উপহার যখন উপহাসের হাতিয়ার
পালা পার্বণে, বিবিধ উপল েমানুষ মানুষকে শুভেচ্ছা জানায়। বিনিময় হয় ছোটোখাটো উপহারেরও। এ একধরনের ভাবের আদান প্রদান প্রক্রিয়া। সব সংস্কৃতিতেই বিয়ে একটি উৎসব। যে কোন শ্রেণী নির্বিশেষে এই উৎসবে চলে উপহার প্রদান। শুধু মাত্রা ভিন্ন হয় শ্রেণী ভেদে।
একটি টেপরেকর্ডারের জন্য...
আলেযারা চার ভাই, চার বোন। বোনদের মধ্যে আলেয়া দ্বিতীয়। শহরে বাসাবাড়ীর কাজ করতে করতেই আলেয়া সাবালিকা। অতঃপর গ্রামে প্রত্যাবর্তন এবং সবশেষে বিয়ে। বিয়েতে ছেলেকে হাতঘড়ি, সাইকেল, ক্যাসেট প্লেয়ার এবং পাঁচ হাজার টাকা দেবার কথা হয়। মিন্নাত আলীর সাথে আলেয়ার কবুল হযে যায়। শুধু ক্যাসেট প্লেয়ারটা দু'মাস পরে দিবে এমন শর্তে মেয়েকে তুলে দেয়া হয় মিন্নাত আলীর হাতে। মাস গড়ায়, হাতের মেহেদী বহু আগেই ফিকে। আলেয়ার মনে লম্বা ছায়া পড়তে থাকে আতঙ্কের। পারে না আলেয়ার গরীব বাবা টেপরেকর্ডার কিনতে দু'মাসের মধ্যে। অতএব আলেয়া বাবার বাড়ী আসে। নিজের সাথে শরীরে আরেকজনের অস্তিত্বও ইতিমধ্যে আলেয়া টের পায়। খবর দেয় মিন্নাত আলীকে, লাভ হয় না। আলেয়ার দুরবস্থার কথা জানতে পেরে ও শহরে যে বাসায় কাজ করতো তারা ক্যাসেট প্লেয়ার দিয়ে যান। আলেয়াও ফেরত যায় মিন্নাত আলীর সংসারে। গর্ভের সন্তান, আলেয়ার উপস্থিতি সব আবার দামী হয়, একটি টেপরেকর্ডারের বিনিময়ে।
এগুলো তো যৌতুক না, ভালোবেসে দেয়া...
সবচাইতে ভন্ডামী মধ্যবিত্তদের মাঝে। এর উপরে একটা মোটাসোটা উপন্যাস লিখতে পারবো।
ভার্সিটিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। এক বন্ধুর ভাইয়ের জন্যে হন্যে হয়ে পাত্রী খোঁজা হচ্ছে, ছেলে অস্ট্রেলিয়া থাকে। তিনমাসের ছুটিতে এসছে, বিয়ে করে যাবে। বন্ধু খুবই পেরেশান সবকিছু নিয়ে। লেটেস্ট পাত্রীর ছবি দেখে বলি- মেয়েটা তো সুইট, কি পড়ে রে!
পাসকোর্সে বিয়ে পাশ করছে।
তো এই মেয়েদের সাথে ফ্যামিলি মিললে, তোর ভাই রাজী হলে এখানেই বিয়ে করিয়ে ফেল্ না। আমার তো ভালোই লাগছে। গ্রুপের অন্যরাও আমার কথায় সায় দেয়।
সবই ঠিক আছে কিন্তু ওরা ক্যাশ তেমন দিতে পারবে না। আর আমার ভাই বিদেশেই থাকবে, ফার্নিচার হাবিজাবি এসব দিয়ে কি করবো? আমার আব্বা ভাইয়াকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে পড়াতে যে খরচ হয়েছে তার অন্তত ফিফটি পার্সেন্ট ক্যাশ হিসেবে ফেরত চান।
মেজাজ ঠান্ডা রেখে জিজ্ঞেস করি, কত দিতে রাজী হয়েছে?
