somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

"দুই পরী"

২০ শে জুন, ২০১৪ রাত ৩:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"দুই পরী"

আমাদের বেবুর বয়স ৩ মাস, এই তিন মাসে কিভাবে তার ছোট্ট মুখটাকে ইয়া বড় করে, মনভুলানো একটা হাই তুলতে হয়, আর কিভাবে ছোট্ট কালো মার্বেলের চোখগুলোকে উল্টিয়ে এদিক ওদিক ঘুরাতে হয় তা শিখে গেছে। তুলার মত নরম হাত-পাগুলোকে টান করার স্বভাবটা ১দিনের বয়স থেকেই। তবে তার ঘুমটা আমার জন্যে খুব কষ্টের! না, জেগে থাকে বলে না, বরং ও ঘুমিয়ে গেলে আমি কার সাথে নাক ঘষবো! জেগে থাকলে আল্লাদি করে কত কথা বলতে পারি, ঘুমালেতো শুধু একটু আদর দিয়েই শেষ!

বেবু নামটা আমি দিই নি, দিয়েছে ওর মা, উর্মি। বাবা আমি, নাম আমিও ভেবে রেখেছিলাম, গর্ভকালীন অবস্থায় ওর কষ্ট দেখে বাবা হিসেবে গর্ব করার মত তেমন কিছু খুজে পেলাম না। শেষ ৬টা মাস আমি উর্মিকে দেখেছি কিভাবে ব্যথায় কষ্ট পেয়েছে, কখনো আমাকে বলেছে, কখনো একাই যন্ত্রনাটা সহ্য করেছে, জানায়নি আমাকে। আমি যতদিন পেরেছি অফিস থেকে দ্রুত চলে এসেছি। ওর পাশে শুধু আমার মা আর ছোট বোনকে রেখে আশ্বস্ত করতে পারিনি নিজেকে, তাই চলে আসতাম। আমি জানতাম ও আমাকে সব জানাবে না, জানিয়েই বা কি হয়, আমরাতো শুধু বাবা হয়েই থাকি, কোন মায়ের এতটুকু কষ্টের ভাগ কি কখনো নিতে পারি! এই যন্ত্রনাটা যার সেই বুঝে। বেবু হবার আগে আমি উর্মিকে কাঁদতে দেখেছি অনেক রাতে, কখনো ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি ও ব্যথায় কাঁতরাচ্ছে। ঘুম আমারও হতো না, কিন্তু আমার রাত জাগাটা ছিল শুধুই চোখ খুলে রাখার, আর ওরটা অনেক কষ্টকে চাপা দিয়ে ঘুমানোর ভান করার। শুধু দেখেই থাকতে পেরেছি, কিছু করতে পারিনি, আফসোস করতাম, একটু যদি ওর ব্যথাটা শেয়ার করে নিতে পারতাম!

নার্স যখন বেবুকে আমার কোলে দিচ্ছিল, তখন আমার চোখ খুজছিল উর্মিকে। দেখলাম বেডে শুয়ে তাকিয়ে আছে, আমি আর থাকতে পারলাম না, ওর কাছে গিয়ে পাশে বসে হাতটা ধরলাম। আমার উর্মি শত হাসি দিয়েও ওর চোখ-মুখের ক্লান্তি আর এত দিনের বেদনার ছাপ লুকাতে পারেনি আমার থেকে। আমি বেবুকে তখনো কোলে নেয়ার কথা ভাবতে পারছিলাম না। ওর হাতটা ধরে যখন বুকে লাগালাম, যে ধন্যবাদটা বুকে করে নিয়ে এসেছিলাম উর্মির জন্যে, মুখে বলতে হল না, ও যেন বুক থেকে শুনে গেল; মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘আপনাকেও’।

মেয়ে হবার পর আমি কতটা খুশি হব আমি তা ও ভালো করেই জানে, বিয়ের প্রথম থেকেই আমার চাওয়া ছিল একটা মেয়ের, কত যে বোকার মত ঝগড়া করেছি দু’জন! কতগুলা নাম যে ঠিক করে রেখেছিলাম আমার রাজকুমারির জন্যে, তারপরও যখন ওকেই বললাম নামটা রাখতে, ও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। আমি ওর কপালটায় একটা চুমু দিয়ে বললাম, তুমি বল কি নাম দিবে? বিয়ের প্রথম দিন ওয়াদা করেছিলাম ওর সাথে, ওকে কাঁদতে দিব না কখনো; কিন্তু আমার কথা শুনে ও কেন যেন কেঁদে দিল। সে কান্নাটায় এক আনন্দ ছিল ওর চোখে। আমি ওর চোখ মুছার আগে ওর লাল হয়ে থাকা নাকটা একটু টেনে দিয়েছিলাম, আর বলেছিলাম, ‘দেখলে আমাদের মেয়ে হলো তো?'

