somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পথ অন্তহীন

২৬ শে মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১...
"আম্মু, আমি মুক্তিযুদ্ধে যামু!"
নাজমা হাওলাদার হাসেন। ছেলের পাতে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলেন,"ওরে আমার বীর পুরুষ রে,যাবি যাইস ক্ষন। তর আব্বুরে কইয়া যাইস!"
নাফি জানে আব্বুকে কিছুই বলা যাবে না, আব্বু রেগে যাবেন। মাহবুব আলম চৌধুরী চট করে রেগে যাবার বিরল গুণ নিয়ে জন্মেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই মাহবুব আলম চৌধুরী বেশ সাবধানী। সারাক্ষণ নাফিকে চোখে চোখে রাখেন। তাদের একটাই ছেলে।

শম্ভুগঞ্জ বাজার থেকে মিছিলটা ময়মনসিংহ ব্রিজের দিকে যায়। মিছিলটা নাফির বুকে আলোড়ন তোলে খুব।
"বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর",, পরক্ষণেই "জয় বাংলা, জয় বাংলা" স্লোগানে আকাশ-বাতাস তোলপাড়। জয় বাংলা শব্দটায় বিশাল জোর মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
নাফি বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হয়ে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলের সাথে তাল মিলিয়ে স্লোগান দিতে থাকে "জয় বাংলা"।

মিছিলেই দেখা হয়ে যায় ফাহাদের সাথে। ওরা একসাথে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ৭ম শ্রেনিতে পড়ে।
ফাহাদ ওকে দেখে অবাক হয় খুব।
" কিরে নাফি, তুই মিছিলে আইছস! মমিসিং মিলিটারি আইছে জানিস? মিছিলে যহন তহন গুলি চলবে।জানস তো, একবাপের এক পুত, মইরা গেলে বুচ্চুত? তুইতো একবাপের এক ছেলে!"
নাফি কিছুই বলে না। বলেও লাভ নেই। ফাহাদ সব সময় কথার পিঠে কথা রেডি রাখে, ওর সাথে কথায় পারা যায় না।ওর সাহসও বেশি, ও জয় বাংলার সব মিছিলেই যায়।
"ফাহাদ, মুক্তিযুদ্ধে যাবি?"
ফাহাদ কিছু বলে না। তাকিয়ে থাকে নাফির দিকে।

ওরা দুজন একেএকে দিহান, লাবিব আর আবিরের বাসায় যায়। আবিরের বড় বোন খবরদারি করে।ওরা কই যাবে? কেন যাবে? এই খারাপ সময়ে বাইরে যাবার দরকার কি? এইসব।
আবিরের বোনের নাম সুরভী। খুব যে বড় তা না, সে মাত্র অষ্টম শ্রেনিতে পড়ে। সুরভীর চেহারা ছাড়া সবই খারাপ,আল্লাহ তাকে সুন্দর চেহারা দিয়ে বিচ্ছিরি আচরণ দিয়ে দিয়েছেন। সারাক্ষণ ওদের পিছনে লেগেই থাকে।সারাদিন আবিরকে বোঝায়, সে ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্র। তার এইসব ছেলের সাথে মেশা উচিত না।

সুরভীকে দেখলে নাফির মনে হয়, তার যে বড় বোন নাই এটা খুব ভালো। তবে একজন বড় ভাই আছে, হাছান ভাই, নাফিকে অনেক আদর করে। ভাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, ২৫শে মার্চের পর থেকেই ভাইয়ের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না!

২...
পাঁচজনের দলটা জিলা স্কুলের মাঠে পা ছড়িয়ে বসে আছে। এর মাঝেই আবির দুইবার বাড়ি যাবার জন্য তাড়া দিয়েছে, ও বাসায় গিয়ে School Library প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করবে।
লাবিব খিস্তি কাটে,"আল্লাহ হিন্দু জাতটারে বানাইছে ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হবার জন্য।"
দিহান যোগ করে,"আব্বা, বলছে হিন্দুরা ক্লাসে প্রথম হয় কারণ ওরা জানে এই দেশ তাদের না, তাদের ভালো করে পড়াশোনা করে চাকরি পেতে হবে।"
ফাহাদ বলে,"ধুর ব্যাটা, ওরা প্রথম হয় কারণ ওরা পিয়াজ, গরুর মাংস খায়না। এগুলা খেইলেই আইলসামি লাগে, পড়াশোনা অয় না।"

