somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভয়

১৩ ই আগস্ট, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক রাত। কত রাত জানি না। ঘুমে চোখ লেগে আসছে। আমি দশটায় ঘুমাই। তার মানে নিশ্চয়ই অনেক রাত হয়েছে, চোখ খুলে রাখতে পারছি না। পুরো বাসাটা যেন ঘুমন্তপুরী, কোথাও কোনো শব্দ নেই। সব নিস্তব্ধ। ডিম লাইট জ্বলছে। তার আবছা আলো কেমন যেন একটা অদ্ভুত সুন্দর কিন্তু মনখারাপ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে জাওয়াদ।
আমার চোখ একাই লেগে যাচ্ছে। চোখের পাতাজুড়ে ঘুমের আদর। কিন্তু আমি তখনও জেগে। ঘুমাতে পারছি না। কেন পারছি না জানি না। ঘুম আসছে অথচ ঘুমাতে পারছি না! ভয় লাগছে। কীসের একটা অদ্ভুত ভয়।
পাশে সাইলেন্ট হয়ে পড়ে আছে ফোনটা। ডিম লাইটের হালকা আলোয় ফোনের দিকে তাকালাম। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দের পর আস্তে আস্তে হাতে তুলে নিলাম ফোনটা। আনলক করতেই ফোনের আলোয় চোখ ঝলসে গেল। রাতের আলতো আলোয় ফোনের উজ্জ্বল আলো আরো বেশি উজ্জ্বল মনে হল। ফোনবুকে ঢুকলাম। একটা পরিচিত নাম বের করলাম। আরো খানিকক্ষণ দ্বিধার পর ডায়াল করেই ফেললাম।
কতক্ষণ বাজল জানি না। ঘুমের রেশে বেহুঁশ আমি। হঠাৎ চাচ্চুর গলা শুনলাম। ঘুম ঘুম গলায় একটা সালাম দিলাম। সে অবাক হয়ে বলল, 'তুমি এখনও জেগে!'
আস্তে আস্তে বললাম, 'হুঁ। অনেক রাত এখন?'
চাচ্চু বললেন, 'হ্যাঁ! অনেক রাত। তুমি জেগে কেন? ঘুম আসছে না? নাকি কোনো কাজ করতে রাত হয়েছে?'
'কোনোটাই না।'
অবাক হয়ে চাচ্চু আবার প্রশ্ন করল, 'তাহলে?'
'ঘুমাতে পারছি না।' উত্তর দিলাম আমি।
সে আরো আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'মানে? ঘুম আসছে না?'
'ঘুম আসবে না কেন? ঘুমে চোখ লেগে আসছে। ঘুমাতে পারছি না।'
'তার মানে কী? কেন? কী হয়েছে?'
আমি আস্তে আস্তে বললাম, 'ভয় লাগছে।'
'ভয় লাগছে? কেন?'
'জানি না।'
'মাম-বাপি কোথায়?'
'ঘুমাচ্ছে।'
'জাওয়াদ?'
'আমার পাশে। ঘুমাচ্ছে।'
চাচ্চু এবার আকাশ থেকে পড়ল। বলল, 'তুমি তো কখনো ভয় পাও না। কী হল তোমার?'
'জানি না।'
সে বলল, 'আয়াতুল কুরসি পড়ো। ভয় চলে যাবে।'
'আয়াতুল কুরসি পারি না।'
সে বলল, 'আচ্ছা, পড়তে হবে না। তুমি কোনো একটা দোয়া পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাও।'
আমি এবার বললাম, 'শুধু কি ভূত-পেত্নীর ভয়ই পেতে হয়? মানুষ শুধু ভূতের ভয়ই পায়? আর কিছুর ভয় পেতে পারে না?'
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি ভূতের ভয় পাচ্ছ না? তাহলে?'
আমি বললাম, 'জানি না। কিন্তু ভয় লাগছে।'
'জানি না মানে? না জানলে আবার ভয় লাগছে কেন?'
'সেটাও জানি না। সবকিছুর কি কারণ থাকতে হয়?'
চাচ্চু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোমল গলায় বলল, 'মীম, এখন অনেক রাত। এখন তোমার ঘুমে থাকার কথা। কী হয়েছে তোমার, বলো তো? সবটা বলো।'
আমি বললাম, 'বললামই তো, ভয় পাচ্ছি।'
সে বলল, 'শুধু এটুকু বললে আমি কীভাবে বুঝব? কেন, কীসের ভয় পাচ্ছ না জানলে আমি কিছু করতে পারব?'
সবাই ঘুমে। তবুও কোনো এক অজানা কারণে আমি গলাটা যতটা সম্ভব নামিয়ে বললাম, 'হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছি।'
