somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতি রয়ে যায়!

৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের লেখার লিংক- নাম পরিবর্তনঃ 'মারুফডি' থেকে ‌'মুনতাসীর মারুফ' , টুকরো টুকরো ভালবাসা - ৯

(সাপ্তাহিক ২০০০ এর ভালবাসা সংখ্যা - ২০০৮ এ প্রকাশিত লেখাটির ইউনিকোড কনভার্সন)

তিনদিন প্রচন্ড ব্যস্ততায় কেটেছে নুপুরের। তবে স্বামীর পরিচিতির সুবাদে ভিসা-টিকিটের কাজটা দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে। যদিও এমন হুট করে কেন দেশে যাচ্ছে এর কোন সদুত্তর সে দিতে পারেনি। স্বামীও তেমন ঘাটায়নি। বেশী চাপাচাপি করলে কি-ই বা বলতে পারতো নুপুর?

তিনদিন আগে ঢাকা থেকে বান্ধবী সীমা ফোন করেছিল -রাজিব হাসপাতালে -ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউতে। রোড-অ্যাকসিডেন্ট। অফিসের মাইক্রোতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে বাসের ধাক্কা। অবস্থা ভাল না। ডাক্তাররা জানিয়েছেন,আশা খুবই কম।
খবরটা শোনার সাথে সাথেই নুপুরের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠলো -তাকে যেতেই হবে,যেকোন ভাবেই হোক তাকে বাংলাদেশে যেতে হবে -রাজিবকে দেখতে। মন বলছে, এই শেষ সময়।

বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আকাশের গায়ে নুপুর যেন ১৫ বছর আগের সে-ই রাজিবের মুখটা দেখতে পায়। যে স্মৃতিগুলোকে চাপা দিয়ে রেখেছিল ১০ বছর ধরে,আজ অবাক হয়ে দেখে তার কোন অংশেই ধূলো পড়েনি। যেন এইতো মাত্র সেদিনের কথা।

ঢাকা মেডিক্যালে এসে প্রথম রাজিবকে দেখে রাজশাহীর মেয়ে নুপুর। সবার মাঝে রাজিবকে আলাদা করে চোখে পড়ে। ঢাকায় বাসা,বেড়ে ওঠা।কলেজের নানা ক্লাব আর ফাংশনে সরব উপস্থিতি রাজিবের। রাজনীতিতেও।সরকারী দলের ছাত্রসংগঠন করতো। তবে অন্যদের মতো চাঁদাবাজি,মারামারিতে ওকে কেউ কখনো দেখেনি। গানের গলাটাও ছিল ভাল। কলেজের প্রথম নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ওর গান শুনেই নুপুর প্রেমে পড়ে যায়।

এরপর সীমাকে নিয়ে প্ল্যান করা,রাজিবের গ্রুপের সাথে বন্ধুত্ব,ওর বন্ধুদের মাধ্যমে ইঙ্গিত,শেষতক চিঠি পাঠানো পর্যন্ত। প্রথমে রাজিব 'না' বলে দিয়েছিল। কিন্তু রাজিবদের গ্রুপের সাথে নুপুর-সীমাদের বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়।একসাথে আড্ডা,গল্প,ঘুরতে যাওয়া- ধীরে ধীরে রাজিবও নুপুরের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ারেই তারা জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

রাজিবের ভালবাসা নুপুরের জীবনকে ভরিয়ে তোলে সবদিক থেকে। হাসি-আনন্দ,টুকটাক ঝগড়া-অভিমান,পড়ালেখা,ভবিষ্যতের প্ল্যান -সময় ভালই কেটে যায় তাদের।

নুপুরের সাথে সম্পর্কের পরও রাজনীতি ছাড়েনি রাজিব।কলেজ ছাত্রসংসদের সাহিত্য সম্পাদক হয়েছিল। এই রাজনীতিই কাল হয়ে দাঁড়ায় রাজিবের। ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার আগে দেশে জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল হয়। এর জের এসে পড়ে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেও। আগের সরকারের অনুসারী ছাত্রসংগঠনের নেতাদের প্রতিপক্ষরা পিটিয়ে বের করে দেয় হল থেকে। কলেজে আসতেও নিষেধ করা হয়। ফলে রাজিবসহ ওদের ছাত্রসংগঠনের কেউ সেবার পরীক্ষা দিতে পারেনি। নুপুর পাস করে ইন্টার্ণীতে জয়েন করে।সাহস দেয় রাজিবকে। জীবনে খারাপ সময় আসতেই পারে। এতে হাল ছেড়ে দেয়ার কিছু নেই। নুপুরের প্রেরণায় রাজিব আবার পড়তে বসে।আট মাস পর সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেবার অনুমতি পায় ওরা। কিন্তু পরীক্ষাটা দেয়া হয়না রাজিবের। পরীক্ষার ঠিক আগে ওর বাবা মারা যান।
তখনও রাজিবের পাশে ছিল নুপুর। কিন্তু ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় পড়ে সে। রাজিবের সাথে কথা বলে।রাজিব অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে শুধু। কি বলবে সে? পাস করেনি এখনও। এর মধ্যে বাবা মারা গেছেন।অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অকুল পাথারে না পড়লেও এ অবস্থায় যে বিয়ের কথা চিন্তা করা যায় না,সেটা দুজনেই বোঝে।