দু'লাখ।
আবার জিজ্ঞেস করি তোদের জন্ম থেকে দুধ-ফুধ যা খাইয়েছে তোর আব্বা হিসেব রাখেনি? আফসোস দোস্ত তুই তো বেশি দামে বিকোবি না, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াতে তো তোর বাবার তেমন খরচ হয়নি! সবাই খ্যাক খ্যাক করে হাসে। বন্ধুর মুখ একটু ম্লান হয়। এই হলো আমাদের শিতি মধ্যবিত্ত!
এই ঘটনাটা আরও ইন্টারেস্টিং। ছেলে বিধবা মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকে। ভালো চাকরী করে। দু'জনের আর কত বড় বাসা লাগে! মোটামুটি ফার্নিশড বাসা। ছেলের বিয়ে ঠিকঠাক। সে খুবই চিন্তিত। তার তো বাসা চেঞ্জ করতে হবে কারণ ফার্নিচার টিভি আরও আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র তার তো আছেই, এখন শ্বশুর বাড়ী থেকে যা পাবে সেগুলো রাখবে কোথায়? সো বাসা পরিবর্তন। সহজ সমাধান সেইসব উপঢৌকন না নেয়া, এই কথা মাথায় আসে না।
বড়লোকের বিরাট অবস্থা
গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। বেচারা (!) র দু'মেয়েই একটু শ্যামলা। ছেলে আবার দুধে আলতা। বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। মেয়ের রং এর বিপরীতে বারিধারায় ফ্যাট, মেয়ে একটু শর্ট তাই সিআরভি গাড়ী।
অনেক অত্যাচার, নির্যাতন শ'খানেক মৃতু্যর ইতিহাস প্রতিবছর এই অযৌক্তিক উপহারের দাবীতে ঘটে যাচ্ছে। আমাদের অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না। এ বিষয়ক কৌতুক শোনেন একটা -
ফয়েজ সাহেব একমাত্র ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে ঘরে বাইরে সাজিয়ে দিয়েছে পাত্রীপ। সেই ফয়েজ সাহেব হঠাৎ করে যৌতুক বিরোধী কথাবার্তা বলা শুরু করেছেন এ্বং বলতে নেই একেবারে জনমত গঠনের চেষ্টাও চালাচ্ছেন। কারণ তার বিবাহযোগ্যা মেয়ে তিনটি। ছেলের বউকে ঘরে আনতে যা এনেছেন সেই মেয়ের বাবার কাছ থেকে, তাকে যদি তার মেয়েদের বিয়েতে এর অর্ধেকও দিতে হয় তাহলে বিডিফুডস এর সাথে হিরোইনের ব্যবসায় নামতে হবে।
আমরা না কি অনেক ধার্মিক, ধর্মভীরু জাতি। মেয়েদের পর্দা করার জন্যে অনেকে জান কোরবান করে ফেলছেন। যৌতুকের ঘূর্ণিচক্রের বিরুদ্ধে ধর্ম পালনকারীরা কিছু বলেন না। নবীজী কন্যা ফাতেমা (রঃ) এর বিয়েতে আপ্যায়ন করা হয়েছিলো খেজুর দিয়ে। স্ত্রীকে গ্রহণ করার আগে দেনমোহরের ফয়সালার একটা ব্যাপার আছে কিন্তু কোথাও এইসব দেয়ার বিধান দেয়া নেই। এক একটা মেয়ে তাদের কতবছরের জীবন ফেলে আরেকজনের পরিবারে আসে। বাবা-মা কলিজা ছেঁড়া সন্তানকে কবুল বলা পুরুষের হাতে তুলে দেয়। তার মূল্য কি একটা ক্যাসেট প্লেয়ার, নগদ অর্থ কিংবা ফ্যাটেই নির্ধারিত হয়ে যাবে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



