somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেয়েরা যেমন হয়

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এক.
এক কবি একবার একটি প্রেমের গান লিখলন । চমৎকার একটি গান । কবি তার গানটির অনেকগুলো কপি তৈরি করে বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছে পাঠালেন; যাদের মধ্যে নারী-পুরুষ দুই শ্রেণিই রয়েছে । এভাবে সেই প্রেমসঙ্গীতটি ‍দূর পর্বতমালার ওপাড়ে বসবাস করা এমন একজন তরুণীর কাছেও পৌঁছলো, যার সঙ্গে কবির মাত্র একবারই মাত্র দেখা হয়েছিলো ।
এক কি দু’দিনের ভেতরেই কবির কাছে একজন বার্তাবাহক এলো সেই তরুণীর চিঠি নিয়ে; যেখানে তরুণী লিখেছে— আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমাকে নিয়ে লেখা আপনার প্রেমের গানটি আমার হৃদয় স্পর্শ করে গেছে; এ-কথায় বিন্দুমাত্র মিথ্যা নেই । এবার এসে আপনি আমার পিতা-মাতার সঙ্গে দেখা করুন । আমরা বিয়ের উদ্দেশ্যে বাগদানের ব্যবস্থা করবো ।
চিঠির উত্তরে মেয়েটিকে কবি লিখলেন— বন্ধু, আমার এই গান ছিলো একজন কবির হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসা প্রেমের গান, যা প্রত্যেক পুরুষ প্রত্যেক নারীর উদ্দেশ্যে গেয়ে থাকে ।
মেয়েটি কবিকে এই বলে আবার চিঠি লিখলো— তুমি ভণ্ড ও মিথ্যাবাদী । আজ থেকে আমার কফিনে শোওয়ার দিন পর্যন্ত তোমার কারণে সমস্ত কবিকে আমি ঘৃণা করবো ।


দুই.
এক নারী ও পুরুষ জানালার ধারে বসে ছিলো । জানালার দুটি কপাটই খোলা এবং বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস তাদের দোলা দিয়ে যাচ্ছিলো । তারা বসে ছিলো খুবই ঘনিষ্ঠভাবে । নারীটি বললো— আমি তোমাকে ভালোবাসি । তুমি সুদর্শন, ধনী এবং সবসময় তুমি ভালো পোশাক পরে থাকো ।
পুরুষটি বললো— আমিও তোমাকে ভালোবাসি । তুমি হলে আমার চমৎকার ভাবনা, দুর্লভ ও আমার স্বপ্নের ভেতরে গাইতে থাকা গান ।
শুনতেই নারীটি ক্রুদ্ধ হয়ে তার কাছ থেকে সরে এলো । বললো— জনাব, আমাকে এখন যেতে দিন । আমি কোনো ‘ভাবনা’ নই এবং এমন কোনো জিনিসও নই যা আপনার স্বপ্নের ভেতরে চলাচল করে । আমি একজন নারী । আমি ভেবেছিলাম, আপনার স্ত্রী হবো আমি এবং মা হবো সে শিশুর, যে এখনও জন্ম নেয় নি ।
পুরুষটি বললো— এই দেখো, আরেকটি স্বপ্ন এখন ধোঁয়ার মতো উঠে আসছে ।
নারীটি বললো— হাহ, দেখো কী চমৎকার । একটা মানুষ কীভাবে আমাকে ধোঁয়া ও স্বপ্নে পরিণত করে চলেছে !


তিন.
একবার বিরকাসা’র রাজকুমারের দরবারে এলো এক সুন্দরী নর্তকী । সঙ্গে এলো তার বাদকদল । নর্তকী দরবারে প্রবেশ করেই নাচতে শুরু করলো একেবারে রাজকুমারের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে । সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠলো বীণা, ঝঙ্কার তুললো বহুতারের বাদ্য, বাঁশিতে হাহাকার জাগালো মায়াবি সুর ।
সে নাচছিলো আলোর শিখার তালে তালে । দু’ধারী তলোয়ারের মতো ধারালো আর বর্শার ফলার মতো ক্ষিপ্র ছিলো তার একেকটি মুদ্রা । সে নাচছিলো নক্ষত্রের মতো আলো ছড়িয়ে এবং সুকোমল হাতে মহাশূন্যের সুবিশাল শূন্যতা ফালি ফালি করে কাটতে কাটতে । দেখতে দেখতে রাজকুমারের মনে হচ্ছিলো, এ যেনো বাতাসে নৃত্যরত একটি চমৎকার ফুলের নাচ ।
নাচ শেষে সে রাজকুমারের সিংহাসনের সামনে এসে দাঁড়ালো এবং তাকে অভিবাদন জানাতে মাথা ও শরীর ঝুঁকিয়ে দিলো । রাজকুমার তাকে কাছে ডাকলেন । বললেন— হে সুন্দরতমা, তুমিই কি সেই উল্লাস ও নন্দনের কন্যা, যেখান থেকে শিল্পের শায়কেরা আসে ? তুমিই কি কবিতা ও ছন্দের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সেই উপাদান, যার অঞ্জলি দিয়ে কবিরা খ্যাতিমান হয় ?
নর্তকী আবার রাজকুমারকে অভিবাদন জানাতে মাথা ও শরীর নুইয়ে দিলো । এবং বললো¬— হে ক্ষমতাধর উদার রাজকুমার, আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর জানি না । শুধু এইটুকু জানি, দার্শনিকের আত্মা বসবাস করে তার মস্তিষ্কে, কবির আত্মা স্থির হয়ে থাকে তার হৃদয়ে, গায়কের আত্মা বিলম্বিত হয় তার কণ্ঠনালীর ভেতরে, কিন্তু নর্তকীর আত্মা থাকে তার পুরো শরীরের সঙ্গে ।


