ইদানীং আসিফ প্রায়ই বলে "দূর হয়ে যা, দূর হ তুই, তুই গেলেই আমি বাঁচি, যাসনে কেন, পড়ে থাকিস কেন এখানে, লজ্জা নেই তোর? মরার আর জায়গা পেলিনা? এখানে এসে মরলি? " লীনা অবাক হয়ে শুনে। এত অপমান?!!!! "কি কোরবো আমি? আমি লীনা আহসান। ভীষন অসহায় এখন। যে লীনা একসময় অন্যের বুকের বল ছিল, সেই আজ সবথেকে অবলা। নিজের কাছেই সবথেকে অসহায়!!!!!" ভাবতে থাকে লীনা।
আসিফ, লীনার স্বামী, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করে। ওদের বিয়ে হয়েছিল ২ বছর আগে। এর মাঝেই অনেক বার লীনা কে শুনতে হয়েছে "তোর মত নিকৃষ্ট মেয়ে আমি আর দেখিনি, তোর জন্মে সমস্যা আছে, তুই জঘন্য মানসিকতার মেয়ে," আরও অনেক কিছু। আসিফের চোখে আসিফের ভাবীর চেয়ে ভাল মেয়ে আর একটিও হয়না। লীনা উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে "আমি তো কখনও সজ্ঞানে কারও কোন ক্ষতি করিনি, তবে আমার জীবন টা কেন এমন হল?!!!"
তারপরও "দূর হয়ে" যাওয়া হয়না লীনার। আসিফকে যে ভীষন ভালবাসে ও। ভালবাসার জন্য যথেষ্ট কারন আছে কিনা তাও জানেনা লীনা, তবুও ভালবাসে। ভালবাসা বোধ হয় কোন সমীকরনের সূত্র মানেনা!! কতবার লীনার বাবা সাইফ আহসান, বলেছেন "চলে আয় মা, একটি মাত্র মেয়ে তুই আমার, তোকে আমি কষ্টে দেখতে চাইনা"। যায়নি লীনা। যেতে পারেনি। কতবার মনটাকে শক্ত করেছে। তবুও পারেনি। সত্যিই মনটা যার অন্যের হয়ে যায়, শরীরটাও তখন আর তার নিজের দখলে থাকেনা।
অনেক বদলে গেছে লীনা। বিয়ের আগে এমনটি ছিলনা সে। কখনও কারও সাথে মনমালিণ্য হয়নি যে মেয়ের সেই মেয়েটার সাথেই সারাদিন ঠোকাঠুকি চলতেই থাকে আসিফের। হয়ত এভাবে কাউকে ভালবাসেনি লীনা, এভাবে মন_প্রাণ সপে কাউকে চায়নি কোনদিন তাই দ্বন্দ্বও হয়নি। আসিফকে এতটা মগ্ন হয়ে ভালবেসেছে বলেই ওর এতটুকু অবহেলা কিংবা ঊদাসীনতা লীনার সহ্য হয়না!! লীনা চায় নিখাঁদ ভালবাসা। একদম নিখাঁদ!!
আসিফ ভালবাসা টাসার ধার ধারেনা। রাতে চাই একটা প্রস্তুত শরীর, নিজের একটা উত্তরাধীকারি, লোকের সামনে "ভাল ছেলে" সুনাম টা ধরে রাখার সতর্ক চেষ্টা। নিজের বউকে সে নিজের সম্পত্তি তো ভাবেই, সাথে তার মা, বোন, দূলাভাই, বড়ভাই সবার সম্পত্তিও বানিয়ে রাখতে চায়। হয়ত ভাল ছেলে হওয়ার পূর্বশর্তই হল মা বোন দূলাভায়ের কাছে বউয়ের বদনাম করা, মিথ্যে দোষারোপ করা এমনকি বউয়ের বাপ মা ভাইকে বাড়িতে ডেকে অপমান করা!!! বিয়ের পর লীনার অনেক খারাপ অভ্যাস জানলো সবাই!!! তার বদনামে দেশ ছেয়ে গেল। লীনার এত এত মন্দ স্বভাবের খোঁজ লীনা নিজেও জানতো না!!! লীনা আজীবন বিশ্বাস করে এসেছে দুই হাতে তালি বাজালে শব্দ হয় মাত্র, কিন্তু হাতের মাঝে তৃতীয় কোন কাঁটা ঢুকলে দুই হাতই ক্ষত বিক্ষত হয়, দুই হাতই ব্যাথা পায়!!!! তাই তাদের দাম্পত্যে লীনার নিজের বাবা মা কেও ঢুকতে দেয়নি। কিন্তু আসিফ...........
তবুও লীনা ছেড়ে যায়না আসিফকে। পোড়া ভালবাসা লীনাকে ঘুন পোঁকার মত ভেতর থেকে ফাঁকা করে ফেলছে। ঘুম আসেনা লীনার। "শেষ হবার আর কিই বা বাকী আছে আমার?!!!!" একা একা ভাবে সে। বারান্দার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে। মনে পড়ে কবিরের কথা.........................
কবিরকে সর্বশেষ যেদিন অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল লীনা, সেদিন কবির অপলক চেয়ে ছিল লীনার চোখের দিকে। একদম স্থির চোখে। বলেছিল "চোখ সরিয়ে নিলে পাছে তোমায় ঘৃনা করে ফেলি!!!" কবিরকে লীনার বাবা মেনে নিতনা কখনই। বাবার মনে কষ্ট দিয়ে কবিরকে গ্রহনও করা হতনা লীনার। তাই বৃথা স্বপ্ন দেখায়নি সে কবিরকে! লিনার বিয়ের খবর শুনে কবির নাকি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। সেই থেকে কবির নাকি প্রায়ই ভীষণ অসূস্থ হয়ে যায়। কিই বা করার ছিল লীনার। বাবার মনে আঘাত করা তো অসম্ভব ছিল ওর জন্য। চোখ বুঁজে লীনা মনে মনে বলে "ক্ষমা করে দিও কবির, আমি নিরুপায় ছিলাম, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলনা। তোমার দীর্ঘশ্বাসের ঝড়ে আমার সুখগুলো সব উড়ে গেছে, এবার ক্ষমা কর!!!"
এমন সময় লীনার বুক ভেঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল........................
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



