somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন বউ

০৭ ই জুন, ২০১৪ রাত ১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'নতুন বউ'

বিয়ে দেরীতে করেনি, কিন্তু একমাত্র সন্তানের মুখ দেখতে দেখতে বয়স তার ৪০ পেরিয়ে গেছে। কিছু মানত, দোয়া আর অনেকগুলা রাত সিজদায় কাটানোর পর সেই দিনটা এসেছিল যেদিন এক লাল টুকটুকে বুড়ি কোলে নেবার পর তার সার্টের কলার খামচে ধরেছিল। মনে হচ্ছিল বলছে, বাবা, এইতো আমি এসেছি, তোমাকে আর ছুটির দিনে একা থাকতে হবে না, আর বার বার চা দিতে বলে মায়ের চোখ রাঙানিকে ভয় পেতে হবে না। সেদিন মেয়ের মুখটা দেখে বুঝতে পারলেন খোদা কেন এত দেরি করল ওকে পাঠাতে; জীবনের এই অনুভূতিটা এখনকার চেয়ে বেশি গভীর হয়তো আগে লাগতো না।

সেদিন থেকে বাবা অফিস থেকে ফিরতে দেরি করেনি আর, বরং সব কাজ ঘন্টাখানেক আগে থেকেই শেষ করে চলে আসেন বাসায়। আসার পথে মানিকের দোকানে বসে আর ঘন্টা ধরে খোসগল্পও করে না। বেচারা মানিকের চায়ের দোকানের এক আড্ডাবাজ কমে গেলেও মানিকের মনখারাপটা থাকে নি বাবার উচ্ছাস দেখে। বাবা প্রতিদিনই আসার সময় মানিককে বলত কিভাবে কিভাবে তার মেয়ে ঘুমের মধ্যে হাই তুলে, কিভাবে হাসে আর কিভাবে তার কোলে আসলেই ঘুমিয়ে পড়ে।

আজ ২১ বছর হয়ে গেছে বাবার সেই লালটুকটুকে বুড়িটার, অথচ বাবা আজও অফিস থেকে ফিরতে দেরি করেন না, আজও চায়ের দোকানে বসা হয় না। বাবা এখন ষাটউর্ধ্ব, বেসরকারি চাকরিটা থেকে অবসর নেবার সময় হল বলে, কিন্তু একমাত্র মেয়ের বিয়ে না দিয়ে অবসর নিতে চাচ্ছেন না, আবার মেয়েকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার সাহসটা অনেক চেষ্টা করেও অর্জন করে পারে নি। মাঝে মাঝে বাবা একা বসে কাঁদেন, কাউকে দেখতে দেন না, এমনকি মাকেও না। কিন্তু মেয়ে বুঝতে পারে সবই, বাবার মুখখানা দেখেই সে বুঝে যায় রাতে বাবা বসে কাটিয়েছে পুরনো এলবামের ছবিগুলা দেখে। সে নিজেও কিছু বলতে পারে না, কি বলে বুঝাবে এই বাবাকে, তাকেই বা কে বুঝাবে যখন বাবাকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবলে সবার সামনে থেকে হঠাৎ মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হয়?

বাবা আজ বিদায় দিল তার সেই ছোট্ট বুড়িটাকে; অনেক সাজিয়ে, সবাই বলছিল পরীর মত নাকি লাগছিল তার মেয়েটাকে আজ, কিন্তু বাবার কাছে যেন সার্টের কলার খামছে ধরা সেই টুকটুকে বুড়িটাকে কেউ সরিয়ে নিচ্ছিল চিরতরে। যাবার সময় মেয়ে অনেকগুলা প্রতিজ্ঞা করিয়েছে বাবাকে, নিয়মিত হাঁটবে, ডায়াবেটিকস বাড়তে দিবেনা, ঔষধ সময়মত খাবে, মায়ের সাথে রাগ করবে না, প্রতি সপ্তাহে মেয়েকে দেখতে যাবে, আর কাঁদতে পারবেনা। দু’জনই জানে মিছেমিছি দুটো প্রতিজ্ঞা করেছে, প্রতি সপ্তাহে না, বাবা প্রতিদিন দেখতে চাইবে মেয়েকে, যার জন্য একই শহরে বিয়ে দিয়েছে। আর কাঁদবে না সে! তা অসম্ভব, চোখ বুঝার আগ পর্যন্ত হয়ত কোন বাবা তা বন্ধ করতে পারেনা।

আজ বাবা আবারও মানিকের দোকানে গিয়ে চা খেতে বসেছে, মানিক ভাইও আজ কান্না থামাতে পারেনি। বাবার চা কখন ঠান্ডা হয়ে গেছে হাতে নিয়ে বসে কি যেন ভাবতে ভাবতে। মানিক ভাই আরেক কাপ দিতে চেয়েছিল, বাবা নেয়নি, ঠান্ডা চা খেয়েই চলে গেছে বাবা। আজ বাবার অনেক অভিমান মায়ের সাথে, কেন তাকে বাঁধা দিল না মেয়ের বিয়ে ঠিক করানোর সময়, কেন বার বার তাকে মনে করিয়ে দিল যে তার বয়স হয়েছে, মেয়েকে বিয়েটা তাই বেঁচে থাকতেই দিতে হবে, তাই কাল থেকেই বাবা কথা বন্ধ করে দিয়েছে মায়ের সাথে। বাবা আজ ঘুমাবেন না, রাতে নামাজ পড়ে চেষ্টা করেছিলেন কিছুক্ষন ঘুমাতে, পারেন নি। অন্তত আজ রাতটা বাবা চেয়েছিলেন মেয়ের দেয়া ওয়াদা রাখতে, পারেন নি বাবা। কিছুক্ষন মাকে বকে কান্নাটা থামিয়ে রেখেছিলেন, পরে যখন ঔষধ খেতে গিয়ে দেখলেন তার মেয়ে সবগুলা বক্সে আলাদা করে লিখে গিয়েছে প্রতিবেলার ঔষধের হিসেব, তখন আর পারেন নি। রাতটা সেভাবেই কেটেছে।

আজ বাবা তার ছোট্ট নাতনিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন ঘরের দোড়গোড়ায়, আজও তেমনি এক লাল টুকটুকে বুড়ি তার পাজ্ঞাবীর বুতামটা খামচে ধরে রেখেছে চোখগুলো বড় করে তাকিয়ে।পাশে তার মেয়ে বাবার ঘারে মাথা রেখে হাসছে আর বলছে, 'বাবা তোমার নতুন বউ, তোমাকে চোখ রাঙাচ্ছে।'
১৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×