চার.
শহরতলী থেকে মেলায় খুব সুন্দরী একটি মেয়ে এলো । যাকে দেখলেই মনে হয়, মেয়েটির মুখে যেনো একই সঙ্গে গোলাপ ও পদ্মফুল ফুটে আছে । তার দীঘল চুলে খেলা করছিলো গোধূলির সূর্যাস্ত আর ঠোঁটে হাসছিলো প্রভাতের মিষ্টি আলো ।
অল্প কিছুক্ষণ পরে এক সুদর্শন তরুণের দৃষ্টিসীমায় সে এলে তার বন্ধুরা মেয়েটির চারপাশে ঘিরে ফেললো এবং মেলার নাচের আসরে তরুণটি মেয়েটির সঙ্গে নাচতে চাইলো । অন্যান্য ছেলেরা তার সম্মানে কেক কাটলো । অনেক যুবক তাকে আহ্বান জানালো । কেননা, এটা ছিলো একটা মেলা, তাই নয় কি ?
কিন্তু মেয়েটি এতে ভীষণ কষ্ট পেলো এবং ভয়ে চিৎকার করে উঠলো । এমনকি যুবকদেরকে সে নিকৃষ্ট পর্যায়ের মানুষ বলে গণ্য করলো এবং তাদের তিরস্কার করতে লাগলো । এক পর্যায়ে সে একটি ছেলের মুখে আঘাত করতেও ছাড়লো না । তারপর নিজেই সেখান থেকে দৌড়ে পালালো ।
সেই সন্ধ্যায় মেয়েটি বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিজেকে বললো— আমি অসম্ভব বিরক্ত হয়েছি । কী পরিমাণে অভদ্র ও বিরক্ত-উৎপাদনকারী মানুষ এরা । আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে ।

পরের বছর মেলার সময় আবার সেই সুন্দরী মেয়েটি মেলায় এলো এবং আনমনে ছেলেগুলিকে খুঁজতে থাকলো । এখনও সে আগের মতোই সুন্দরী; গোলাপ ও পদ্মফুল ফুটে আছে তার মুখমণ্ডলে এবং চুলে খেলা করছে সূর্যাস্ত আর ঠোঁটে হাসছে ভোরের আলো ।
কিন্তু এবার যুবকেরা তাকে দেখে দূরে সরে গেলো । সারাদিন কেউ তাকে সন্ধান করে নি । সে ছিলো একেবারেই নিঃসঙ্গ ও একাকী ।
সন্ধ্যায় বাড়ির রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে এবার সে ভেতরে ভেতরে গুমরে কেঁদে ওঠে । নিজেকেই নিজে বলতে থাকে— আমি খুবই বিরক্ত হয়েছি । কী পরিমাণ অভদ্র ও বিরক্ত-উৎপাদনকারী ওই ছেলেগুলো । আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে ।


মূল : খলিল জিবরান
অনুবাদ : মনযূরুল হক


লেখক পরিচিতি : খলিল জিবারানের (৬ জানুয়ারি ১৮৮৩ এবং ১০ এপ্রিল ১৯৩১) পূর্ণ আরবি নাম ‘জিবরান খলিল জিবরান’ (جبران خليل جبران‎) । ইংরেজি বানানের কারণে তিনি কহলীল জিবরান (Kahlil Gibran) নামে পরিচিত । তিনি ছিলেন একজন লেবানিজ কবি, লেখক ও শিল্পী।
বর্তমান লেবাননের (তৎকালীন জাবাল লেবানন মুতাশরিফাত, উসমানীয় সাম্রাজ্য) উত্তরে বাশারি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সে তিনি তার পরিবারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হন। এখানে তিনি শিল্পকলা নিয়ে পড়াশুনা করেন ও তার সাহিত্য জীবন শুরু করেন। তিনি ইংরেজি ও আরবি দুই ভাষাতেই লিখতেন। আরব বিশ্বে জিবরানকে সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিদ্রোহী হিসেবে দেখা হয়। আধুনিক আরবি সাহিত্যের রেনেসাঁয় তার রোমান্টিক ধারা ধ্রুপদি ধারা থেকে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছে, বিশেষত তার গদ্য কবিতা। লেবাননে তিনি এখনো সাহিত্যের বীর হিসেবে সম্মানিত হন।
ইংরেজিভাষী বিশ্বে তিনি মূলত তার ১৯২৩ সালের বই ‘দ্য প্রফেট’-এর কারণে পরিচিত। যদিও বইটি ১৯৩০ এর দশকে বেশি জনপ্রিয়তা পায় এবং ১৯৬০-এর দশকেও তা ছিলো সমান জনপ্রিয় । উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও লাউযির পর জিবরান তৃতীয় বহুল বিক্রিত বইয়ের কবি।
অনুবাদে উল্লেখিত চারটি ছোটোগল্প কবির ‘দ্য ওয়ান্ডারার’ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে । শিরোনাম অনুবাদকের ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:০৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×