নাফি রেগে যায়, জোরে বলে,"তাইলে তরা কেউ মুক্তিযুদ্ধে যাবি না?"
ফাহাদ বলে,"আমিতো যাবোই, কেউ না গেলেও যাবো। তবে আবির যাবে না, আমি নিশ্চিত। ও মালাউন, মালাউনদের সাহস কম। ওদের নুনুর মাথাতো কাটা হয় না। আমাদের নুনুর মাথা কাটা হয়, সাথে সাথে ভয়ও চলে যায়। তাই আমরা সাহসী!"
আবির অত রাগে না, শান্তভাবে বলে,"দেশটা তোদের তোরা যুদ্ধফুদ্ধ কর। বাবা বলছে, আমরা হিন্দুস্থান চলে যাবো। বন্যেরা বনে সুন্দর, হিন্দুরা হিন্দুস্থানে।"

এই দলের লাবিব সবচেয়ে বড়, গায়েগতরে কিন্তু বুদ্ধিতে না। লম্বা মানুষের বুদ্ধি থাকে হাটুতে, এই কথা লাবিবের বেলায় খাটে।
সে বললো,"আমিও যাবো। তবে দলের নেতা হব আমি। আমার কথা সবাইকে শুনতে হবে।বল, তোরা রাজি?"
দিহান রেগে যায়,বলে,"কেন? সব কিছুতেই তোর মাতাব্বরি করতে হবে?আমি যাবো না মুক্তিযুদ্ধে।"

লাবিব, দিহান, আবির বাসায় ফিরে যায়।

৩...
বাঘা কাদেরের সামনে তিনজন নিতান্তই বালক দাঁড়িয়ে আছে। পা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাঁদা পানিতে হেটে আসছে। তিনজনের চোখ রক্তবর্ণ, ভয়ের লেশমাত্র নেই। এরা নাকি দুইজন পাকিস্তানি সৈন্য আর বংগা রাজাকারকে রড দিয়ে পেট এফোরওফোর করে দিয়েছে। কাদেরের বিশ্বাস হয় না।

"তোমাদের কমান্ডার কে?"
ফাহাদ বলে,"আমাদের কমান্ডার নেই।"
কাদের এই প্রশ্ন অকারণে করলেন। তিনি জানেন,ময়মনসিংহ সদরে এখনো যুদ্ধ চলে কমান্ডার ছাড়া।ছেলেগুলা কমান্ডার পাবে কোথায়?
আবির বলে,"আমরা আপনের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যাবো। মুক্তিযুদ্ধে যাইতে সাহস লাগে, আমার নাই। তবে নাফি, ফাহাদের অনেক সাহস। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মুসলমান হব, তাতে সাহস বাড়ে। তবে বছর বছর দূর্গাপূজা দিব।সমস্যা হবে?"
কাদের হাসেন, বলেন,"বাড়ি যাও। যুদ্ধ পুলাপানের কাম না। বাড়ি গিয়া "মাতা পিতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য" রচনা মুখস্থ কর। অষ্টম শ্রেনি বৃত্তি পরিক্ষায় আসছিল, আমি লিখবার পাই নাই।"
তিনজনে চলে আসে, দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। একই কারণে কমান্ডার নাজিম উদ্দিন তাদের দলে নেইনি।

এনায়েত করিম বলেন,"কমান্ডার সাব, এই তিনডারে ফিরাই দিলেন? তিনডাই বাঘের বাচ্চা। ঘটনা কি হুনেন!
যেই ছেলেটা মুসলমান হইবার চাইল তার বাপরে মিলিটারিরা গুলি করে মেরে ফেলে। ওর বইনরে বংগা রাজাকার আর এক মিলিটারি টাইনা নিয়া যাইতাছে, ওর মারে নিতাছে আরেক মিলিটারি। এই তিন বালক কই থাইকা তিনডা রড জোগাড় করছে। পেছন থেইকা দিছে হেগর পেডের মইদ্দে ঢুকাইয়া। এক তুড়িতে খেল খতম!
মুক্তি খালি মারে রাজাকার, আল বদর! এই তিন বালক শুরুই করছে মিলিটারি মাইরা। কেমুন সাহস দেখছেন!
তারপর যহন মা, বইনরে হালুয়াঘাট দিয়া বর্ডার পার কইরা দিয়া আসে, ঐখান থেইকা ধইরা আনছি।
আর আপনে তাড়াইয়া দিলেন!"

