somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"দুইমাত্র প্রতিবেশী"

১৫ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ৮:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঢাকার বাসায় প্রতিবেশী পাওয়া খানিকটা কঠিন, বিশেষ করে আমাদের মত যারা ভাড়া থাকে তাদেরতো পকেটের মাপ আর কর্মক্ষেত্রের সাথে সাথে বাসা পরিবর্তন করতে হয় তাই প্রতিবেশীর বন্ধন কি জিনিস খুব কমই জানতে পারি। আমি যেখানে আছি, সুবাস্তু টাওয়ার সেটাকে পুরোপুরি যান্ত্রিক লিভিং বলা যায়, মানে এপার্টমেন্ট। ঢাকার এই এপার্টমেন্ট সিস্টেম বাসায় জন্মদিন, মৃতের জানাজা, জুমার নামাজ ছাড়া বুঝা যায় না মানুষ আছে কিনা। ওহ আরেকটা সময়, যখন কারো বিয়েতে গায়ে হলুদে ঠাডা-মার্কা গান বাজানো হয়, তখন উপচে পড়া ভিড় হয়।

সবাই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত কাজের দৌড়ে, আর রাতে ব্যস্ত হিন্দি সিরিয়াল আর রাজনীতির খবর নিয়ে। এখন এক ইউনিটে শাকিরার ঢুলাঢুলি করা চিৎকার ফ্লোর কাঁপায়, আর পাশের ইউনিটে কোন এক মেয়ে ‘ইয়াসিন সূরা’ পড়ছে মুমূর্ষ বাবার মাথার মাছে বসে। পাশাপাশি থেকেও জানে না কেউ কারো কথা, জানতে পারে মারা যাবার পর, তাও নিচ থেকে দাড়োয়ান জানালে,

-স্যার তিনতলার মুরুব্বী একটু আগে মারা গেছেন।
-পাশের ইউনিটে আবার বয়স্ক কেউ আছে নাকি??
-আছে স্যার, আইজ ২ বছর ধরে বিছানায় ছিল…।
-ও, জানাজা কখন?

'ভাবি চিনি আছে?’ বা 'আপা এই নিন আমাদের গ্রামের থেকে আনা ফল’ বা ‘আন্টি, বাবুর খুব জ্বর, কি করব?’ বা ‘আরে ভাই যে, কি খবর? বাসায় আসেন না অনেক দিন, রাখেন ব্যস্ততা, বাসায় আসেন চা খেতে খেতে কথা হবে' এইসব কথা আর কেউ বলে না। সম্পর্কের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে এই ছোট আবদারগুলা অনেক সূক্ষ, অনেক খাটি। আর এভাবেই সৃষ্টি হয়ে এসেছে আমাদের জাতির ভ্রাতৃত্বের নিবিঢ় বন্ধন।

মেইন রোডের পাশে থাকায় বারান্দায় দাড়ালে মানুষ কম, রাস্তার যানবাহন দেখা যায় বেশি। পাশের বাসার বারান্দা দিয়েতো আর প্রতিবেশী বানানো যায় না, লুচ্চামি করে কেউ কেউ অবশ্য প্রেম চালাতে যায়, সেই শিক্ষাও নাই। তাই citylife এখন desert মনে হয়।

যাই হোক, এক সিঙ্গেল মাকে প্রায়ই দেখি আমার বারান্দা দিয়ে। দেখা হয় শুধু গোধূলির সময়, মানে সূর্য যখন ডুবে ডুবে আর আকাশ যখন ক্যানভাসের রংতুলির কাজ শেষ করে সেই সময়টায়। কোনদিন তার আগে আসতে দেখিনি। এসেই বাসায় ঢুকে না, কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘুরে তারপর বাচ্চার কাছে যায়। গত তিন মাস ধরে আমি লক্ষ্য করছি তাকে, বাচ্চার বাবাকে দেখিনি, তাই ধরেই নিলাম সিঙ্গেল মা। বাচ্চা এখনো হাঁটতে পারে না ঠিকমত, তাই বাসায় চুপচাপ বসে থাকে মা আসার আগ পর্যন্ত। ইস খুব ইচ্ছা হয় বাচ্চাটাকে একদিন বাসায় নিয়ে আসতে, সম্ভব হলেতো কবেই নিয়ে আসি! মাঝে মাঝে আমাদের বারান্দার অনেক কাছে চলে আসেন মা, কিন্তু একটি বারও তাকায় না এদিকে! শহুরে জীবন বুঝে গিয়েছে বোধ হয়, তাই মানুষ বিশ্বাষ করে না, কার মনে কি মতলব আছে এইভেবে হয়তো।

দূর থেকে দেখি আমার প্রতিবেশীকে। ভোরে আমি ঘুম থেকে উঠার আগেই তিনি বের হয়ে যান, বাচ্চাটা তখনো আধো ঘুমের মাঝেই থাকে। তাদের বাসাটা দেখলে আমার খুব লোভ হয়, এত সুন্দর বাসা, আর এত খোলামেলা, আলো বাতাসের কোন বালাই নেই। খুব নিপূনভাবে গুছানো বাসা তাদের। মা বাসায় আসার সাথে সাথেই বাচ্চার সেকি আনন্দ! মনে হয় যেন ঝাঁপ দিবে মায়ের কোলে, বেচারী হাঁটতে শেখেনি বলেই এখনো চুপচাপ, নয়তো মাকে যে রকম চঞ্চল লাগে মেয়ে কম যাবে কিসে!

ওদের বাসাটা আমার বাসার উল্টোদিকে, আমাদেরটা সুবাস্তু টাওয়ার আর ওদেরটা মোবাইলের টাওয়ারে। এই দু’জনের জন্যে আমার কিছু বিকেল খুব ভালো কাটে। এতদিন মায়ের ডানাটা দেখেছি, এইবার এই বাবুরটা দেখতে অপেক্ষা করছি; কবে ছোট্ট বাবুটা বড় হবে! কবে উড়ে যাবে মায়ের পিছন পিছন! দোয়া করবেন সবাই, কেউ যেন মোবাইলের এই টাওয়ারটা থেকে পরিষ্কারের নাম করে বা কোন অজুহাতে এই চিলগুলোকে তাড়িয়ে না দেয়। বাবু সবে ডানা ঝাপটানো শিখেছে, এখনো ডানা মেলে উড়তে শেখেনি।

আমার দুইমাত্র প্রতিবেশী এরা।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ৮:৪৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×