somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীর্ণ দেয়াল

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ৯:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


​চরিত্র- অনির্বাণ (৬৫) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, যিনি সমাজের পুরনো মূল্যবোধের পতনে গভীরভাবে হতাশ।
​প্রত্যয়: (২৫) উচ্চশিক্ষিত তরুণ, যে বর্তমান সমাজের নৈরাজ্য দেখে অস্থির এবং ক্ষুব্ধ।
​স্থান: একটি জীর্ণ পাবলিক পার্কের ভাঙা রেলিংয়ের পাশে। সামনেই একটি পুরাতন, শ্যাওলা-ধরা স্মৃতিস্তম্ভ। বিকেল গড়িয়ে আসছে।
​(দৃশ্যের শুরু: অনির্বাণ ধীর গতিতে স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রত্যয় দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে তার পাশে দাঁড়ায়।)
​প্রত্যয়: স্যার, আপনি প্রতিদিন এখানে আসেন কেন? এই ভাঙা রেলিং, এই আবর্জনার স্তূপ... এটা কি আপনাকে শান্তি দেয়?
​অনির্বাণ: (স্মৃতিস্তম্ভের দিকে তাকিয়ে) শান্তি? না, প্রত্যয়। আমি এখানে আসি ক্ষয় দেখতে। এই রেলিংয়ের মতো আমাদের সমাজও জীর্ণ। এর ইস্পাত পচে গেছে, পেরেকগুলোয় মরচে। ভাঙতে ভাঙতে এমন জায়গায় এসেছে যে এখন মেরামতের আর উপায় নেই।
​প্রত্যয়: মেরামত নয়, স্যার। উপড়ে ফেলতে হবে। আর এই ক্ষয়ের জন্য আপনারা দায়ী। আপনারা, যারা নিজেদের আদর্শবাদী বলতেন, আপনারা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিলেন যখন মরচেটা ধরছিল।
​অনির্বাণ: (ঘুরে প্রত্যয়ের দিকে তাকান, চোখে তীব্র বিষাদ) তোমার প্রজন্মের মতো আমরা রাতারাতি আকাশ ছুঁতে চাইনি, প্রত্যয়। আমরা ধীরগতিতে বিশ্বাসী ছিলাম। আমরা জানতাম, একটি দেয়াল তৈরি করতে একশ’ বছর লাগে, ভাঙতে লাগে মাত্র এক রাত। কিন্তু এই পচন রাতারাতি আসেনি। এটা আমাদের আত্মার ভেতর থেকে শুরু হয়েছিল।
​প্রত্যয়: আত্মা? যখন শিক্ষার দরজা টাকার কাছে বিক্রি হলো, আপনারা নীরব ছিলেন। যখন সততার দাম হলো নিছক বোকামি, তখন আপনারা 'বাস্তবতা'র নাম দিলেন। এখন সবার হাতে তথ্য আছে, কিন্তু সবাই অন্ধ। আমরা সেই শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, যা আপনারা রেখে গেছেন। আপনারা আমাদের শেখালেন স্বপ্ন দেখতে, কিন্তু স্বপ্ন পূরণের রাস্তাটা তৈরি করে গেলেন লোভ আর মিথ্যা দিয়ে!
​অনির্বাণ: তুমি আমাদের শুধু ব্যর্থতা দেখছো। আমরাও লড়াই করেছিলাম, চিৎকার করেছিলাম! কিন্তু ক্ষমতা আর অর্থ যখন একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, তখন সাধারণ মানুষের চিৎকার নিছক ফিসফিসানি হয়ে যায়। এই যে তুমি আজ ক্ষুব্ধ, কাল তুমিও দেখবে তোমার প্রতিবাদের ধার কমে যাচ্ছে। এটাই সমাজের অনিবার্য নিয়ম। এ এক চিরন্তন বিশ্বাসঘাতকতা—তোমার আদর্শ তোমার সঙ্গেই করে।
​প্রত্যয়: (আচমকা উত্তেজিত হয়ে) না! আমি মানি না! ক্ষয়টা অনিবার্য নয়, এটা অভ্যাস। আর এই অভ্যাস ভাঙা সম্ভব। আমি দেখতে চাই না যে আমার সন্তানেরা এই পচা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে একই হতাশায় ভুগুক। যদি সবাই এই 'অনিবার্য ক্ষয়'-কে মেনে নেয়, তাহলে কেন আমরা এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছি? কেন এখনো কিছু মানুষ রাস্তায় নামে?
​অনির্বাণ: (দীর্ঘ, ঠান্ডা হাসি) তারা নামে, কারণ তাদের এখনো শেষ আশাটুকু মরেনি। কিন্তু আশা এক বিপজ্জনক প্রতারণা, প্রত্যয়। সে তোমাকে আরও বেশি কষ্ট দেয় যখন সে মরে যায়। এই সমাজ আর প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবলই ছদ্মবেশ, ভেতরের সব কাঠামো ভেঙে গেছে। তুমি কাকে মেরামত করবে? জীর্ণতা এখন আমাদের সংস্কৃতি।
​প্রত্যয়: আমি সংস্কৃতি বদলাবো। আমি এই ভাঙা দেয়ালের পাশে নতুন বীজ পুঁতব, যা ধীরে হলেও এই পচনকে ঢেকে দেবে। আপনারা শুধু অভিযোগ করলেন, কিন্তু আমরা কাজ শুরু করব। আমি জানি এটা বিপজ্জনক, কিন্তু নীরব দর্শকের চেয়ে পরাজিত যোদ্ধা হওয়া অনেক ভালো।
​অনির্বাণ: (মাথা নেড়ে) তুমি যুদ্ধ করো, প্রত্যয়। কিন্তু মনে রেখো, তুমি যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে লড়ছো, সেই মাটিটাই পচে গেছে। তুমি লড়ছো সময় আর প্রকৃতির বিরুদ্ধে। (স্মৃতিস্তম্ভের দিকে ইশারা করে) এর নাম ছিল 'অটুট শপথ'। আজ শুধু শ্যাওলা আর ভাঙা পাথর। তুমিও একদিন এইখানে দাঁড়িয়ে ক্ষয়ের হিসাব করবে।
​(অনির্বাণ ধীর পায়ে হেঁটে পার্কের ভেতরের অন্ধকারে মিশে যেতে শুরু করেন। প্রত্যয় সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ কখনো অনির্বাণের চলে যাওয়া পথের দিকে, আবার কখনো সেই জীর্ণ স্মৃতিস্তম্ভের দিকে। তার মুখে হতাশা এবং এক কঠিন প্রতিজ্ঞার মিশ্রণ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:০১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটু চালাক না হইলে আসলে এআইয়ের দুনিয়াতে টেকা মুশকিল।

