somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রাইভেট কোচিং: মেধাবী, দক্ষ ও চরিত্রবান নাগরিক গড়ার ক্ষেত্রে হুমকি

২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


প্রাইভেট কোচিং বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় ধরণের সমস্যা। যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের অন্তরায়। এই ব্যাপারটি এখন সচেতন অভিভাবক মহলের কাছে একেবারেই স্পষ্ট। অধিকন্তু কিছু অভিভাবক মনে করেন প্রাইভেট পড়লে তাদের সন্তান ভাল রেজাল্ট করবে। কিন্তু তারা হয়তো জানেন না যে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পাশ করা নয়। বরং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একদল নাগরিক গড়ে তোলা যারা নিজস্ব আদর্শ ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে সক্ষম হবে। আর সেজন্য পাশ করার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থী যাতে দৈহিক-মানসিক বিকাশের মাধ্যমে পঠিত বিষয়কে বাস্তব জীবনের কর্মে রুপ দিতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অথচ আশ্চর্যভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যত্রতত্র প্রাইভেট কোচিংয়ের ব্যাপক প্রচলন। শ্রেণী শিক্ষকরা ক্লাসের আগে-পরে নিজস্ব বাসায় কিংবা প্রতিষ্ঠানে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন, খুলে রেখেছেন কোচিং সেন্টার। অনেক শিক্ষকই ক্লাসের চেয়ে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের দিকে বেশী নজর দিচ্ছেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের দেযা নির্দেশনা মোতাবেক অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ২-৩ মাস আগ থেকে শিক্ষার্থীদের নাইট কোচিং, ডে কোচিং বাধ্যতা মূলক করে দেয়া হয় এবং পরীক্ষার ফরম পূরণের সরকারী ফি’র সাথে অতিরিক্ত কোচিং ফি’ অগ্রিম নিয়ে নেওয়া হয়। এতে করে দরিদ্র অভিভাবকগণ বিপাকে পড়ে যান। পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক, বিনা বেতনে অধ্যয়ন এবং উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য শিক্ষা অধিকারকে সহজতর করে দিতে সরকারী উদ্যোগ অনেকটাই বিফল হয়ে যায় শিক্ষক সমাজের অমানবিক বাধ্যতামূলক প্রাইভেট কোচিং ব্যবসার কারণে। নাইট কোচিংয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকার জন্য বিদ্যালয় থেকে দূরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের কাছাকাছি কোন পরিবারে পিন গেস্ট থাকতে হয়। এতে কোচিং ফি’র বাইরে অভিভাবককে গুণতে হয় কয়েকগুণ বেশী থাকা-খাওয়ার খরচ। নাইট কোচিং থেকে শিক্ষার্থীকে বাড়ী নেওয়ার জন্য অভিভাবককে বাধ্যতামূলকভাবেই রাত ১০টায় বিদ্যালয়ে আসতে হয়। কখন সন্তান বাড়ী ফিরবে সেই টেনশনে অভিভাবকের ঘুম হারাম হয়ে যায়। বিনিময়ে কি পাওয়া যায়? শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগ মুহুর্তে নিরিবিলি প্রস্তুতি নেওয়া থেকে বিরত হচ্ছে। সরেজমিনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, নাইট কোচিংয়ের সময়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং রুমে রেখে শিক্ষকগন অফিসে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন, পরীক্ষার খাতা দেখছেন কিংবা বাজারে আড্ডা দিচ্ছেন।
প্রাইভেট কোচিংয়ে কেন শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হয়, এমন এক প্রশ্নের জবাবে একজন শিক্ষক বলেন, প্রাইভেট কোচিং ছাড়া শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারছেনা। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা অধিদপ্তর কি তাহলে ক্লাস সময়সূচীতে বরাদ্ধকৃত সময়ের চাইতে অতিরিক্ত পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করেছে? নাকি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পাঠ্যসূচীর বাইরের কোন প্রশ্ন করা হয়? প্রতি ৪৫ মিনিটের ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী যাতে তার পরীক্ষার পূর্বেই সিলেবাসের আলোকে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারে সে হিসেব করেই শিক্ষা অধিদপ্তর পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে। অথচ দেখা যায়, যে শিক্ষক প্রাইভেট