
বাবার অপরাধে যদি সন্তান দায়ী না হয়—তাহলে বাবার কৃতিত্বের কারণে সন্তান পুরস্কৃত হবে কেনো? বোকার মতো ‘উত্তরাধিকারী’ প্রশ্ন সামনে আনবেন না । আপনার বাবা একবছর দৌড়ে জিতেছে বলে, পরের বছর থেকে প্রতিবছর আপনাকে প্রথম স্থান দেওয়া হবে—এটা কি কোনো সভ্য সিস্টেম হতে পারে?
সেবার কৃষিব্যাংকে নির্দিষ্ট কোটায় লোকবল নিয়োগ হবে ১২০০ জন । রিটেন পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেলো টিকেছেই ৮০০ । সুতরাং ভাইভা দিতে গিয়ে তাদের একজনেরও যে বুক কাঁপার ভয় নেই—চাকরি নিশ্চিত—তা না বললেও চলে ।
তখন কমলাপুর মেসে থাকতাম । এই কোটার সুবিধাভোগী সদ্য ক্যাশিয়ার পদে যোগদান করা ছোটকাকার সহপাঠী এলেন নিয়োগ-পরবর্তী ডেটা-ফর্ম পূরণ করতে । ব্যস্ততার কারণে কাকা আমার কাছে রেফার করলেন । বিস্মিত হলাম দেখে যে, লোকটা ‘মাদার’ বানানটাও ঠিকভাবে জানে না ।
ওদিকে কাকা আমার জগন্নাথ থেকে ফার্স্টক্লাস পেয়ে গ্রাজুয়েশন কম্প্লিট করে একটা চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ছুটছেন । এমনকি শতাধিককার রিটেনে টেকার পরও একটা সরকারি চাকরি বাগাতে পারেন নি । এদিকে তার বয়সসীমাও শেষ । ঘুষ দাবির কথা না-হয় তোলাই থাকল ।
সুতরাং এই ধরনের কোটাপদ্ধতি যে শুধু অমানবিক, তা-ই না; বরং দেশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর জন্যেও ভয়ংকর বিপজ্জনক । এই ব্যবস্থা চলতে থাকলে দক্ষ ও যোগ্য জনবল তৈরির কোনো পথই কি বাকি থাকবে?
শহিদ পরিবার, যুদ্ধাহত পরিবার এবং যুদ্ধক্লান্ত পরিবারের দেখাশোনা করা সামাজিক-মানবিক-রাষ্ট্রীয়-জাতীয় দায়িত্বই বটে—সন্দেহ নেই । দেশের সকল মানুষই কি জাতি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানসম নয়? কোনো মুক্তিযোদ্ধাও কি তারই দুটি সন্তানের মধ্যে যোগ্যজনকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে বলে অযোগ্য সন্তানকে চাকরি জোটানোর সুপারিশ করতে পারেন?
রাষ্ট্র যেহেতু তাদের প্রতি সংবেদনশীল, সুতরাং তাদের পরিবারের জন্য এককালীন মোটাঅংকের অর্থ দিতে পারে । তাতে করে যদি তাদের অশিক্ষিত সন্তানও থাকে, সে-ও ব্যবসাপাতি করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে । অন্যদিকে কোটা ছেড়ে কেবল যোগ্য লোকদের নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয়ভাবে যে উন্নয়ন হবে, তার ভাগও তারা পাবে নিশ্চিত । তাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতাও সার্থক হবে । কিন্তু যদি এর উল্টা হয়, তাহলে ফলও উল্টা হবে । সুযোগই একসময় তাদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধবে ।
অবাক লাগে, এই দেশে যেখানে বিরাট একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মেজরিটি পার্সেন্ট সদস্য মাত্র এইট পাশের সার্টিফিকেট দেখিয়ে হাজার হাজার টাকা বেতন গিলছে (উপরি আয়ের কথা বাদই দিলাম), সেখানে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই প্রতি ১০ জনের ১ জন বেকারত্বে অভিশাপে জ্বলবে—এটা ভাবা যায়?
এই আধুনিক যুগেও মানুষ চাকরির বয়সসীমা আর কোটার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে আন্দোলন করতে বাধ্য হবে—সেটাই যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্নফাঁস নিয়ে এতো হৈচৈ কেনো? ছেড়ে দেনে না ! যোগ্যতার তো মূল্যায়ন নেই—দেশটাকেও কোটার মতো কেটেকুটে ভাগ করে যার যেটুকু বীরত্ব সেটুকু তাকে দিয়ে দেন—যার যেমন ইচ্ছা লুটেপুটে খাক, বিবাদ মিটে যাক । বাধা দিচ্ছেন কোন মায়াকান্নায়?
পিতার কৃতিত্ব, আঞ্চলিক পরিচয়, মহাজনের সুপারিশ, উপজাতীয়তা, নারীত্ব কিংবা প্রতিবন্ধিত্ব—এসব যেমনি কোনো যোগ্যতার মাপকাঠি নয়, তেমনি এসবের কারণে কেউ অযোগ্যও বিবেচিত হতে পারে না । ব্যক্তির কর্ম, শিক্ষা, গুণাবলি ও দক্ষতাই হয় কর্মী হবার মাপকাঠি ।
থাক, বাদ দেন—আসুন, সকলে মিলে আসন্ন একটি অন্ধকার যুগের প্রতীক্ষায় প্রহর গুণি...
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ দুপুর ১২:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