লিখেছেন Sujon Mahmud, ২৯ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:২৫



সকাল থেকে চ্যাটজিপিটি আর ন্যানো ব্যানানার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিলাম, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বলেছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার পশ্চাৎদ্বেশ চাটে, এইটার একটা ছবি তৈরি করে দাও।

শালারা দিবেই না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডিপস্টেট তাহলে সসস্র বিপ্লবের গোলা বারুদের সরবরাহকারী! জঙ্গি আসিফ’কে কেউ প্রশ্ন করেনি ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



বাংলাদেশে একটা ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট-এর বিরুদ্ধে যখন জুলাই-আগস্ট মাসে তথাকথিত “মুভমেন্ট” চলতেছিল, তখন এটাকে অনেকে খুব ইনোসেন্টভাবে “পিপলস আপরাইজিং” বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্নটা খুবই সিম্পল—এইটা কি আসলেই স্পনটেনিয়াস... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমলারা কেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলে গেলেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ২:২০


ডিপ স্টেট নিয়ে আজকাল চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্ট বক্স সবখানেই বেশ জমজমাট আলোচনা। কেউ বলছেন দূতাবাস, কেউ বলছেন মিলিটারি, কেউ আবার আঙুল তুলছেন কোনো বিশেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৫

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:২৫



আমি একজন প্রতিভা শূন্য মানুষ।
আমি দুটো কাজই পারি, এক, মাথা নিচের দিকে রেখে পা উপরের দিকে রাখতে। তাও বেশিক্ষণ পারি না। বড়জোর এক মিনিট। দুই হচ্ছে আমি সুপারম্যান... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভোজ

লিখেছেন ইসিয়াক, ৩০ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ২:৪০


গতকাল শরীরটা ভালো ছিলো না। তার জেরেই সম্ভবত ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ঘুম ভাঙলেই আমি প্রথমে মোবাইল চেক করে দেখি কোন জরুরী কল এসেছিল কিনা। আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×