somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আয়না

১১ ই জুলাই, ২০১৪ দুপুর ১২:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বুঝ হবার পর থেকে মাকে খুব কম সময়ই খুশি দেখেছে রাজু। কিছু মুহূর্তের কথা মনে পড়ে রাজুর, মাকে দেখতো গুন গুন করে গান গাইছে, তখন মায়ের হাতে একটা আয়না থাকতো, মা সাজতো তখন। সেটা হতো শুধু সন্ধ্যের দিকে, সারাদিনের কাজ শেষে মা শুধু তখনই শুধু একটু সময় পেত। খোপাটা করার আগে মা কালো চুলগুলোকে ছড়িয়ে নিতো, তারপর তাতে তেল লাগাতো বেশ সময় নিয়ে, তারপর আরো কালো হয়ে উঠত মায়ের চুলগুলা। শেষে মা যখন ঘোমটা টানতো, তখন রাজু বিছানার পাশে মাটিতে দাড়িয়ে হেলান দিয়ে মাকে দেখতো, মাঝে মাঝে সে আয়নাটা ধরে রাখতো আর মা সাজতো। তার একটু পরেই বাবা দরজায় এসে আওয়াজ করলে মা আর রাজু দু’জনই ছুটে যেত। বাবাও মায়ের থেকে চোখ ফেরাতে পারতো না কিছুক্ষনের জন্যে। রাজু তখন কিছুটা আক্ষেপ করতো বাবা তাকে কোলে নিতে দেরী করতো বলে। অবশ্য মাঝে মাঝে খেলনা পেয়ে ভুলে যেত সে আক্ষেপ।

রাজুর খেলনাগুলা অনেক দামী তার কাছে। ছোটবেলা থেকেই একা একাই খেলতো, কাউকে সাথে নিত না, যদি ভেঙে ফেলে। দিনের শেষে ভালমত ধুয়ে-মুছে তারপর রেখে দিত। দুষ্টামিতে তাদের গলিতে সে মাঝামাঝি ধরনের, চুপচাপ স্বভাবটা বয়সের আগেই চলে এসেছে তার মাঝে। তাদের কাঠের সোকেসটার একটা গ্লাস ভাঙা, সেটার ভিতর দিয়েই তার খেলনার সবকিছু জমা করে। সে ভাঙেনি এটা, তার মা একদিন পড়ে গিয়েছিল এর উপর। সে খেলা শেষে বাইরের থেকে এসে দেখে মা সোকেসটার পাশে বসে কাঁদছে, মায়ের কপাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। দৌড়ে পানি এনে দেয় মাকে, তারপর পাশের ঘরের রহিমা খালার বাসা থেকে মলম নিয়ে আসে, রহিমা খালা এসে মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে দেয়। মাকে নিয়ে তার চিন্তাটা একটু বেশি, কারন তার মা অন্য মায়েদের চেয়ে আলাদা, তার মা চোখে দেখে না।

রাজুর মা জন্মান্ধ না; রাজুর বয়স যখন তিন বছর, তখন তার মায়ের টাইফয়েড হয়। রাজুর বাবা সময়মত ডক্তার দেখায়নি, সপ্তাহখানেকের জ্বর কমছিলই না, ডাক্তার ব্লাড টেষ্ট করতে দিয়েছিল। মা বলেছিল টেষ্টগুলা করে ফেলতে, কিন্তু রাজুর বাবা করবে করবে করে অবহেলার কারনে কোন এক সকাল থেকে অন্ধকার হয়ে যায় হতভাগিনির চোখের সব রং। তারপর থেকে রাত হোক আর দিন পৃথিবীর কোন রঙের তফাৎ আর খুজে পায়নি তার মা। তাই বলে সংসারের কোন কাজ থেমে যায়নি, প্রথম প্রথম রাজুর বাবা অপরাধবোধ হোক, আর ভালবাসার জন্যেই হোক সংসারের টুকটাক কাজে মাকে সাহায্য করতো, সেই কটা দিনই তার মায়ের শেষ হাসিটা দেখেছিল রাজু। মাস কয়েক না গড়াতেই রাজুর বাবা আরেকটা বিয়ে করে। মা জানতো না, জানবেই কি করে! যে নিজে বলতে পারেনা পড়নের শাড়ির রঙের কথা, সেই মনুষটা কিভাবে পৃথিবীর দূষিত রঙের বর্ণ খুজে বেরাবে? একদিন রহিমা খালা এসে বলে দিল মাকে। বাবাকে যখনই মা কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করলো, তখন থেকেই শুরু হলো মায়ের উপর অত্যাচার এই সংসার ছেড়ে চলে যাবার জন্য। রাজু তখনও ছোট, তারপরেও বাবার মুখের কথা আর মায়ের চোখের পানি এখনো তার মনে পড়ে। সেদিনের সে পা পিছলে পড়াটাও হয়তো বাবার দেয়া গলাধাক্কার কারনে হবে।

