বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহ সুবহান ওয়া তায়ালার একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম। ইসলামের আবেদন অপরিসীম। এর বিশালতা ও গভীরতার সাথে কোন কিছু তুলনা করা কল্পনাতীত। ১৪০০ বছর পূর্বে ইসলাম যেমন ছিল তরুন, সজীব ও সতেজ তেমনি আজকের ইসলামও তার সেই তারুন্য ও সজীবতা দ্বীপ্তমান। দীর্ঘ ১৪০০ বছর যাবত ইসলাম তার সূর ও ছন্দ বজায় রেখেছে। অক্ষুন্ন রেখেছে তার নিজস্ব ভাবধারা ও গতিময়তা। ইসলাম চির সজিব, কেননা সকল প্রতিকূলতা থেকে ইসলামকে রক্ষার দায়ীত্ব নিয়েছেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, অসীম সত্বা আল্লাহ সুবহান ওয়া তায়ালা। আর তিনিই তো এর রক্ষক।
কিন্তু কালের পট পরিবর্তনে ইসলামের সেই ১৪০০ বছরের দেদীপ্যমান দ্বীপ আজ তেজহীন নিষ্প্রভ। মুসলমান আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। বিগত কয়েক শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া সেই বিপর্যয়ে মুসলমান আজ দিশেহারা। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের এই বিপর্যয় পূর্বের তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির। তাদের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আক্রমনের পাশাপাশি স্নায়ুবিক ও বুদ্ধিভিত্তিক আক্রমন চলছে। পদ্ধতিগতভাবে এই আক্রমন এতটাই পরিকল্পিত ও সূতীখ্ন যে, স্বয়ং মুসলমানরাই অগ্যাতবসত সেই আক্রমনের প্রতিনিধিত্ব করছে।
বুদ্ধিভিত্তিকভাবে ইসলামকে বিপর্যস্ত করা তথা ইসলামের মূল আক্বীদা-বিশ্বাস ও তাউহীদ তামাজ্জুদকে বিকৃত করার প্রয়াস সুদূঢ় প্রসারে। এক্ষেত্র অমুসলিমরা যেমন প্রত্যক্ষভাবে ইসলামের মূল আক্বীদা বিশ্বাস বিকৃত করার অপচেষ্টা করে থাকে, তেমনি ভাবে মুসলমানদের একটি শ্রেণী তাদের সেই অপচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। অরিয়েন্টেলিষ্ট বা প্রাচ্যবিদরা (যাদেরকে আরবীতে বলা হয় মুরতাশরিকীন) এই বিষয়ে ইসলামের সর্বাধিক ক্ষতি সাধনে লিপ্ত। এদের কেউ নামধারী মুসলমান আবার কেউ অমুসলিম। এ সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে মুসলমানদের অনেকেই একি ভাবধারায় পরিচালিত হয়।
মুসলমানদের এই ক্রান্তি লগ্নে ডাঃ জাকির নায়েকের ভুল গুলো নিয়ে আলোচনা একটি গৌন বিষয়। মুসলমানদের মাঝে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এ প্রতিষ্ঠিত হক্ব বিষয়ের উপর বিভিন্ন প্রশ্ন উপস্থাপন করে ইসলামের বিভিন্ন আহকাম সম্পর্কে সাধারন মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কোনভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলমানদের একটি শ্রেণী বিশেষতঃ ডাঃ জাকির নায়েক এই অপচেষ্টায় তৎপর হয়েছেন।
তুলনামূলক ধর্ম তত্ত্বের উপর ডাঃ জাকির নায়েক একজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। এই বিষয়ে তার অতুলনীয় খেদমত মুসলমানদের একটি বড় অর্জন। একটা সময় ছিল যখন ডাঃ জাকির নায়েকের তুলনামূলক ধর্ম তত্ত্বের উপর লেকচারগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। তার পক্ষে অনেকের সাথে বিতর্কও করেছি। বিভিন্ন ধর্মের উপর ডাঃ জাকির নায়েকের সেই আলোচনাগুলো ছিল এক কথায় অসাধারন। এবং এই বিষয়ে তিনি ইসলামের যে খেদমত করেছেন, মুসলিম উম্মাহ তা স্বরন রাখবে অনেক বছর।
