মুর্শিদ কুলি খান
মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব । তাছাড়াও বিভিন্ন নথি পত্র নির্দেশ করে তিনিই মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম স্বাধীন নবাব ছিলেন । তার উপর মুঘল সাম্রাজ্যের নামমাত্র আধিপত্য ছিল । সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলার নবাব ছিলেন ।
তার পরিবার সম্পর্কে কয়েক প্রকার তথ্য পাওয়া যায় । প্রথম সংস্করণমতে মুর্শিদ কুলি খানকে হাজি শফি ইসফাহানি নামে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তা ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেছিলেন,এবংইসফাহানিই তাকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেন । ভারতে ফেরার পর তিনি মুঘল সাম্রাজ্যে যোগদান করেন । ১৭১৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে কার্তালাব খান নামে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন এবং বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন । আরেক তর্থ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন মারাঠা জেনারেল মুহাম্মদ কুলি খানের নাতি । সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মুর্শিদ কুলি খান দরিদ্র দাক্ষিণাত্য মালভূমি ওড়িয়া ব্রাহমীয় পরিবারে জন্মগ্রহন করেন । ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার পূর্বেই পারস্যের বণিক ইসফাহান তাকে ক্রয় করে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন এবং নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ হাদী বা মির্জা হাদী রাখেন । তিনি বেরার প্রদেশের দেওয়ান হাজী আব্দুল্লাহ কুরাইশির অধীনে চাকরীও করেন । পরবর্তীতে বেরার প্রদেশের দেওয়ান সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে চলে আসে ।
সরফরাজ খান
সরফরাজ খানও ছিলেন বাংলার অন্যতম আরেক জন নবাব । তার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ । সরফরাজ খানের নানার নাম নবাব মুর্শিদ কুলি খান । তার নানা সরফরাজকে বাংলা ও বিহার এবং ওড়িশার নবাব বা তার উত্তরাধীকারী মনোনীত করেন । ১৭২৭ সালে মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর যখন তিনি সিংহাসনে আরোহন করবেন তখন জানতে পারেন তিনি যে তার পিতা ওড়িশার সবেদার সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান এবং তার ডেপুটি আলীবর্দী খা বিশাল বাহিনী নিয়ে সিংহাসন দখলের জন্য মুর্শিদাবাদ অগ্রসর হচ্ছে । পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য দেওজার বেগম সরফরাজকে তার পিতার সম্মানে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বলেন । পরবর্তীতে সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান তার উত্তরাধীকারী হিসেবে সরফরাজকেই মনোনীত করেন এবং ১৭৩৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি সিংহাসনে আরোহন করেন । সিংহাসনে বসার পর তিনি আলা উদ্দিন হাইদার জং উপাধি ধারন করেন ।
সরফরাজ খানের মৃত্যু এবং উত্তরাধীকার
সরফরাজ খানের দুর্ভাগ্য যে তিনি আলীবর্দী খাঁর মত একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছিলেন যার ৭০ বছর বয়সেও নেতৃত্ত্ব দেওয়ার অসাধারন গুন ছিল তার মধ্যে এবং তিনি সরফরাজ খানের দূর্বলতাগুলো জানতেন । সরফরাজ খান ভাগীরথী নদীর তীরে গিরকার যুদ্ধে নিহত হন । তার প্রতিপক্ষ আজিমাবাদের বর্তমান পাটনা সুবেদার আলীবর্দী তাকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করেন । যুদ্ধটি ক্ষণস্থায়ী ছিল কিন্তু এর ভয়াভহতা ছিল মারাত্বক । যুদ্ধের প্রথম দিকেই সরফরাজ খান গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু তার সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে । শেষ পর্যন্ত আলীবর্দী খানের নিপুন রণকৌশলের কাছে সর ফরাজের সেনাবাহিনী পরাজিত হয় ।
