somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ত্রিকালে ডুবলো স্নেহের লোটা

০৬ ই মে, ২০০৬ সকাল ১০:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ত্রিকালে ডুবলো স্নেহের লোটা


তেড়িয়া রোদটা মাথার মধ্যে সরুগলির মতো ঢুকে পড়ছে। মফস্বলের কৃশরাস্তাগুলো ঝাঁ দুপুরে কেমন যেন ঝিম্মারা থাকে। তেমনভাবেই হাঁফসানো গরম ঝিঁঝিঁ ধরাচ্ছে ইসাবেলার সর্বাঙ্গে। তবু ইসাবেলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতে থাকে। রোদ ওর কাছে একধরনের নেশার মতো। মরিচের যেমন ক্যাটাগরি তেমনি এক এক সময়ের রোদ ওর কাছে একেক মাত্রার; কোনটা কাঁচামরিচ, কোনটা নাগা আবার কোনটা বোম্বাই। এ এক অদ্ভূত অনুভব! সদ্য কলেজ পেরোনো বয়সে ও যখন রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতো তখন যে কোন তাপই ওর কাছে স্বাভাবিক, তা বৈশাখেই হোক কিংবা আশ্বিনে। গৌরবর্ণ পুড়ছে, ইসাবেলা হাঁটছে, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ, একটা দিনের দুপুর আরেকটার গায়ে জড়ানো। চোখ বন্ধ করলেই ইসাবেলার কত কথা যে মনে পড়ে...

পথ শিশু, পথ মা
টাকা নেই পকেটে। কোনমতে বাসভাড়া। বাসে ফার্মগেট। সেখান থেকে টেম্পোতে মালিবাগ। তারপর হাঁটা, অতঃপর বেইলী রোড। এই রাস্তায় হাঁটতে ইসাবেলার খুব ভালো লাগে। সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, ভিকারুননিসা কলেজ, বিবিধ কোয়ার্টার, দু'পাশ থেকে ঝাঁপানো গাছের ছায়া, ও পাশে রমনা, বই এর দোকান, জামদানী শাড়ীর পসরা, মহিলা সমিতি মঞ্চ - এসব ছুঁয়ে ইসাবেলা প্রায়ই উল্টাপাল্টা হাঁটে। ওর জিনস এর হাঁটু অব্দি ধূলো, হ্রস্বস্বাস্থ্যে শুধু ত্বকের ঔজ্জ্বল্য - মানুষ ঘুরে ঘুরে তাকায়, ইসাবেলা ঘুরনা দিয়ে হাঁটে। গাইড হাউস পেরোলেই ডাস্টবিন। ডাস্টবিনের পাশে প্রায় দেখা যায় না এমন ফুটপাতে বছর সতেরোর একটা মেয়ে বসা। ইসাবেলা দুবার চক্বরের পর খেয়াল করলো। তৃতীয়বারের মুহূর্তে ীণকণ্ঠ শোনে কি শোনে না -"আফা, আমার বাচ্চাটারে কিছু দিয়া যান। কাইল রাইতে হইছে, আমি নড়তে পারতাছি না। একটু সাহায্য করেন।"
চমকে তাকায় ইসাবেলা ফুটপাতে নোংরা কাপড়ের উপর রাখা ততোধিক নোংরা পুটুলিটার দিকে। মনোযোগ দিয়ে তাকাতেই গোলাপী একটা মুখ দেখে ইসাবেলা কাপড়ের ফাঁকে, ঘুমন্ত। পাঞ্জাবীর পকেট হাতড়ে পঞ্চাশ টাকার বেশি পায় না। তাই দেয় গোলাপী'র (ওর ভাবা তাৎণিক নাম) মা কে। তারপর বেইলী রোড থেকে হেঁটে মীরপুরের বাসায় ফেরা সন্ধ্যায়। ইসাবেলা পরেরদিন পর্যাপ্ত (ঐ বয়সে তিন হাজার ওর কাছে অনেক টাকা) টাকা নিয়ে আবার ফেরত যায়। গোলাপী'র মাকে পায় না।