কাদের সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। ওদের খোজে এনায়েত করিমকে যেতে বলেন, তিন বালককে খুজে পাওয়া যায় না।

৪...
নাফি, ফাহাদকে কমান্ডার নাজিম উদ্দিন দলে নেয় নাই। তবে তার ট্রেনিং ক্যাম্পে কিছুদিন কাজ করে এরা দুজন গ্রেনেড, মেশিন গান আর রিভলবার চালানো শিখেছে। শিখেছে নিখুঁতভাবে কিভাবে কারও গলা কেটে দেয়া যায়, লোকটার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হবে না।
ওরা ছয়টা গ্রেনেড, একটা মেশিন গান, তিনটা রিভলভাব চুরি করেছে। নাজিম উদ্দিন মুজিববাহিনীর লোক, উনার অস্ত্র-গোলাবারুদের অভাব নাই। কোন বিশেষ কারণে মুক্তিবাহিনী,কাদেরিয়া বাহিনী, মুজিব বাহিনীর মিলমিশ হয় না। এরা আলাদা আলাদা যুদ্ধ করে।

জুবিলি রোডে বুড়া পীরের মাজারে আজ সিন্নি চড়ানো হয়েছে। একদল দুষ্কৃতিকারী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করেছিল। পাকি কমান্ডার আব্দুল কাদির কিছুটা আহত। তার সুস্থতা আর অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য বিশেষ দোয়া আর সিন্নির ব্যবস্থা করা হয়েছে!
রজব আলী ফকির নিজে তদারকি করছেন। শান্তি কমিটির প্রধান হান্নান আর কমান্ডার আব্দুল কাদিরকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। তারা কথা দিয়েছেন, আসবেন!

রজব আলী ফকির সিন্নিতে পাঁচ ফোড়ন গুরা, ঘি আর জয়ফল দিলেন। সিন্নির মজা এই তিন জিনিসে।একটু বেশি হলেও স্বাদ নষ্ট হয় না।

একটু দূরেই ছোটখাটো বটগাছের নিচে পা ছড়িয়ে বসে আছে নাফি আর ফাহাদ। বয়স কম হবার এই সুবিধা, ওদের কেউ সন্দেহ করে না। আবির গিয়েছে দিহান, আর লাবিবকে আনতে।
আরও লোক দরকার, নাফি আগের বারের মত ভূল করতে চায় না। অবশ্য ভূল বলাও যায় না। কোন কারণে গ্রেনেড ফাটেনি!
ফাটলেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকি ক্যাম্প উড়ে যেত। প্রথমে যেটা ফাটলো সেটা ঠিক জায়গায় পরে নাই। নাফির হাতে বেশ জোর, ও জোর দিয়েই গোলাবারুদ মজুদের ঘরটার দিকে বোমা ছুড়ে ছিল!লাবিব থাকলে ভালো হত। ওর হাতে আরও বেশি জোর।
আজকে আবার সুযোগ পাওয়া গেছে কমান্ডার আব্দুল কাদিরকে মারার, সাথে আরও থাকবে এম এ হান্নান। এই লোকের কাজ হচ্ছে পাকি সেনাদের পথ চিনিয়ে দেয়া, মেয়েদের ধরে আনা, জোয়ান ছেলেদের হত্যা করা! কমান্ডারের সাথে তার বিরাট দহরমমহরম।

আবির ফিরে আসে না। ওরা চিন্তিত হয়। ধরা পরে যায় নাই তো? পরতেও পারে, তবে না পড়ার সম্ভাবনা বেশি। মিলিটারি বা রাজাকার কেউই বাচ্চাদের কিছুই বলে না।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণের পর যখন ওরা দৌড়ে পাল্লাচ্ছিল, এক মিলিটারির সামনে পরে গেল। মিলিটারি নাফিকে একটা চড় দিয়ে বললো," বাচ্চেলোগ, বাহার মাত ঘুরো। ঘারমে বেইঠে রাহো।যাও জোরসে দোরো। পিছে দেখনা মাত।"
নাফি মনে মনে হাসে,"শালা, গাধা কোথাকার!"
আবির দৌড়াতে দৌড়াতে বলে,"পাকিরা তো ভাত খায় না, এইজন্য বুদ্ধি কম।"

৫...
ওরা একেবারে শেষ বিকেলে আসে। লাবিব ফট ফট করতে থাকে, কিভাবে রিভলবার, মেশিনগান, গ্রেনেড, স্টেনগান চালাতে হয় এইসব নিয়ে!
দিহান কোন কথা বলে না।ওর কাছে একটা স্টেনগান, কিভাবে কোথায় পেল? কিছুই বলে না। ও এমনই, কিছু বলতে না চাইলে গুলি করেও কথা বলানো যাবে না। বলতে চাইলে নিজেই বলবে।
গ্রেনেড, রিভলবার,স্টেনগান দেখে লাবিব চুপ করে যায়, ও এসব প্রথম দেখলো!

