাঁর দাড়ি পুড়িয়ে দিল। তিনি তবু নিজ হাতে সবার জন্য রুটি বানালেন। একে একে প্রতিটা শিশুকে ঘুম থেকে জাগালেন। তাঁদের পেট ভরে খাওয়ালেন। খেললেন তাঁদের সাথে। তারপরে তাঁদের ঘুম পাড়িয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
একজন জিজ্ঞেস করলেন, শুধু খাবার খাইয়ে দিলেইতো হতো। এত কিছু করার কী প্রয়োজন ছিল?
তিনি বললেন, "আমি নিশ্চিত করতে চাইছিলাম উমারের (রাঃ) শাসনামলে কোন শিশু যাতে ব্যথিত মনে রাতে ঘুমাতে না যায়।"
আমাদের মিমের বাবা জাহাঙ্গীর মিয়ার একটি কথা কালকে খুব খারাপ লাগলো। ‘আমি একজন বাস চালক। আমার মেয়ে মারা যাবার ঘটনা সবাই জাইনা গেছে। অথচ যে কোম্পানির বাস ইচ্ছা কইরা মারলো বাচ্চা দুইটাকে তারা কেউ আসলো না। মালিকপক্ষ দেখছে, পরিবহনের নেতৃবৃন্দরা দেখছে, ফেডারেশনের ভালো নেতৃবৃন্দরা দেখছে, কেউ শান্ত্বনা দিতে আইলো না। কেউ বললো না-তোমার মেয়েডারে আর ফেরত দিত পারমু না, কিন্তু তুমি শান্ত হও, বিচার চাও।’
এই কথাগুলো কিছুক্ষন পরপর মাথায় বাজতে লাগলো। কোথায় একজন খলিফা কয়েকটা বেদুইন শিশু যাতে শান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারে সেজন্য এত পরিশ্রম করলেন, আর কোথায় আমাদের মন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, "ভারতে তেত্রিশজন মারা গেছে আর আমাদের দুইজন....."
একটা সাধারণ সান্তনার বাক্য কী লোকটা ডিজার্ভ করে না? আজকে শুনলাম মাত্র দশ-বিশ হাজার টাকা দিয়ে মামলার দফারফা করতে চায় "জাবালে নূর" কর্তৃপক্ষ। পরিবহন আইনে এই নাকি আমাদের দেশে শাস্তির বিধান। বাহ্! দারুনতো। মন্ত্রী সাহেবকে লাইনে দাঁড় করিয়ে তার গুষ্ঠির উপর দিয়ে বাস চালিয়ে দিয়ে জনপ্রতি দশ হাজার টাকা দিয়ে দিলেই হবে। আইন বলে কথা!
কারো সন্তানকে যখন হত্যা করা হয়, গোটা পৃথিবীর ধন রত্ন দিয়ে তাঁকে ডুবিয়ে দিলেও কী "ক্ষতিপূরণ" দেয়া সম্ভব? নির্বোধের দলের এই বোধ কবে আসবে?
ছাত্ররা প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছে, বাস ড্রাইভারদের লাইসেন্স চেক করছে নিজ উদ্যোগে। একমাত্র তেজগাঁও থানার পুলিশ বাদে মোটামুটি সবাই একদম ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁদের উপর। নিরাপদ সড়কের দাবি করাটাই কী এখন দেশের সবচেয়ে বড় অপরাধ? লাঠিপেটা করা হচ্ছে ওদের, ছাত্রের মাথা ফাটানো ভিডিও দেখলাম একটা। পিটি শুতে রক্তের ছোপ দেখে বুক কেঁপে উঠলো। মন্ত্রী এমপির বাচ্চা "মানুষ" - আর সাধারনের বাচ্চারা কী কীটপতঙ্গ? এরোসল স্প্রে করে সবকটাকে শেষ করে দিতে হবে?
কত সহজেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারতো সরকার! অথচ কী করা হচ্ছে এখন!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০১৮ রাত ৩:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