সে অবাক হয়ে বলল, 'কী হারিয়ে ফেলার ভয়?'
আবার আস্তে আস্তে বললাম, 'তোমাদেরকে হারিয়ে ফেলার ভয়।'
কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর চাচ্চু বলল, 'এইজন্য ঘুমাতে পারছ না?'
ঘুমজড়ানো কণ্ঠে আমি শুধু বললাম, 'হুঁ।'
চাচ্চু হেসে ফেলল। নরম গলায় বলল, 'আমাদেরকে হারিয়ে ফেলার ভয় তোমাকে কক্ষনো পেতে হবে না। আমরা কোথায় যাব বলো? তাও আবার তোমাকে ছেড়ে? তুমি যেখানে যাবে আমরা সেখানেই তোমার সঙ্গে যাব। মাকে কি কেউ ভুলতে পারে, না ছাড়তে পারে? পাগলি... তুমি আসলেই একটা পাগলি। ঘুমাও।'
আরো কী কী যেন বলল। ঘুমের রেশে আমি আবছা আবছা শুনলাম কথাগুলো। কিছু শুনলাম, কিছু শুনলাম না। কিছু বুঝলাম, কিছু বুঝলাম না। চাচ্চু বলল, 'তুমি ঘুমাও, আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি, কেমন?'
আমি বললাম, 'হুঁ।'
'ঠিক আছে। ঘুমাও তবে।'
আমি ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললাম, 'চাচ্চু?'
সে উত্তর দিয়ে বলল, 'জ্বি? বলো?'
'আমি তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকি? আমার না খুব ভয় করছে।'
চাচ্চু একটু চুপ থাকল। বলল, 'থাকো। তুমি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাও। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আচ্ছা?'
'আচ্ছা।'
ফোনটা রাখতে গিয়েও রাখা হল না। আমি আবার বললাম, 'চাচ্চু?'
'বলো মা?'
'তুমি চলে যাবে না তো?'
'আমি কোথায় যাব তোমাকে ছেড়ে? পাগলি মেয়ে! আমি কোত্থাও যাব না।'
'প্রমিজ?'
'প্রমিজ। তুমি ঘুমাও?'
'আচ্ছা।'
চাচ্চু আরো কী কী যেন বলল। আমার কানে শব্দটুকুই এল, কথাগুলো বুঝলাম না। ঘুম আমাকে গ্রাস করে ফেলছে। শুধু জানি, শেষে সে বলল, 'আমি মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি। আর পাগলামি কোরো না, কেমন? ঘুমাও। আমি কোত্থাও যাব না, আমরা কেউ যাব না। তোমার কাছেই থাকব।'
ফোনটা আস্তে নামিয়ে পাশে রেখে দিলাম। তারপর কী হল জানি না। শুধু জানি, সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম চাচ্চুর কোলে। সে তখনও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম স্নেহে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:১২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

**চিঠি ০৩ : ক্যাফের চিঠি** ☕️

লিখেছেন চারাগাছ, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০৫




বহু বছর পর আজ তোমাকে দেখলাম।

একটা ক্যাফেতে।

জানালার পাশের টেবিলে বসে ছিলে তুমি। সামনে একটা বই, পাশে একটা Affogato। মাঝে মাঝে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলে, আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখছিলে।

আমি ক্যাফেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৫

বন্ধু মারফত খবর পেলাম দেশের বাজার নাকি ভারতীয় ইলিশে সয়লাব। পদ্মার ইলিশের দাম কম, তাই নিম্নচাপ উপেক্ষা করে চলে গেলাম ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে। ঘাটে এসে দেখলাম পুরা বাজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯


ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×