নাফি দিহানকে জিজ্ঞেস করে,"কিরে স্টেনগান চালাতে জানিস?"
ও মাথা নাড়ে, পারে।
"কোথায় শিখেছিস।"
ও উত্তর দেয় না।
"কথা বল, কোথায় চালাতে শিখেছিস?এটা পেলিই বা কোথায়?কথা বল, কথা বলিস না কেন?"
দিহান চুপ করেই থাকে।

নাফি সিদ্ধান্ত নেয়, ও যাবে বুড়া পীরের মাজারে। ফাহাদ, দিহান বেঁকে বসে ওরা যেতে চায়।
নাফি বলে,"ফাহাদ, তুই এদের সাথে থাক। ব্যাক-আপ দরকার আছে। আর লাবিব, দিহান তোরা নতুন। তোদের ওখানে পাঠানো মানে ভূল, বিরাট ভূল। পরের অপারেশনে যাবি।"
ওরা আপত্তি করে না। বিপদের দিনে এই বালকগুলোকে হুট করে বড় হয়ে গেছে!

নাফি গায়ে ২টা গ্রেনেড বেধে নেয়, হাফপ্যান্টে গুজে নেয় একটা রিভলবার। গায়ে চাদর জড়িয়ে এগিয়ে যায় জুবিলী রোডের দিকে।যাবার আগে আরেকবার প্ল্যান বুঝিয়ে দেয়।
নাফির গায়ে হালকা জ্বর, চোখ লাল।এই রোগের নাম জয় বাংলা রোগ। এই রোগ ৭ দিনের বেশি থাকে না। ফাহাদ, আবিরের জয় বাংলা রোগ সেরে গেছে, ওরটা সারছে না।সারছে না কেন?

৬...
"আসসালামু আলাইকুম, ভেতরে যামু। ফকির সাবের কাছে পানিপড়া নিমু। আমার জয় বাংলা রোগ অইছে।"
নিতান্তই বালক, কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কোন আপত্তি করে না।

রজব আলী ফকির খালি গায়ে বিছানায় শুয়ে আছেন।
"আসসালামু আলাইকুম, ফকির সাব আপনের জন্য হাদিয়া আনছি।"
ফকির সাব উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকেন। কপাল কাটা এই নিতান্ত বালক ছেলে কি হাদিয়া নিয়ে আসবে? এই ছেলের জয় বাংলা রোগ, প্রতিদিন শয়ে শয়ে লোক আসে জয় বাংলা রোগের পানি পড়ার জন্য আসে। কেউ হাদিয়া দেয় না!

নাফি চাদর সরিয়ে গ্রেনেড দেখায়, রিভলবার হাতে নিয়ে বলে,"আমার নাম নাফিউজ্জামান চৌধুরী নাফি, আমি চর কালি বাড়ী চৌধুরী বাড়ির ছেলে। তবে এই নামে আমারে চিনবেন না। আমার আরেকটা নাম আছে "গাল কাটা বিচ্ছু"।
আমার দল আপনের মাজার ঘিরে রাখছে, সবার গায়ে ৫টা করে গ্রেনেড। আপনের জন্য তিনটা আনছি, আপনেরে মারার জন্য এইগুলাই বেশি।"