কিন্তু দুঃখ জনক বিষয় হলো ডাঃ জাকির নায়েক তার দাওয়াতের ক্ষেত্র, সীমা ও পরিমন্ডল অতিক্রম করেছেন। তিনি একজন দাঈ, কিন্তু তিনি মুফতি, মুহাদ্দিস বা মুফাসসির নন। যখন থেকে তিনি তার জ্ঞানের সীমা ও পরিধি অতিক্রম করেছেন তখন থেকেই তার কাছ থেকে অনেক অনাকাঙ্খিত ও ভুল বিষয় প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। মাছআলা মাছায়েল বা ফতোয়া প্রদানের যোগ্যতা অর্জন না করে তার জন্য এই পথে অগ্রসর হওয়াটা কখনোই যুক্তিক হতে পারেনা। প্রকৃত পক্ষে তিনি মাছআলা প্রদান ও ফিক্বহী সমাধানের যোগ্য নন। এজন্য তিনি যে সমস্ত মাছআলা বা ফতোয়া দিয়ে থাকেন তা অধিকাংশই মূলত আহলে হাদিসদের থেকে নেয়া। বাস্তব সত্য হল, এক্ষেত্রে তিনি ও তার প্রচার মাধ্যম সালাফী বা আহলে হাদীসদের একজন অগ্রগামী প্রতিনিধি। ডাঃ জাকির নায়েকের মত একজন দাঈর পক্ষে সালাফী বা আহলে হাদিসদের পথে পা বাড়ানোর যুক্তিকতা আমাদের কাছে অস্পষ্ট। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়-
“ভাঙ্গা তরীতে পাড়ি দিয়েছি
অথৈ সাগর মোরা,
যেখানেই পানি কমছিল হায়,
তরী ডুবে হল সাড়া”
ডাঃ জাকির নায়েক ফিকহের বিষয়ে অভিজ্ঞ না হয়ে তিনি এই বিষয়ে ফতোয়া প্রদান করায় সবচেয়ে বেশী বিতর্কিত হয়েছেন। তার এই সমস্ত ভুল মাছআলার ব্যাপারে সকলেই হয়ত অবগত। ফিকহের বিষয়ে বিভিন্ন ভুল মাছআলা দেওয়ার পাশা পাশি তিনি মাযহাব প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশেষত “Unity of Muslim Ummah” শিরোনামে লেকচারে বিভিন্ন ধরনের অমূলক উক্তি করেছেন। তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাযহাবকে ইসলাম বহির্ভূত একটি বিষয় প্রমানে অপচেষ্টা করেছেন।
সর্বশেষ কথা হল, বর্তমান সময়ে যারা ইসলামের হিতাকাঙ্খী রয়েছেন তাদের উচিৎ গৌন বিষয়গুলো পরিহার করে মুসলানদের অধঃপতনের মৌলিক কারনগুলো চিন্হত করা এবং সেগুলো সমাধান করার চেষ্টা করা। অধিকাংশ মানুষ যখন নামায পড়েনা তখন কে আমীন আস্তে বলল বা জোরে বলল তা নিয়ে তুলকালাম সৃষ্টি করা মেধার অপচয় বৈ কিছুই নয়। ছোটখাট যে সকল বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে, সে বিষয়গুলোর মান এমন যে, তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক তো দূরের কথা অনর্থক আলোচনা করাটাও যুক্তিক নয়।
মুসলমানদের এই দুর্দিনে যারা ইসলাম পালনে আগ্রহী তাদেরকেও আবার এই সমস্ত গৌন বিষয়ে বিভক্ত করার চেষ্ঠা করা যে কতটা হীণ তা সহজেই অনুমেয়। । অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক মোটকথা সকল ক্ষেত্রেই আজ মুসলিম উম্মাহ পর্যুদস্ত। সুতরাং, সময়ের দাবী অনুযায়ী এ সমস্ত বিষয় গুলোতে তাদের উপকার করা, তাদের মাঝে নতুন নতুন মাছআলা মাছায়েল দিয়ে তাদেরকে বিভক্তি করার চেয়ে অধিকতর যৌক্তিক। অতএব, আমাদের উচিৎ হলো গৌন বিষয়গুলোকে পরিহার করে মৌলিক বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেয়া।
ডাঃ জাকির নায়েককে আক্রমন করা বা তার একচেটিয়া সমালোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ডাঃ জাকির নায়েককে ছোট করা বা তার অন্যান্য খেদমতকে তুচ্ছ করাও আমাদের লক্ষ্য নয়। এজন্য কারো পক্ষে এ ধারনা করা সমিচীন হবেনা যে, ডাঃ জাকির নায়েককে আমার খাটো করে দেখানোর চেষ্ঠা করছি। বস্তুত, এই উদ্যোগটি বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে গবেষনামূলক পর্যালোচনা ছাড়া কিছু নয়।
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে বুঝার তৌফিক দান করুন।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



