মাঝে মাঝে আমাদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ইচ্ছা করে বিদেশের সবকিছু ছেড়েছুড়ে দেশে ফেরত যাই। তারপরেই দেশের পত্রপত্রিকা আমাদের ভুল ভাঙ্গায়। চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় প্রবাসী হবার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। পারলে দেশ থেকে যতজনকে পারো বিদেশে সরিয়ে নাও। নিজের বাচ্চার সুন্দর স্বাভাবিক সুস্থ জীবনের জন্য দেশে ফেরত যেও না।
ফেসবুকের ছবি, ভিডিওর কথা বলছি না। ওসবের এডিটিং করা যায় এইটা আমিও জানি। লোকজন প্যানিক করে দড়িকে অ্যানাকোন্ডা বানিয়ে ফেলে - এও জানি। আমি তাই মেইন স্ট্রিম মিডিয়াতে খবর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। মিথ্যা প্রচারে আমাদের নবীর (সঃ) কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। ওটা মেনে চলার চেষ্টা করি আর কি।
আজকে মেইন স্ট্রিম মিডিয়াতে প্রকাশ হওয়া ভিডিওতে দেখলাম হেলমেট মাথায় একদল যুবক ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর আগে মিরপুরে দেখেছিলাম "অজ্ঞাত" পরিচয়ের কিছু যুবক পুলিশের সাথে মিলে ছাত্রদের মারধর করেছিল।
দালাল-এ-আওয়ামীলীগ দাবি করছে ওসব বিএনপির পোলাপান করেছে, বিএনপিতো বলবেই ওটা ছাত্রলীগের কাজ।
বিবিসিও রিপোর্ট করেছে unidentified বলে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে পুলিশ ওদের আইডেন্টিফাই করে ফেলেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালনই ওদের আইডি। ছাত্রলীগ যদি নাও হয়, সরকারেরই যে কোন দলের লোকজন এইটা বুঝতে শার্লক হোম্স হওয়া লাগেনা।
আহাম্মকের দল, ঠিকভাবে প্ল্যানও করতে পারে না। পুলিশ ভাইদের বলবে না যে "আপনারা পারলে আমাদের মিছেমিছি বাধা দেয়ার নাটক করবেন, যাতে আমাদের মুখোশ খুলে না যায়।"
এফডিসির বি গ্রেড সিনেমার পরিচালকওতো এরচেয়ে সুন্দর নাটক সাজিয়ে দিতে পারতো। এরা এমন বেকুব কেন?
আওয়ামীলীগ কার্যায়লে আক্রমনের কাজটাও বিএনপির পোলাপান করে ফেলেছে। এই চান্সে ভাংচুর টাঙচুর যা করার করে ফেলো - সব দোষ গিয়ে পরবে ঐ ছাত্রদের ওপর। #নিরাপদ_সড়ক_চাই আন্দোলনকে সরকার পতন আন্দোলন বানাবার চেষ্টা করছে বারবার। ছাত্ররাই যেহেতু আন্দোলন শুরু করেছে, ওরাই সিদ্ধান্ত নিক ওরা একে কোন দিকে মোড় নেয়াবে। মাঝে দিয়ে সব ক্রেডিট নেয়ার জন্য ধান্ধাবাজেরা ঢুকে যাবার চেষ্টা করছে।