প্রথমে ছত্রভঙ্গের কারন ছিল সরফরাজ খান কখনো আলীবর্দী খার কাছ থেকে এরকম যুদ্ধ আশা করেন নাই এবং আলীবর্দী খা সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সরফরাজকে সময় দেন নাই । সিংহাসনে বসার ১৩ মাসের মাথায়ই তিনি আক্রমন করেন । অপর দিকে সরফরাজ খান আরো বড় হুমকি নাদির শাহকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন যিনি দিল্লি এবং পাঞ্জাব আক্রমন করেছিলেন ।
সরফরাজ খান মৃত্যুর সময় পাঁচ পুত্র এবং পাঁচ কন্যা রেখে যান যারা কখনো কষমতা গ্রহন করতে পারেন নাই । আলীবর্দী খা বাংলার নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং একই সাথে মুর্শিদ কুলির নাসিরি রাজবংশের পতন ঘটে । আলীবর্দী খা আফসার রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন । সরফরাজ খানকে মুর্শিদাবাদের নাগিনাবাগে সমাধিস্থ করা হয় ।
সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান
সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান ছিলেন বাংলার একজন নবাব । তিনি মুর্শিদ কুলি খানের কন্যা জয়নব উন নিসা বেগম এবং আজমত উন নিসা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন । তার তৃতীয় স্ত্রীর নাম দুরদানা বেগম সাবিহা । ১৭২৭ সালের ৩০শে জুন তার শ্বশুর মুর্শিদ কুলি খানের মৃত্যুর পর তিনি নবাব হন এবং সিংহাসনে আরোহন করেন ।
তিনি দেক্কানের বুরহানপুরে মির্জা সুজা উদ্দিন মুহাম্মদ খান মির্জা দেক্কানী পরিবারে জন্মগ্রহন করেন । তার পিতার নাম নবাব জান মুহাম্মদ খান মির্জা নূর উদ্দিন খান । তিনি ১৭১৯ সালে ওড়িশার সুবেদার প্রাদেশিক শাসক হিসেবে নিয়োগ পান । তাছাড়াও তিনি ১৭২৭ সালের জুলাইয়ে বাংলা এবং ১৭৩১ সালে বিহারের সুবেদার হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছিলেন । সুবেদার উপাধিটি মুঘল শাসনামল থেকে প্রচলিত ।
তার ক্ষমতায় আরোহন
সরাসরি উত্তারাধীকারী না থাকায় মুর্শিদ কুলি খান তার নাতি সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খানকে সিংহাসনের জন্য মনোনীত করেন । মুর্শিদ কুলি খান ১৭২৭ সালে মৃত্যুবরন করনে এবং সরফরাজ খানের সিংহাসন লাভের উপক্রম হয় ।
এদিকে সুজা উদ্দিন ছিলেন ওড়িশার সুবেদার এবং তার ডেপুটি ছিলেন আলীবর্দী খা । মুর্শিদ কুলি খান সাধারনত সুজা উদ্দিনের জনগনের জন্য গৃহীত সর্বব্যাপী নীতিকে সমর্থন করতেন না । পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী যখন সরফরাজ খানকে সিংহাসনের উত্তারীধার হিসেবে ঘোষনা করা হয় তখন সুজাউদ্দিন নিজ পুত্রের অধীনে চাকরী করতে বিরক্ত ছিলেন । আলীবর্দী খা এবং তার ভাই হাজি সুজা উদ্দিনকে বলেন এই পদের জন্য তিনিই সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি । আলীবর্দী খা এবং হাজির সাহায্যে সুজাউদ্দিন সিংহাসন দখলের প্রস্তুতি নিতে থাকেন । তাছাড়াও তিনি মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ এর সাহায্য পেয়েছিলেন এবং সম্রাট তাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন । পরবর্তীতে তিনি বাংলার নবাবদের রাজধানী মুর্শিদাবাদের দিকে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে গমন করেন । পরিবারের মধ্যে কলহ এড়ানোর জন্য তখন মুর্শিদ কুলি খানের স্ত্রী বৈঠক করেন এবং সরফরাজ খান পিতা সুজাউদ্দিনকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সিংহাসনে বসতে অস্বীকৃতি জায়ায় । ১৭২৭ সালের আগস্টের দিকে সুজা উদ্দিন পরিপূর্ণভাবে সিংহাসন লাভ করেন এবং বাংলার দ্বিতীয় নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান ।
সুজাউদ্দিনকে সমর্থন করার স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি মুঘল সম্রাটের কাছে বিপুল পরিমান উপঢৌকন পাঠান । মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ পরিবর্তে তাকে মুতামুল মুলক দেশের কর্তা ও সুজাউদৌলা রাষ্ট্রের নায়ক এবং আসাদ জংকে যুদ্ধের সিংহ উপাধিতে ভূষিত করেন । তাছাড়াও মুঘল সম্রাট থাকে বিভিন্ন দামি উপঢৌকন দিয়ে সম্মান জানান ।
তার মৃত্যু এবং উত্তারীকার