ফকির সাবের গলা শুকিয়ে যায়। চিৎকার দিতে পারে না, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। এই ছেলে গাল কাটা বিচ্ছু! এই ছেলে ফুলপুরের রাজাকার আবুল চেয়ারম্যান আর এক মিলিটারির গলা এক পোছে নামিয়ে দিয়েছিল! অবশ্য আবুল চেয়ারম্যান, আর মিলিটারি তহন মাইয়া নিয়া ফষ্টিনষ্টি করছিল। অন্য দিকে খেয়াল নাই!
নৌমহল বংগা রাজাকার আর দুই মিলিটারির পেটে রড ঢুকিয়ে দিয়েছিল! তিনটা জোয়ান মানুষ কাতরাইতে কাতরাইতে মইরা গেল। অন্য মিলিটারি আসতে আসতে এরা উধাও।
এরাই নাকি আবার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিটারি ক্যাম্পে বোমা মেরে ছিল। এই ছোট বালকের এত সাহস? অবশ্য বাঙালী আর কিছু থাক বা না থাক, সাহস আছে বিরাট সাহস!
কপালে কাটা দাগ, ফরশা মুখ, মুখে সদ্য কৈশোরের ছাপ স্পষ্ট, মায়াবী চেহারার এই ছেলে বলছে কি!
মৃত্যু ভয়ে মানুষ আজব প্রশ্ন করে, তিনি ব্যতিক্রম নন।

"বাবাজী, তোমারতো গাল কাটা না। কপালে কাটা, তয় গাল কাটা নাম নিলা কেন?"
"আপনে চিন্তা করে বের করেন।আপনি ফকির মানুষ, স্বপ্নে ফেরেশতারা আপনেরে কত কিছু বলে,কত অষুধ দেয়! তাদের কাছে জেনে নিবেন। আল্লাহকেও জিজ্ঞেস করতে পারবেন, আল্লা খোদার সাথেতো আপনার তাড়াতাড়ি দেখা হবে, দোজখে যাবার আগে জেনে নিবেন।"
"বাবাজী, পিসাব করবো।"
"এইখানে করেন।"
"বাবাজী, জায়গা নোংরা হবে। দূর্গন্ধ হবে।আমি টাট্টিখানায়ও যাবো।"
"আপনি আমাকে কমান্ডার আব্দুল কাদির,রাজাকার হান্নানকে মারায় সাহায্য করবেন। এর আগে কোথাও যাবেন না।"
"বাপধন, কমান্ডারের লগে কালা মিলিটারি থাহে। এরা সাক্ষাৎ আজরাইল।"
"আমিও আজরাইল।"
রজব আলী ফকির কাঁদতে থাকে।
"বাবাগো দয়া কর, তোমার কি দয়ামায় নাই? আমারে ছাইড়া দেও আমি জয় বাংলার লোক হইয়া যামু।"
"দয়া মায়া ব্রহ্মপুত্রে ভাসাইয়া দিছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হইলে আবার ফেরত আনবো।"

পাশের ঘর থেকে রিনরিনে গলায় কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়।
নাফি প্রশ্ন করে,"এখানে আপনার মেয়েকে আনেন নাই?"
রজব আলী ফকির চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে।
"ভুল করেছেন, কাউকে উপহার দিলে নিজের জিনিস দিতে হয়। আর আপনার মেয়ে আছতো, তাদেরকে মিলিটারিদের উপহার দিবেন।"

৭...
মাগরিবের আযানের সময় মিলিটারির ট্রলার ভট ভট শব্দে জুবিলি ঘাটের দিকে আসে। ট্রলার মাঝ ব্রহ্মপুত্রে থাকা অবস্থায় কমান্ডার আব্দুল কাদির, আর রাজাকার হান্নান পাটাতনে উঠে আসে।

ঢোলকলমি ঝোপের আড়াল থেকে দিহান স্টেনগান তাক করে গুলি করবে কি! এর আগেই ফাহাদ গ্রেনেড ছুড়ে। ওর নিশানা অব্যর্থ। মুহুর্তে ট্রলারে আগুন ধরে যায়। কালো মিলিটারি, কমান্ডার আব্দুল কাদির কেউ পানিতে ঝাপ দেয় না। এরা সাঁতার জানে না।
হান্নান পানিতে ঝাপিয়ে পরে, জীবন বাঁচায়।

পাকি মিলিটারি গুলি ছোড়ার সময়ও পায় না। ট্রলারে রাখা গোলাবারুদ দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে।মিলিটারি মারা জন্য এই যথেষ্ট, তবুও লাবিব ওর হাতের রিভলবারে ট্রলারের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। দিহান ওকে থামায়,"আরে, গুলি নষ্ট করিস না। আমাদের গুলি দরকার, অনেক অনেক গুলি!"