কালকে সাকিব আল হাসানের ভিডিওটা দেখলাম। আল্লাদি কণ্ঠে কোমলমতি ভাইবোনদের বাড়িতে ফিরে যেতে বলছেন। এর আগে মন্ত্রী মিনিস্টাররাও মাথায় হাত বুলিয়ে "কোমলমতি শিশুদের" ঘরে ফেরাতে বাণী দিয়েছেন। সাকিবের কথা তাদের মতই শোনালো।
আহারে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার! মাঠের খেলা সাইডে ফেলে সরকারের দালালিতে নেমে গেলেন। এতই যদি খোঁজ রাখেন দেশের তাহলে এইটাও তাঁর জানার কথা এত আন্দোলনের পরেও মাত্র তেইশ ঘন্টায় এগারোজনকে যানবাহন চাপিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। এরা কাজ অসম্পূর্ন রেখে আজ ঘরে ফিরে গেলে কালকে তাঁর নিজেরও কোন নিকটাত্মীয়ের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ সে শুনবে।
এবারেই প্রথমবারের মতন তাঁর হাসিমুখ দেখে রাগে গা জ্বলে গেল। সামনে কোন এক নির্বাচনে এমপি পদে দাঁড়াতে আগ্রহী সেটা আগে শুনেছিলাম। পাকিস্তানে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। সাকিব কি ইমরানের চেয়ে কম ভাল প্লেয়ার? ওরওতো মনে সাধ জাগে ওর গাড়ির উপরেও লাল বাত্তি জ্বলবে। জ্যামের রাস্তাতেও উল্টো পথ দিয়ে হলেও হুঁশ করে সে বেরিয়ে যাবে।
কাউকে কাউকে দেখছি আসলেই বলে বেড়াতে, "অনেকতো হলো - এইবার বাড়িতে ফেরা উচিৎ। রাস্তায় জ্যাম হয়ে থাকে, দুই মিনিট পরপর আমার লাইসেন্স চেক করে। কাজে দেরিতে পৌঁছাই। ব্লা ব্লা ব্লা।"
এক্ষেত্রে আমাদের দেশিদের সাথে বিদেশিদের মেন্টালিটির একটি পার্থক্য বলি।
বিদেশী এয়ারপোর্টে - বিশেষ করে অ্যামেরিকান এয়ারপোর্টে আপনাকে কিভাবে চেক করা হবে জানেন? পকেট থেকে যাবতীয় মেটাল জিনিসপত্র বের করে স্ক্যান করতে হবে। এদের মেটাল ডিটেক্টর আমাদের বসুন্ধরা সিটির মেটাল ডিটেক্টরের মতন না যে কোন কিছুতেই শব্দ করেনা। একটা সুঁই থাকলেও এলার্ম বাজে। আপনাকে জ্যাকেট, বেল্ট খুলতে হবে, আংটি-গলার চেইন খুলতে হবে এমনকি জুতাও খুলতে হবে। এসবকিছুই এক্সরে স্ক্যান করতে হবে। আপনার বডিও তাঁরা স্ক্যান করবে। তারপরেও হয়তো আপনার প্যান্টের দুয়েকটা বাড়তি মেটাল বোতামের জন্য মেশিন বিপবিপ আওয়াজ তুলবে। তখন আপনাকে আলাদা সরিয়ে নিয়ে আরও গভীরভাবে চেক করবে। যখন ১০০% নিশ্চিত হবে আপনি নিরাপদ, তখনই কেবল আপনাকে প্লেনে উঠতে দিবে।
এত দিগদারির পরেও কারোর কোন কমপ্লেন নেই। কেন জানেন? কারন সবাইকে চেক করা হচ্ছে আমার নিজের নিরাপত্তার জন্যই। আজকে একজনকেও যদি বিনা চেকিংয়ে ওরা যেতে দিত - তাহলে কে জানে ওদের মধ্যে হয়তো কোন সন্ত্রাসীও বেরিয়ে যেত। একবার জীবন গেলে আর কখনও ফেরত পাওয়া যাবে?
