somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শো অফ

১৫ ই মার্চ, ২০২১ সকাল ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“অমুক খুব শো অফ করে, দেখবা সে যে দামি গাড়ি চালায়, সেটা দেখানোর জন্য ও এসেই তোমার সামনে গাড়ির চাবি রাখবে।”
এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। একজন পরিচিতের প্রসঙ্গ উঠায় ও এই কথা বললো।
“আমাদেরও উচিৎ ওর সামনে নিজেদের গাড়ির চাবি রাখা। বুঝবে যে ও কত বোকার মতন কাজ করে।”
আমি যোগ করলাম, “আইডিয়াটা ভাল। কিন্তু আমিতো চালাই টেসলা, কোন চাবি নাই। মোবাইলে চলে। আমাকেতো ওর সামনে মোবাইল রাখতে হবে সামনে। ও কিছু বুঝবে? হাহাহা।”
বাংলাদেশে পোলাপান মোবাইল ফোন নিয়ে খুব শো অফ করলেও এদেশে এই যন্ত্রনা নাই। আল্লাহর অশেষ রহমত। খুবিই বিরক্তিকর। একবারের ঘটনা বলি। তবে তার আগে খানিকটা ব্যাকগ্রাউন্ড দেই।
আমি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন চালিয়েছি একটা ফোন সেট দিয়ে। নোকিয়া ৮৩১০। শুরুর দিকে ফোনটার খুব ইজ্জত ছিল। নতুন মডেলের সব ফোনেরই থাকে। কিন্তু তখন প্রায় প্রতি সেমেস্টারেই একটা করে নতুন মডেল বাজারে আসতো। পোলাপান হুমড়ি খেয়ে পড়তো সেসব সেট কেনার জন্য। কারোর ফোনে গান বাজে, কারোর রিংটোন সুন্দর, কারোর সেটটাই সুন্দর। ফোন সেটের উপর লোকজনের যেন ইজ্জত ওঠানামা করে।
সেই হিসেবে আমার ইজ্জত একেবারেই তলানিতে। আমার সেট পুরানো। তারউপর এর বডি নিয়মিতই ভাঙ্গে। আমি নতুন বডি কিনে রিপ্লেস করি। আবার ভাঙ্গে, ময়লা জমে, তবু ফোন আমি পাল্টাই না।
প্রধানতম কারন ছিল এই যে আমি ফোন কিনতে চেয়েছিলাম নিজের টাকায়। আব্বুর কাছে ফোন বা নিজের বিলাসিতার জন্য হাত পাততে নিজেকে ছোটলোক মনে হতো। বড় হয়ে যাবার পরেও বাবা মায়ের ঘাড়ে চেপে থাকতে ইচ্ছা করতো না। টিউশন করে চার হাজার টাকা কামাতাম। ওসব দামি সেট কেনার সামর্থ্য ছিল না।
বন্ধু বান্ধব বা পরিচিতরা এতসব জানতো না। সেই ফোন দেখে অনেকে হাসাহাসিও করতো।
ধৈর্য্যের ফল পেলাম একদিন।
আমেরিকায় চলে আসা হলো। নিজে চাকরি করি, পড়াশোনা করি। নিজের আয়, নিজের স্বাধীনতা। তখন আমেরিকান বাজারে এলো আই ফোন।
আমি গেলাম দেশে। ঝটিকা সফর। মাত্র কয়েকদিন সময় হাতে আছে। এর মাঝে ঠিক করলাম রাতের বাসে চিটাগং গিয়ে দাদার কবর জিয়ারত করে মামা মামী আর খালার সাথে দেখা করে পরের রাতেই ঢাকা চলে আসবো। সোহাগ পরিবহনের বিজনেস ক্লাস টিকিট নিলাম এই কারণেই। ঘুমাতে ঘুমাতে যাব। সকালে গিয়ে যেন ক্লান্ত না থাকি।
যন্ত্রনা শুরু করলো আমার পাশের যাত্রী। ও নোকিয়া এন সিরিজের ফোন ব্যবহার করে, যার ভিতরে এমপি থ্রী চলে, এই তথ্যটা আমাকে না জানানো পর্যন্ত যেন ওর রাতে ঘুম আসবে না। চোখের সামনে মোবাইল মেলে রাখলো, এইটা গুতায়, ঐটা গুতায়। সে এক যন্ত্রনা! ক্লাসের অংক পরীক্ষায় কোন ব্যাক বেঞ্চার যখন একশোতে নব্বই পায়, তখন সে যেমন নিজের খাতা সবাইকে দেখাতে দেখাতে আসে, এই ব্যাটার কাজ কারবারও যেন তাই।
তখন বিরক্ত হয়ে আমি আমার ফোন বের করলাম। চালু করলাম নিড ফর স্পিড গেমটা। কোন বাটন না, ফোনের মুভমেন্টের সাথে স্ক্রিনের ভিতরের গাড়ির বাঁক খাওয়া সোজা থাকা কন্ট্রোল্ড হচ্ছে। এইটা যে একটা ফোন, এই তথ্যটা ব্যাটার বিশ্বাস করতে কতক্ষন লাগলো কে জানে।
ভদ্রলোক নিজের এমপি থ্রিওয়ালা এন সিরিজ নিজের পকেটে চালান করলেন।
আমিও যন্ত্রণার অবসান হয়েছে ভেবে ফোন পকেটে রেখে চোখ বুঝলাম। খুললাম দামপাড়ায় পৌঁছে।
এই হচ্ছে আমার মোবাইল শো অফের করুন ইতিহাস।
