
ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়জন মহীয়সী নারী কর্মদক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা পরিশ্রম ও চারিএিক গুণাবলীর দ্বারা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে দাক্ষিণাত্যের আহমদনগর রাজ্যের চাঁদ সুলতানা অন্যতম। ষোড়শ শতাব্দীর দাক্ষিণাত্যের(দক্ষিণ ভারত) আহমদনগর রাজ্যের স্বাধীন সুলতান হুসাইন নিজাম শাহের(১৫৫৩-৬৫ খ্রিঃ) কন্যা ছিলেন তিনি। ঐতিহাসিকদের অনেকে তাঁকে 'চাঁদরানী' , 'চাঁদবিবি' , ও 'মহীয়সী চাঁদ' , বলে অভিহিত করেছেন। বৈবাহিক সূএে তিনি বিজাপুরের স্বাধীন শাসক প্রথম আলী আদিল শাহের(১৫৫৮-১৫৮০) পত্নী ছিলেন।
চাঁদবিবির জন্ম ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে। ১৪ বছর বয়সে ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে আদিল শাহের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। শাসনকার্য পরিচালনায় সাহায্য ছাড়াও তিনি কয়েকটি যুদ্ধে স্বামীর সাথে সক্রিয় অংশগ্রহন করেন। অশ্বারোহন, যুদ্ধাস্র ব্যবহার ও সৈন্যবাহিনী পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতা ছিল।

আদিল শাহ ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলে তার কোন পুএ না থাকায় ৯ বছর বয়স্ক ভ্রাতুষ্পুএ ইব্রাহিল আদিল শাহকে সিংহাসনে বসানো হয় এবং চাঁদবিবি অভিভাবকরূপে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি আহমদনগর রাজ্যের নাবালক সুলতান ভ্রাতুষ্পুএ বুরহান নিজাম শাহের অভিভাবিকা হন। এই সময় মুঘল সম্রাট আকবর আহমদনগর রাজ্য আক্রমনের পরিকল্পনা করেন। চাঁদবিবি আহমদনগর রাজ্যের শাসনভার নিজ হস্তে গ্রহন করেন এবং মুঘলদের আক্রমনের মোকাবিলা করতে প্রস্তুতি নেন। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারী মুঘল বাহিনী শাহজাদা মুরাদের নেতৃত্বে আহমদনগর আক্রমন করে। এ অবস্থায় চাঁদবিবি বর্ম পরিধান করে তরবারি হাতে সৈন্য পরিচালনা করেন, শহরের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে দ্রুত গমন করেন, দুর্গ প্রাচীরে দাড়িয়ে সৈন্যদের উৎসাহিত করেন এবং সৈন্যবাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। মাথার ওড়না উড়িয়ে তিনি সৈন্যদের কামান বসানোর নির্দেশ দেন। রাএিকালেও তিনি সৈন্যদের মধ্যে ঘুরেঘুরে প্রতিরোধব্যবস্তা নিয়ন্ত্রন করেন।

দীর্ঘ ৩ মাস অবরোধের পরও মুঘল বাহিনী আহমদনগর দখলে ব্যর্থ হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মুঘল সেনাপতি শাহাজাদা মুরাদ সন্ধির প্রস্তাব পাঠালে প্রথমে চাঁদবিবি তা প্রত্যাখান করলেও পরে সন্ধি করেন। আহমদনগরবাসী চাদবিবির অসামান্য সাহসিকতা, রণনৈপুণ্য এবং শৌর্য-বীর্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে 'চাঁদসুলতানা' উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে মুঘল বাহিনী আহমদনগর দখলের মানসে পুনরায় বিশাল সৈন্যবহরসহ আক্রমন করলে চাঁদসুলতানা আহমদনগর রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তিনি বিশাল মুঘল সেনাবাহিনী ও আহমদনগরের সীমিত সেনাবাহিনীর কথা চিন্তা করে সুলতান বাহাদুর নিজাম শাহ সহ অমাত্যবর্গকে মুঘল বাহির কাছে আত্বসমর্পনের পরামর্শ দেন। এই সময় খোজা হামিদ খান নামক দুর্গ অফিসার তাঁর কথার প্রতিবাদ করে যুদ্ধ করার প্রত্যয় ঘোষনা করেন। চাঁদ সুলতানা নিজের ও সুলতানসহ দুর্গের নিরাপওার কথা ভেবে সন্ধির চেষ্টা করলে হামিদ খান রাস্তায় বেরিয়ে জনসম্মুখে ঘোষণা করেন যে, চাঁদ সুলতানা আসিরগড় দুর্গ প্রদানের বিনিময়ে মুঘলদের সাথে সন্ধি করেছে। এই কথা শুনে অকৃতজ্ঞ দাক্ষিণাত্যবাসী হামিদ খানের নেতৃত্বে জোরপূর্বক চাঁদ সুলতানার কক্ষে প্রবেশ করে তাঁকে হত্যা করে। তবে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে চাঁদ সুলতানা বিষপানে আত্নহত্যা করেছিলেন।
বীরাঙ্গানা চাঁদ সুলতানা অসীম বীরত্ব, নির্ভীকতা এবং যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে পরাক্রমাশালী মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে আহমদনগরের যে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়েছিলেন তা মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। চাঁদ সুলতানা বুদ্ধিমওা, বীরত্ব, সাহসিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দেশপ্রেম এবং চারিএিক উজ্জলতার মাধ্যমে সকল যুগের নারীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ১১:৩০