বোমা ফাটার শব্দে রজব আলী ফকির প্রস্রাব করে দেয়। নদে দাউদাউ করে জ্বলা আগুনের লাল আভা বুড়া পীরের দরগা আলোকিত করে ফেলে।
নাফি চাদর জড়িয়ে উঠতে যাবে তখনি ফকির তার পা জড়িয়ে ধরে, বলে,"বাবাগো,কই যান? আমারে গুলি কইরা যান।আমারেতো পাকি মিলিটারি ছাড়বো না!"
নাফি শান্তভাবে পা ছাড়িয়ে বলে,"আমি মশা মাইরা হাত কালা করি না। এই কাজ করে আরাম পায় পাকি মিলিটারি, আপনেরে তাগর জন্যে রাইখা গেলাম। আমি মারবো মিলিটারি, আপনেরে মারা গুলি নষ্ট করা ছাড়া আরকি?"

লালচে আলোয় পাঁচ জন বালক দৌড়ে পালায়। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আলোয় ওদের পথ চলতে সুবিধা হয়।
লাবিব নাফিকে বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকে,"কিরে নাফি, তোর তো গাল কাটা না, কপাল কাটা! তুই গাল কাটা বিচ্ছু নাম নিলি কেন?"
নাফি উত্তর দেয় না। সবাই হাসতে হাসতে থাকে।
দিহান বলতে থাকে,"জানিস, আমার বাবাকে মিলিটারি মেরে ফেলেছে। বাসা থেকে চুল ধরে টেনে বের করে বুকে এক ঝাক গুলি করেছে। তোরা মন খারাপ করিস না, দেখ আমিও কষ্ট পাচ্ছি না। আমি তোদের সাথে আসছি শহীদ হতে।আফসোস! আজকে শহীদ হতে পারলাম না।"

নাফি, আবির, লাবিব, ফাহাদের হাসি দপ করে নিভে যায়। এরা দৌড়ানো থামায় না। স্বাধীনতার জন্য কত দিন দৌড়াতে হবে, কে জানে?
সারাজীবন দৌড়াতে হলেও এরা দৌড়াবে!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১৬
৬টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুসলিম এলাকাগুলোতে ধর্মীয় গুজব কেন বেশী?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৮ শে মে, ২০২০ সকাল ১০:৩৯



মুল কারণ, অশিক্ষা ও নীচুমানের শিক্ষা, মিথ্যা বলার প্রবনতা, এনালাইটিক ক্ষমতার অভাব, ধর্মপ্রচারকদের অতি উৎসাহ, লজিক্যাল ভাবনার অভাব। মুসলমানেরা একটা বিষয়ে খুবই দুর্বল, অন্য কোন ধর্মাবলম্বীর ইসলাম গ্রহন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাদিসের অসাধারণ একটি শিক্ষা

লিখেছেন মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, ২৮ শে মে, ২০২০ দুপুর ১২:১৪

এক মহিলা সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, আমি জিনা (ব্যভিচার) করেছি। জিনার কারণে গর্ভবর্তী হয়েছি।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি চলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্রাত্য রাইসুঃ এই সময়ের সেরা চিন্তাবিদের একজন

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৮ শে মে, ২০২০ দুপুর ১২:৪১

ব্রাত্য রাইসুকে আমি কখনো সরাসরি দেখি নাই বা কোন মাধ্যমে কথাও হয় নাই কিন্তু দীর্ঘদিন অনলাইনে থাকার কারনে কোন বা কোনভাবে তার লেখা বা চিন্তা গুলো আমার কাছে আসে এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশের সাধারন মানুষ লকডাউন খুলে দেওয়া নিয়ে যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে মে, ২০২০ দুপুর ২:৫৫



১। সবই যখন খুলে দিচ্ছেন তো সীমিত আকারে বেড়ানোর জায়গাগুলোও খুলে দেন। মরতেই যখন হবেই, ঘরে দম আটকে মরি কেন? টাকাপয়সা এখনো যা আছে তা খরচ করেই মরি। কবরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হুমায়ূন ফরীদি স্মরণে জন্মদিনের একদিন আগে !!!!

লিখেছেন সেলিম আনোয়ার, ২৮ শে মে, ২০২০ রাত ১০:০১

ঘটনাটি এমন। প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন বসে আছেন। পাশের চেয়ারটি ফাঁকা। ফাঁকা চেয়ার পেয়ে আমি যখন বসতে গেলাম। পরিচালক খোকন ঘাবড়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে বললেন ওটা ফরীদি ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×