এই ব্যাপারটাই আমরা বাঙালিরা মানতে পারিনা। আরে বেয়াক্কেল, আমার লাইসেন্স চেক করা হচ্ছে মানে হচ্ছে সবার লাইসেন্সই চেক করা হচ্ছে। যাতে বিনা লাইসেন্সের কেউ রাস্তায় নামার সাহস না করে। যাতে কেউ গাড়ি চাপা না পরে। যাতে আমি গাড়ি চাপা না পড়ি।
এইবারে দেশে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি।
যেহেতু একেবারেই কম সময়ের জন্য গিয়েছিলাম, কাজেই উবার বাইক ব্যবহার করেছি খুব। তা হাতির ঝিলের উপরে এক চৌরাস্তায় আমার বাইক জ্যামে আটকে গেছে। আমার সাইডেই একটা টয়োটা সিডান আটকে আছে। আমাদের সাইডের রাস্তা থেকে একটি বাস এসে নির্বিকারভাবে সেই গাড়িটার সাইড বরাবর ধাক্কা দিল। বাস ড্রাইভার কিন্তু বেখেয়ালি ছিল না। সে সামনে তাকিয়েই গাড়ি চালাচ্ছিল। এর মানে একটিই হতে পারে, হয় তার ব্রেক কাজ করছিল না। নাহলে সে জানেই না ব্রেক চাপতে হবে। মানে তার লাইসেন্স ছিল না।
এখন ঐ টয়োটা গাড়ি মাঝে না থাকলে বাসটা কাকে ধাক্কা দিত জানেন? জ্বি, আমি যেই বাইকে ছিলাম সেটাকে।
এই কারণেই এই সমস্ত হারামজাদা ড্রাইভারদের জেলে ভরার পক্ষে আমি।
আরেকটা উদাহরণ দেই। লাইসেন্স ওয়ালা ড্রাইভার হবার ফায়দার কথা বলছি।
দেশে থাকার একদম শেষ দিন। অ্যামেরিকা রওনা হতে এয়ারপোর্ট আসছি। আমার ভায়রাভাই আর্মিতে আছেন, একটি গাড়ি ম্যানেজ করেছেন, মিলিটারি গাড়ি চেপে এয়ারপোর্ট যাচ্ছি। ড্রাইভ করছেন মিলিটারিরই ড্রাইভার, মানে লাইসেন্স আছে।
এয়ারপোর্ট রোডে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গাড়ি জোরে টান দিলেন। অনেক সামনে দুই বুড়ো বুড়ি রাস্তা পার হচ্ছেন। হাতে কাপড়ের ব্যাগ দেখে বুঝে নিলাম হয়তো ঢাকা শহরে নতুন। বুড়ি সময় মতন দৌড় দিলেন। অন্যান্য গাড়িগুলো তখনও দূরে।
বুড়ি এইভাবে রাস্তা পেরিয়ে গেছে দেখে বুড়োর হয়তো পুরুষত্বে আঘাত লাগলো। সেও দৌড় দিতে উদ্যত হলো। আমাদের ড্রাইভার ব্রেকে হালকা চাপ দিয়েও দিলেন না, কারন বুড়ো শেষ মুহূর্তে দৌড় দেয় নি। আমাদের গাড়ি যেই স্বাভাবিক স্পিডে ফেরত এসেছে, অমনি বুড়োর ভিতরের পুরুষ জেগে উঠলো - সে বুড়ির কাছে যাবার জন্য ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দিল। আমাদের ড্রাইভার যেভাবে ব্রেক কষেছে, সেটা অ্যামেরিকার রাস্তা হলে পেছন থেকে দুই চারটা গাড়ি এসে আমাদের ধাক্কা দিত নিশ্চিত।
আমরা গতি জড়তার কারনে সামনে ছিটকে পড়লাম। আমার ছেলে ছিল সামনে, আমার ভায়রা ভাইয়ের কোলে বসা। ঐ সময়ে খুব বড় একটা সুযোগ ছিল তাঁর ছিটকে গিয়ে উইন্ডশিল্ডে আছড়ে পড়ার।
এত ঘটনার নায়ক বুড়ো মিয়া রাস্তা পেরিয়ে নির্বিকারভাবে বুড়ির সাথে হেঁটে যেতে লাগলো। যেন কিছুই হয়নি।
আমার ইচ্ছা করছিল গাড়ি দাঁড় করিয়ে বুড়োকে কানে ধরিয়ে একশোবার উঠবস করাই। ফাজিলটা অল্পের জন্য নিজে মরতো, নাহলে আমাদের মারতো।
মোরাল অফ দ্য স্টোরি, যদি আমাদের ড্রাইভারের লাইসেন্স না থাকতো, অথবা গাড়ি আনফিট হতো, তাহলে কিছু একটা সেদিন ঘটতোই।
এই কারণেই নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনটা আমাদের সবার জন্য জরুরি। যারা দেশে আছেন, তাঁদের নিজেদের জন্যতো অবশ্যই, আমরা যারা প্রবাসী আছি, তাঁদের জন্যও।
এখন দল কানাকানি বাদ দিয়ে দয়া করে ওদের সাপোর্ট করুন। ওরা রাস্তায় একারনেই নেমেছে যাতে আপনাকে কোন জানোয়ার চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে না পারে। আপনি মুমূর্ষু হলে আপনার এম্বুলেন্স ইমার্জেন্সি লেন ব্যবহার করে সহজে এবং দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১৮ রাত ১১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