১৭৩২ সালের দিকে নাদের শাহকে নিয়ে একটি উদ্বেগ ছড়িয়ে পরে । সুজাউদ্দিন অসুস্থ হয়ে পরেন এবং মৃত্যুভয়ে তিনি তার পুত্র ও দুরদানা বেগমকে ওড়িশা পাঠিয়ে দেন । এছাড়াও তিনি সরফরাজ খানকে তার উত্তারীকারী হিসেবে মনোনীত করেন । তিনি সবসময় সরফরাজ খানকে হাজি আহমেদ আলম চাদ এবং জগতশেঠের উপদেশ মেনে নিতে বলতেন যদিও সরফরাজ তাদের পছন্দ করতেন না । ১৭৩৯ সালের ২৬শে আগস্ট তিনি মৃত্যুবরন করেন । তিনি দুই পুত্র এবং দুই কন্যা রেখে যান । তাকে মুর্শিদাবাদের রোশনিবাগে সমাধিস্থ করা হয় । তার মৃত্যুর পর পুত্র সরফরাজ খান সিংহাসনে বসেন এবং এ সময়ই নাদের শাহ দিল্লি আক্রমন করেন ।
সুজা উদ্দিন অত্যন্ত সম্বৃধিশীল একটি দেশ রেখে যান এবং তার পুত্র ভালোভাবেই দেশ পরিচালনা করেন । নাসিরি রাজবংশ আরো ১৩ মাস স্থায়ী ছিল এবং সরফরাজ খানের সাথে সাথে এই রাজবংশেরও সমাপ্তি ঘটে ।
নবাব আলীবর্দী খা
নবাব আলীবর্দী খা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মাতামহ । নবাব সিরাজউদ্দৌলা নবাব আলীবর্দী খার উত্তরসূরি হন ।
আলীবর্দী খা বাংলা ও বিহার এবং ওড়িশার নবাব ছিলেন । তার পূর্ণ নাম মির্জা মুহাম্মদ আলী । তার পিতার নামদ মির্জা মুহাম্মাদ । আরব বংশোদ্ভূত মির্জা মুহাম্মদ আজম শাহের আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় পুত্র দরবারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন । আলীবর্দী খার মা খুরসানের এক তুর্কি উপজাতি হতে এসেছিলেন । তার পিতামহ আওরঙ্গজেবের সৎ ভাই ছিলেন । পূর্ণ বয়স্ক হবার সাথে সাথে আজম শাহ তাকে পিলখানার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন ।
১৭০৭ সালের যুদ্ধে আজম শাহের মৃত্যুর পর চাকরি চলে যাওয়ার মির্জা মুহাম্মদ আলীর পরিবার সমস্যার সম্মুখীন হয় । তখন বাকি জীবনের জন্য তিনি সপরিবারে ১৭২০ সালে বাংলায় চলে আসেন । কিন্তু বাংলার তৎকালীন নবাব মুর্শিদকুলী খান তাকে গ্রহণ করেন নাই । ফলে মির্জা মুহাম্মদ আলী চুতাকে গমন করেন যেখানে সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেন । সুজাউদ্দিন তাকে মাসিক ১০০ রুপি বেতনের চাকুরিতে নিয়োগ দান করেন । তার কাজ এবং বিশ্বস্ততায় খুশি হয়ে তিনি তাকে পদোন্নতি দেন । বিশেষ করে তাকে ওড়িশার কিছু জমিদারির তদারকি দান করেন ।
ওড়িষ্যাতে মির্জা মুহাম্মদ আলী প্রশাসনিক দক্ষতা লাভ করেন । ওড়িশার সন্তোষজনক দ্বায়িত্ব পালন ছাড়াও সুজাউদ্দিনের শ্বশুর মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর বাংলার মসনদ রক্ষায় সুজাউদ্দিনকে তিনি সাহায্য করেন । ফলশ্রুতিতে মির্জা মুহাম্মদ আলীকে চাকলা আকবরনগর রাজমহল এর ফৌজদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় । ১৭২৮ সালে তাকে আলীবর্দি উপাধি দেওয়া হয় । নতুন ফৌজদারের অধীনে রাজমহলের জনগন শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভ করে । প্রদেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রে আলীবর্দি সুজাউদ্দিনের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন । নবাব তার প্রতি এমন নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে বছরে একবার রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদে তার ডাক পড়ত ।
১৭৩২ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহ বিহারকে বাংলা সুবার অধীনে নিয়ে আসেন । কিন্তু নবাব সুজাউদ্দিন সম্পূর্ণ অঞ্চল নিজের অধীনে রাখার থেকে আলীবর্দীকে বিহারের নিজাম হিসেবে নিয়োগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন । কিছু দিন আগে আলীবর্দির কনিষ্ঠ কন্যা আমিনা বেগম তার কনিষ্ঠ ভাতিজা জৈনুদ্দিন আহমেদ খানকে বিয়ে করেন । আমিনা বেগমের গর্ভেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্ম হয় । আলীবর্দীর নিজের কোন পুত্র সন্তান ছিল না ।তাই আলীবর্দী সিরাজউদ্দৌলাকে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করেন ।
তর্থ্য সূত্রঃ কিছু গুগল ও ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহণ করা হয়েছে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