তা এই জীবনে গাড়ি কখনই শো অফ করতে পারলাম না। দীর্ঘ সময় চালাতাম টয়োটা ক্যামরি। এরপরে কিনলাম ভক্স ওয়াগন পাসাট। দুইটাই সাধারণ গাড়ি। এইগুলি নিয়ে শো অফ করলে লোকে উল্টা হাসবে।
টেসলা কেনার পরেও শো অফ করা হলোনা।
এর পেছনেও এক করুন ইতিহাস আছে। সেটা এখন বলা যাক।
তখন নতুন নতুন টেসলা কিনেছি। এক্সেলেটরে চাপ দিতেই গাড়ি হাওয়ার গতিতে ছুটে। এটা ওটা কত আধুনিক জিনিস পত্র যে আছে! হাইওয়েতে অটো স্টিয়ারিংয়ে গাড়ি দিয়ে দেই, গাড়িকে অটোমেটিক চলতে দেখে নিজেই মুগধ হয়ে যাই। বিজ্ঞান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!
“এই গাড়ি শো অফ করা যেতে পারে।” এই না যখন ভাবনা মাথায় এলো, সেদিনই পরিচিত এক সাদা ভদ্রলোকের বাড়িতে গেলাম। উনাদের বাড়ি ধনী এলাকায়। এক একর জায়গার নিচে সেখানে কোন বাড়ি বিক্রির নিয়ম নেই। প্রতিটা বাড়িই মিলিয়ন ডলার মূল্যের।
তো কি হয়েছে? আমিও আধুনিক গাড়ি চালিয়ে এসেছি। আমিও যা তা লোক না।
তা খুব ফিটফাট হয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। তখনই ভদ্রলোকের একটা ডোবারম্যান, একটা জার্মান শেফার্ড এবং একটা জাত না চেনা বিশালাকৃতির কুকুর ঘেউ ঘেউ করে আমাদের দিকে ছুটে এলো। আমরা যে গতিতে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম, তার একশোগুন বেশি গতিতে আবার ভিতরে ঢুকে গেলাম।
টিভি বিজ্ঞাপন দেখে বড় হয়েছি যে কেউ কোন ডিওড্রেন্ট গায়ে মাখলে সুন্দরী মেয়েরা ঝাপায় পড়ে।
কেউ অমুক রেজার দিয়ে দাড়ি কামালে সুন্দরী মেয়েরা ঝাপায় পড়ে।
কেউ নির্দিষ্ট নামের চুইং গাম খেলেও মেয়েরা ঝাপায় পড়ে।
গাড়ির কোন বিজ্ঞাপন আছে কি এমন? আমাদের উপর একদল বিশালাকৃতির কুত্তা ঝাপায় পড়লো!
তিন কুকুর তখন আমাদের ঘিরে ঘেউ ঘেউ করছে। মালিক হাসতে হাসতে আদুরে গলায় কুকুরগুলিকে বলছে, “কাম অন চিল্ড্রেন! বিহেভ!”
এখানে লোকজন কুকুর বিড়ালকে নিজের সম্তানের মতোই লালন করে। নিজের গাড়ির পেছনে স্টিকার লাগায় “ডগ মম” লিখে। আমাদের দেশে “কুত্তার বাচ্চা” “শুয়োরের বাচ্চা" একটা গালি। এখানে বাবা মা নিজেদের বাচ্চাদেরই কুকুরের বা শুকরের ড্রেস পরান যেখানে “পিগলেট” বা “পাপি” লেখা থাকে।
কুকুরগুলি “বিহেভ” করতে সময় নিল। ওদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরে আমরা বের হলাম, এবং ওরা এমন দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে গর্জাতে লাগলো, যেন কুকুরের ভাষায় ওরা বলছে, “তোগো লাইগা আমগো মালিক আমগোরে চেইন দিয়া বান্ধছে! একবার যদি কেউ চেইন খুইলা দিতরে.....”
তখনই বুঝলাম, আমি যদি বুগাটি বা রোলস রয়েস বা লম্বা লিমুজিন থেকেও নামতাম, তাইলেও তিন কুত্তার দাবড়ানি খাইতাম। মানুষের মতন বেকুব প্রাণী ছাড়া দুনিয়ার আর সব প্রাণীর কাছেই ব্র্যান্ডের ভ্যালু দুই পয়সা।
মোরাল অফ দ্য স্টোরি, সেই গাড়ি, বাড়ি, ঘড়ি, পোশাক নিয়ে কিসের শো অফ যেগুলিরে কুত্তায়ও সম্মান করেনা?!
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা এবং গর্জিয়াস প্রকাশনা উৎসব

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:১৭


পহেলা মে বিকেলে একটি আমন্ত্রণ ছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল বই প্রকাশনার। এই আয়োজনটি শুরু হয়েছিল বলা যায় এক বছর আগে। যখন একটি লেখা দেওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। লেখাটি ছিল বিদেশের জীবনযাপনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×