অফিস থেকে টানা বেশি দিনের ছুটি পাব না জানতাম, অনেক ম্যানেজ করে ১০দিনের ফুরসত করতে পারলাম মা-মেয়ের সেবা করতে। বেবুকে কোলে নিয়ে ঘুরতে এই ছুটি নেইনি, মূল উদ্দ্যেশ্য উর্মিকে সার্বক্ষনিক আমার নজরে রাখা, এই সময়টায় ওকে পুরোটা বিশ্রামে রাখা, পাশে পাশে থাকা, আর বেবুকে ঘুমা পাড়ানো। আমি খুব ভাল করে জানি ও নিজের যত্নটা আমি না থাকলে একটুও নিতে পারবে না। কাজের মেয়ে, মা আর আমার ছোট বোন, সবাই থাকার পরেও নিজের মনকে বুঝাতে পারিনি ঐক’টা দিন। আমি উর্মিকে হাতে করে খাইয়ে দিয়েছি, ওর যাবতীয় যা যা দরকার আমি নিজে থেকে দেখাশুনা করেছি। ও নিষেধ প্রতিদিনই করতো। আমি কিভাবে পারবো ভুলে যেতে সেই দিনগুলো, যখন উর্মি পেটে চাপ দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মুখ বুঝে ব্যথা সহ্য করতো বাবু নড়াচড়া করতো বলে? কিভাবে ভুলে যাব যে ও রাতে এক পাশ থেকে অন্য পাশে ফিরতে পারেনি শেষ কতগুলা দিন? আমি রাতে ওর জন্যে জ্যুস বানিয়ে রাখি, খেতে চায় না, তাই নিজের হাতেও এক গ্লাস নিয়ে রাখি, ‘তুমি না খেলে আমিও খাবো না!’ না খেয়ে কই যাবে!


উর্মি আর আমি সংসারের সবকিছু গুছিয়েছি ধীরে ধীরে, খুব সুন্দর ভাগাভাগির জীবন আমাদের। কিন্তু বেবুকে উপহার দেবার সমস্ত কৃতিত্ব আমি ওকেই দিব। একটা মায়ের কষ্টের কথা সবসময় শুনেই এসেছি, কিন্তু দেখিনি, আর ওকে যতদিন এই কষ্ট পোহাতে দেখলাম, তাতে সামান্যই হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছি, যা সেই রাতের ব্যথার একটা মুহূর্তেরও সমকক্ষ নয়। একটা স্বামী যখন খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে পরে থাকে রাতের পর রাত, তখন আর কেউ পাশে না থাকলেও নিজের স্ত্রী পাশে নির্ঘুম রাত কাটায়, কখন কি দরকার হবে তা ভেবে। আর এইটুকু আমি করতে পারবো না আমার স্ত্রীর জন্যে!

উর্মিকে সকালে জাগাই না, আমি উঠে নিজে নাস্তা করে রওনা হই অফিসে। ঘুমাক আমার পরীটা, যাবার সময় যখন দেখি পাশাপাশি দু’টি মুখ ঘুমাচ্ছে, আমার কলিজার দুটি টুকরা, আমার পৃথিবীর সব সুখ তখন যেন সেখানে উপচে পড়ছে, মন কি আর যেতে চায় কোথাও! চুপ করে পাশে বসে দুজনকে প্রানভরে দেখি, হাত বুলিয়ে দেই দুজনের মাথায়। কি যে মিল আমার দু’টি বাবুর! আজও আমার প্রার্থনাতে আমি বেবুকে আগে আনতে পারিনি, উর্মিই সর্বাগ্রে থেকেছে। আল্লাহকে শুকরিয়া, আমার এই ছোট্ট দুনিয়াটা যেন চিরদিন এমন ভরাট হয়ে থাকে এই দুই পরীর পদচারনায়।

(কল্পনাকে পঁুজি করে লিখা)
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০১৪ সকাল ১০:৩৩
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×