এর মাঝে নুপুরের মা অসুস্থ হয়ে পড়লে নুপুরের উপর পরিবার থেকে বিয়ের চাপ বাড়তে থাকে।ইন্টার্ন শেষে রাজশাহী চলে এলেও চিঠিতে যোগাযোগ থাকে রাজিবের সাথে। বাবা-মাকে রাজিবের কথা বলে নুপুর। বাবা-মা তাকে বোঝায়; যা বোঝায়,তাতো নুপুর নিজেই বুঝতে পারছে।আত্মীয়স্বজনের খোঁচানো কথা,নিজের ভবিষ্যত,মার অসুস্থতা -সব চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় নুপুর। রাজিবকে শেষ চিঠি দিয়ে জানায়,ও বিয়ে করছে, বর জাপান প্রবাসী প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার।বিয়ের পর জাপানেই থাকবে। রাজিব শুধু উত্তরে লেখে, সুখে থেকো।

হ্যাঁ -সুখেই আছে নুপুর। স্বামী-সংসার-বাচ্চাদুটোকে নিয়ে।রাজিবের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেনি। কি দরকার পুরনো স্মৃতি জিইয়ে রেখে- তাতে শুধু কষ্টই বাড়বে। কষ্ট হয়েছে প্রথম দিকে।পরে সয়ে গেছে। মানুষের সয়ে যায়। তবে রাজিবের খবর পেত সীমার কাছ থেকে।সীমা এখন একটা বেসরকারী মেডিক্যালের গাইনী বিভাগের রেজিষ্ট্রার।

পরের বারই পাস করে রাজিব। কিন্তু মা-ভাই-বোনদের দায়িত্ব এসে পড়ায় আর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করা হয়নি।একটা ওষুধ কোম্পানীতে ভাল বেতনে চাকরী করে এখন। বিয়ে করেনি।দোহাই দিয়েছে পরিবারের। আসল কারণটা নুপুর বুঝতে পারে; বোঝে,ওর আচরণে কতটা কষ্ট পেয়েছে রাজিব।কিন্তু তখন কি-ই বা করার ছিল নুপুরের?

আজ এত বছর পর ক্ষমা চাইতে যাচ্ছে সে রাজিবের কাছে? -নাতো। তাহলে কেন? -উত্তর নেই।মন শুধু বলে,একবার দেখতে চাই ওকে।
নির্ধারিত সময়েই জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে বিমান। বাইরে এসে ট্যাক্সিক্যাব নেয় নুপুর।সরাসরি ঢাকা মেডিক্যাল যাবে। সীমাকে ফোন করে -আইসিইউতেই আছে রাজিব,রাজিবের মার সাথে কিছুক্ষণ আগে ফোনে কথা হয়েছে সীমার।

ট্যাক্সি ছুটে চলে এয়ারপোর্ট রোড-খিলক্ষেত-মহাখালী-ফার্মগেট হয়ে । শাহবাগ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আসতেই নুপুরের দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। দু’পাশের রাস্তা ধরে কতদিন তারা হেঁটে বেড়িয়েছে! পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসেছে, চারুকলার সামনে আড্ডা দিয়েছে।ডাসের সামনে এসে সে যেন স্পষ্ট দেখতে পায় চোদ্দ-পনের বছর আগের সেই রাজিব আর নুপুরকে-পাশাপাশি বসে আছে। দুচোখ বেয়ে পানির ধারা নামে নুপুরের। ফিসফিস করে কারা যেন একই নাম জপে যায় কানের কাছে -রাজিব,রাজিব। আমি আসছি রাজিব।

নুপুর জানে না,এই মাত্র রাজিবকে মৃত ঘোষণা করে আইসিইউ থেকে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তাররা।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৩৭
১৯টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×