বৈধ, অবৈধ, বিকার...
বছর যাচ্ছে, আবহাওয়া পাল্টাচ্ছে। বৈরীতা সর্বত্র। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে এসে সানস্ট্রোকের ভয়ও পেতে হচ্ছে। পরিবেশের উপর কৃত অত্যাচার ফিরে ফিরে আসছে মানবের দুয়ারে। তাই ষড়ঋতুর বাংলা দ্বি-ঋতু, গ্রীষ্ম-বর্ষায় বিভক্ত হবার জোগাড়। মানিয়ে নেয়ার খেলা চলে। নতুন আড্ডার জায়গা ইসাবেলাদের মধুমিতা সিনেমা হলের পাশে, এক সিনিয়র ফ্রেন্ডের বাসায়। ইসাবেলা মধুমিতা হলের পাশ দিয়ে লঘু পায়ে হাঁটতে থাকে। এখানে ঢুকলেই ন্যাড়া পাগলী'র দেখা মিলে। দেখেও না দেখার ভান করে এটুকু পথ পার হওয়া সবদিক থেকে শ্রেয়। প্রতিদিনই ওর আড্ডায় নিজেকে সঁপতে একটু সময় লাগে এই বৈরী অভিজ্ঞতার কারণে। টুকরো কথা, ছেলেদের তৈরী নিকোটিনের ধূম্রের ফাঁকফোকর গলে ন্যাড়া পাগলীর কথাই ওর মনে থেকে থেকে ভেসে ওঠে। ময়লা ম্যাঙ্ িসদৃশ জামা, ন্যাড়া মাথা, মাত্রাতিরিক্ত উন্নত বুক, পোড়া ফর্সা রং এ তামাটে ডিসটেম্পার, জামার পেছনে জমাট কালো রক্ত - ইসাবেলার মধ্যে একধরনের বুনো ক্রোধ জন্ম দেয়। কেন এ মহিলার পরিবার একে এই ভরা যৌবনে গৃহহীন করেছে? মানসিক স্থিতিহীন মানুষকে দেয়া যায় না সামান্য আশ্রয়! ইসাবলো গোপনে চোখ মোছে। জাকিয়া ভাবীকে ত্বরিত বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ে ঝোলা কাঁধে। বেশ কয়েক মাস আর ওপথ মাড়ায় না। হয়তো ঐ দুঃসহ স্মৃতি এড়াতেই!
জাকিয়া ভাবীর ফোন - "একবার আয়। বারোয়ারি না, শুধু তোতে-আমাতে গল্প হবে। দুপুরে বাচ্চারা ইস্কুলে থাকবে, তোর ভাই অফিসে। কাশ কেটে আয়। নতুন তোলা কিছু ছবি দেখাবো।"
গলি দিয়ে ঢোকা যাচ্ছে না। রোদে গ্রিল হবার দশা। ইসাবেলা দেখার চেষ্টা করে এত ভীড়ের কারণ- ন্যাড়া পাগলী ঢাকের মতো পেট নিয়ে ড্রেনে পাছা ঝুলিয়ে বসা, বড় কাজ করার ভঙ্গীতে। একটু পর পর বলছে -ব্যথা, অনেক ব্যথা। জমে যাওয়া জনসমুদ্র হাসছে। ভূতে পাওয়া মানুষের মতো ভীড় ঠেলে ইসাবেলা জাকিয়া ভাবীর কাছে যায়। জাকিয়া ভাবী- ইসাবেলা ন্যাড়া পাগলীকে জাকিয়া ভাবীদের বাসায় এনে দোর দেয়। ঢাকা শহরের মোটামুটি আধুনিক সিনেমা হলের পাশের গলি মুখরিত হয় একটি শিশুর কান্নায়। বেজন্মা কোন/কিছু পুরুষের বীজ ন্যাড়া পাগলীর বদৌলতে ইসাবেলা নামক এক বাইশের তরুণী আর জাকিয়া নাম্নী তিন সন্তানের জননীর হাতে জন্ম নেয়। পাগলীকেও এদেশের বিকারগ্রস্ত পুংগোষ্ঠীর একাংশ ছাড়ে না।