অন্ধ হবার পর সে আয়নাটায় ধুলা জমতে থাকে। বাবাও দেরিতে বাসায় আসে, আর খেলনা আনে না। রাজু আর খেলনা নিয়ে খেলে নি কোনদিন। সেটার জন্যে তার কষ্ট হতো না, কষ্টটা ছিল মায়ের জন্যে। তার মায়ের চুলগুলা আর কালো থাকেনি, কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে উড়তো। সেই ঘোমটায় ঢাকা মায়ের চেহারাটা আর খুজে পেল না রাজু। একদিন সে মায়ের হাতে তেলের শিষিটা আর আয়নাটা এনে দিয়েছিল, মা আয়নাটা ধরে শুধুই কাঁদলো অনেকক্ষন, সে আয়নাতে মায়ের হাসিভরা মুখটা আর দেখা যায়নি, চোখের পানি শুধু গড়িয়ে পড়ছিলো, আর তেলের শিষিটা কোনায় সেভাবেই পড়ে রইলো। রাজু মাকে খুব জোর করেছিল, ভেবেছিলো আজও বাবা আসার পর দৌড় দিয়ে গিয়ে সে দরজা খুলবে, আর এসে যখন ঘোমটায় ঢাকা মায়ের কালো চুলগুলা দেখবে তখন তার বাবা আবার আগের মত হয়ে যাবে। নাহ, আয়নাটা মা দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো।

রাজুর মা অনেক আগেই মরে গিয়েছে। সেদিনের মাথার ঘা আর সারেনি, ব্যাথাটা আর কমেনি, আবার জ্বর এসেছিল, জ্বরকে অনেক ঘৃনা করে রাজু। মা শেষ দিনটায় যখন রাজুর হাত ধরে বলেছিল, 'বাবা মানুষ হবি তুই, স্কুলে যাবি, বাবাকে জ্বলাবি না।’ রাজু মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘মা, তুমি কই যাও?’ মা কিছু বলেনি, রহিমা খালা শুধু তাকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলো। পরের দিন সবাই তার চোখের সামনে মাকে খাটে করে বাইরে নিয়ে গেল, সেদিন ভাবে নি মা আর আসবে না, তাহলে রাজু যেতে দিত না। বাবা চলে যাবার সময় রাজুকে কিছু খেলনা কিনে দিয়েছিলো। রাজু সেগুলো নিয়েছিলো, কিন্তু সে খেলনাগুলা দিয়ে আর কোনদিন খেলেনি, পাড়ার অন্য ছেলেদের দিয়ে দিয়েছিলো, সেই সোকেস আর নেই, খেলনাগুলা আর রাখার জায়গা নেই তাই হয়তো। কিন্তু মনে করে বাবার কাছ থেকে সে আয়নাটা রেখে দিয়েছিলো। তারপর থেকে রহিমা খালার কাছে বড় হয় রাজু। মায়ের সেই চেহারাটা আজও খুজে রাজু, না ওর স্মৃতিতে না, ঐ আয়নাটায়। আয়নাটা আজও রাজুর কাছে আছে, তার বউ সাজে তাতে। সে আয়নাতে যখন বউকে কপালের টিপ লাগাতে দেখে, সেই কালো চুলের খোপাটা রাজুর চোখে আজও ভেসে উঠে। এই আয়নার মাঝে রেখে দিয়েছে মাকে, শুধু সে দেখতে পায়।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুলাই, ২০১৪ দুপুর ২:১২
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×