কোচিং পড়াচ্ছেন, তিনিই শিক্ষার্থীর শ্রেণী শিক্ষক। এতে কি প্রমাণ হয়? নিশ্চয়ই উক্ত শিক্ষক তার দায়িত্ব-কর্তব্যে ফাঁকি দিচ্ছেন। বাস্তবেও তাই। উল্লেখযোগ্য শিক্ষক আজ তাদের দায়িত্বের কথা, পেশার প্রতি তাদের কমিটমেন্টের কথা ভুলে গেছেন। তারা যথাযথভাবে ক্লাস নিচ্ছেন না, ক্লাসরুমকে করছেন না কার্যকর। শিক্ষকতার মহান পেশার কথা ভুলে গিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর দিকে অধিকহারে ঝুঁকে পড়ছেন। ফলে নতুন প্রজন্ম যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রমাণ আছে, ক্লাসে বসে শিক্ষার্থীদের সাথে গল্প-গুজব আর যেনতেনভাবে সময় কাটিয়ে শিক্ষক পরবর্তী দিনের পড়ার কাজ দিয়ে বিদায় নেন। যা সম্পর্কে শিক্ষার্থী কোন ধারণাই পায়নি, তা সে কিভাবে পারবে? অথচ পরদিন ক্লাসে পড়া না পারলে দেয়া হয় রামধোলাই। এই ধোলাইয়ের ভয়ে শিক্ষার্থী হয় প্রাইভেটমুখী। আর শ্রেণী শিক্ষক ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রাইভেট পড়লে পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ আছে।
অর্থ লিপ্সু কিছু শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের কর্তব্যে ফাঁকি দিচ্ছেন বলে-গত ৪ মার্চ, ২০০৮ইং তারিখে ‘সার্ভিস রেগুলেশন এ্যাক্ট-১৯৭৯ এর রেগুলেশন ০৯’ অনুসারে তত্কালীন সরকার শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং পড়ানোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এক প্রজ্ঞাপন জারি করেন। এরপরও কিভাবে শিক্ষকগন প্রাইভেট কোচিং পড়াচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোচিং পড়া বাধ্যতামূলক করা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে জানা যায়, স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন প্রাইভেট কোচিংয়ের আয় থেকে বড় অংকের উত্কচ গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং পড়ানোকে জায়েজ করে দিয়েছেন।
দরিদ্র প্রধান বাংলাদেশে শতভাগ শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার শিক্ষাকে বেতনমুক্ত ও বৃত্তিমূলক করেছে। অপরদিকে শিক্ষকতার মহান মহান পেশায় নিয়োজিত স্বার্থপর কিছু শিক্ষক গরীবের অন্ন-বস্ত্রের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, যা সত্যিই লজ্জাজনক। এতে করে স্বচ্ছল অভিভাবকের সন্তান ভাল রেজাল্টে পাশ করতে পারলেও নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শ-চরিত্রের ব্যাপারে থেকে যাচ্ছে নিতান্তই অজ্ঞ। আবার গরীব পরিবারের সন্তানরা অর্থের অভাবে না পারছে প্রাইভেট পড়তে, না পারছে শিক্ষকের কাছ থেকে ন্যায্য শিক্ষা নিতে। সুতরাং এ ব্যাপারে সরকার, সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন নজর না দিলে অদুর ভবিষ্যতে মেধ্যাশূণ্য এক জাতির অপেক্ষায় থাকতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:৪৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার সোভিয়েত শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১





বাংলা ব্লগের জগতে সহব্লগাররা যারা আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন—আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না?

রাশিয়ায় আমি কোনোদিন যাইনি।

তবু আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।

আমার সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটা একটা ফাকিবাজি পোষ্ট

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫



বাংলাদেশে একটার পর একটা বিষয়বস্তু সামনে আসে, আর সবাই সেটা নিয়ে ঝাপায়ে পড়ে। দেখে বিমলানন্দ অনুভবস করি। ''অনুভবস'' বললাম, কারন ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুরা কোন বিষয়ে ওভার-ক্যাজুয়ালি ফানি আলাপ করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ভালোবাসার কাব্য=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১১


মন পিঞ্জরে করবো বন্দি, পালাবি আর পাখি?
জানিস কী তুই তোকে নিত্য, নজরবন্দি রাখি!

স্বাধীন ডানায় উড়িস ঘুরিস, আমায় দূরে ফেলে,
আমারও তো ইচ্ছে লাগে, উড়ি ডানা মেলে!

মনের ভিতর ঘূর্ণি তুফান, বেসুরো সুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×