ত্রিকালে ডুবলো স্নেহের লোটা...
চাকরীটা ভালোই। ইসাবেলা মাইনে যা পায় খারাপ না। এতিমখানায় সামান্য ক'টা টাকা দিতে ভালোই লাগে। সংসারমুখী না হয়েও ইসাবেলা এভাইে শিশুসঙ্গ পায়। ও গোলাপীকে খোঁজে। ন্যাড়া পাগলীর বাচ্চার খরচ যোগায় এতিমখানায়। পাগলী হলে কি হবে ঠিকই যতদিন বেঁচে ছিলো জাকিয়া ভাবীর বাসার সামনে মাসে দু'মাসে হাজির হতো ভেজা দু'চোখ নিয়ে। দু-তিনদিন জাকিয়ার বাসার বারান্দায় থেকে আবার রাস্তার বাসিন্দা রাস্তায়।
ইসাবেলা একটা ভয়ংকর (!) কাজ করে। ন্যাড়া পাগরীর বাচ্চাকে দত্তক নেয় সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে।
: ভর্তি ফি কত?
ঃ সাতচলি্লশ হাজার টাকা।
ইসাবেলা নামী ইংলিশ মিডিয়ামে বাবলীকে ভর্তি করবে। লোনের অ্যাপ্লাই করে অফিসে। অ্যাপ্রুভ হয়ে যাবে জানে। ফরম পূরণ করতে থাকে ইসাবেলা, বাবলীর স্কুলের...

নিষপ্রয়োজন টীকা
সাড়ে আঠারোর ইসাবেলা গোলাপীকে খুঁজে পায়নি আর। কিন্তু মায়া এড়াতে পারেনি। বাইশের ইসাবেলা ধাত্রীর ভূমিকায় জীবনের আশ্চর্যতম মুহূর্ত (মানবশিশু জন্ম) এর ভাগীদার। ত্রিশের ইসাবেলা অবিবাহিত মা। কারণ মায়েরা এভাবেই দেশে দেশে, কাজে - দৃঢ়তায় সন্তানদের রা করেন। সে পথের মা-ই হউন, ন্যাড়া পাগলী অথবা অদ্ভূতুড়ে ইসাবেলা। তারা সবকালেই স্নেহরসে টইটুম্বুর, সব বিপত্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। নিজের মা'কে দেখে আপনারও কি তাই মনে হচ্ছে না!
মনে না হলে প্রথম থেকে আবার ইসাবেলার সাথে হাঁটুন সাহস করে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘স্বর্ণামতি সেতু’ থেকে

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ৩০ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯



আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। তার একটা আদুরে নাম আছে, ‘স্বর্ণামতি’। কে, কবে, কেন নদীটির এ নাম দিয়েছে, তা আমার অজানা। তবে নামটি আমার খুবই প্রিয়। এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষড়যন্ত্রঋতু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২৯

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সারাবছরই ঐক্যের ঋতু, এখানে রাজনীতিতে শত্রু না থাকলে মিত্র টেকে না। যতদিন হাসিনা ছিল, স্বাধীনতাবিরোধীরা ছিল একটি সুখী পরিবার। বাম জানত ডানকে ঘৃণা করতে হয়, কিন্তু আপাতত স্থগিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার পছন্দের বাংলা গানগুলো

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১:১১


অনেকদিনের ইচ্ছে পছন্দের বেশকিছু গান নিয়ে একটা পোস্ট দেব। দেওয়া হয়নি, কারণ, বিষয়টা সময়সাপেক্ষ। আজ হুট করে বসেই পড়লাম। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুলগীতি, লালনগীতিসহ নানান ধরনের গানের একটা তালিকা করছি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×