somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

"স্বার্থপর"

০৮ ই জুন, ২০১৪ রাত ৮:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এক.
"ভাই ভাল আছেন?"
আমি একটু চমকে উঠলাম। আমি সচারচর চমকাই না, চমকাবার মত জিনিষ হলেও না। হঠাত্‍ মাঝরাতে যদি দেখি, এগার বছর আগে স্বর্গে চলে যাওয়া বাবা আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন তাও চমকাই না। আমি জানি এটা হ্যালুসিনেশন। বাবাকে একটু বেশি ভালবাসি তো তাই বাবাকে দেখি।

তবে আজ চমকালাম, ধ্যান ভেঙ্গে যাওয়াতে চমকালাম। আমার চমকাবার দুটো কারন আছে,
এক. হঠাত্‍ ধ্যান ভেঙে যাওয়াতে!
দুই. রফিককে দেখাতে!
রফিক বেশি একটা কারো সাথে কথা বলেনা। আমার ঘরেও কখন আসেনি। তবে মাঝে মাঝে কথা হত। কিন্তু হঠাত্‍ আজ ঘরে এসেছে।
-হ্যা রফিক, ভাল আছি। তা তোমার কি অবস্থা?
-কেমন আর হবে ভাই? একজন বেকার যুবকের দিন কেমন আর কাটবে!
-তা হঠাত্‍ কি মনে করে?
-না ভাই, এমনিতেই আসলাম।
-হুম বুঝলাম, কিন্তু তুমি তো এমনি আসার ছেলে না!

রফিক মুচকি হাসে, তার এই হাসিটা অনেক রহস্যময়। এত সুন্দর চেহারার একটি ছেলের যদি এত সুন্দর হাসি থাকে তবে তাকে বেশি সুন্দর লাগে। আমি বলি "অদ্ভুত সুন্দর"। রফিকের হাসিটা অদ্ভুতই। সে যখন হাসে, মন থেকে হাসে। হাসপাতালের নার্সদের কাছ থেকে ধার করা হাসি নয়। তারা কারনে-অকারনে হাসে। তাতে শুধু তাদের ঠোট হাসে। কিন্তু রফিকের শুধু ঠোট হাসে না, চোঁখ জোড়াও হাসে। সবাই এরকম হাসতে পারেনা। সবাইকে বিধাতা এ ক্ষমতা দেয় না।
-না ভাই কারন তেমন কিছু না।
-বল কোন সমস্যা নাই।
-এইতো ভাই কতদিন যাবত্‍ বেকার পড়ে আছি।
-তা কি, চাকরি লাগবে?
-চাকরি তো খুজতেছি! কিন্তু চাকরি কি এত সহজ ব্যাপার?
-বুঝেছি, তা এখন কত টাকা লাগবে?
রফিক বোধহয় লজ্জা পেয়েছে। তাই সে মাথা নিচু করে আছে। আমি মানিব্যাগ থেকে পাঁচশ টাকার টাকার দুটি নোট বের করে রফিকের হাতে দিলাম। "সমস্যা নেই লজ্জা পেয় না। গত একবছর আগে আমিও বেকার ছিলাম। বেকারদের অবস্থা আমি জানি। হা হা হা।"
রফিক লজ্জার সাথেই টাকাটা নিল। সে কোন কথা বলছে না। এই এক ধরনের মানুষ আছে, যারা লাজ্জা পেলে কথা বলে না। পুরুষদের এই সমস্যা থাকা উচিত্‍ না। এটা মেয়েলি সমস্যা। মেয়েরা লজ্জা পেলে কথা বলে না। একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। রফিক ও এখন দুমড়ে-মুচড়ে আছে।
"ভাই উঠি" বলে রফিক আসতে করে উঠে চলে গেল। আমার কোন কথা বলার অপেক্ষা না করেই।

দুই.
রফিককে আজকাল খুব হাসি খুশি লাগে। এখন ম্যাচের সবার সাথে কথা বলে। একটা মানুষ যে এত তারাতারি বদলে যেতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। যে ছেলেটা একেবারে নিরব ছিল, কারো সাথে কথা বলত না কারো রুমেও যেত না আর আজ তার জ্বালায় সবাই অতিষ্ট। তবে আমরা এই জ্বালাতন টা উপভোগ করি। খুব মজা করেই উপভোগ করি। এর অন্যতম কারন হল, রফিকের সুন্দর করে কথা বলতে পারার ক্ষমতা। যে কোন মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা তার আছে। এরকম একটি ছেলের চাকরির বাজারে খুব দাম। কিন্তু আমি জানিনা, রফিকের চাকরিটা কেন হচ্ছেনা! হচ্ছেনা বললে ভুল। সে একটি না অনেকগুলো চাকরি করে, অনেকগুলো টিউশনি! খুব সকাল সকাল সে ঘুম থেকে উঠে টিউশনিতে চলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠা নাই স্বাস্থ্যকর।

মাঝখানে কয়েকদিন তার মন খারাপ ছিল।কারন জিজ্ঞেস করে পাওয়া গেল, তার মেঝ ভাই "স্বার্থপর" হয়ে গেছে। আগে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাত তার জন্য কিন্তু এখন আর পাঠাবে না।
সোজা বলে দিয়েছে,"তোকে আর কত টানব? চাকরি করতে পারলে করবি, আর না পারলে চুরি কর।" একথা শুনেই রফিকের মন খারাপ। তার মন খারাপ হলে, পুরো ম্যাচের ই মন খারাপ। কারন রফিকের মন খারাপ হলে কেউ বানিয়ে বানিয়ে জোকস কিংবা গল্প বলেনা।

কয়েকদিনের মধ্যেই রফিকের মন ভাল হয়ে উঠল। এ ভাল হওয়ার একটা কারন আছে। রফিক প্রেমে পরেছে। যার তার প্রেমে নয়, একটা ডানা কাটা পরীর প্রেমে। মেয়েটার নাম ঐশি। কোন এক ছাত্রের বড় বোন। মেয়েটাও নাকি সাড়া দিতে শুরু করেছে। ঐশির চুলগুলো খুব লম্বা আর কুচকুচে কালো। কালো ড্রেসে তাকে চমত্‍কার লাগে। ঢাকার শহরে এরকম মেয়ে হাজারে না লাখে একটা পাওয়া যায় কিনা সন্ধেহ! তার নাকের বাম পাশে একটা ছোট্ট তিল আছে। তিলের কারনে তাকে আরো রুপকথার রাজকন্যাদের মত লাগে। তার গল্পগুলো আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠে। রফিকের বলার ক্ষমতা অসাধারন আর আমাদের শোনার।

তিন.
একদিন রাতের কথা। আমার ঘুম আসছিল না বলে সিগারেটের প্যাকেট আর ম্যাচটা নিয়ে ছাদে উঠলাম। মাঝে মাঝে আমার এরকম হয়। সারারাত ঘুম আসে না। তখন আমি ছাদে চলে যাই, বসে বসে সিগারেটের বারটা বাজাই।
ছাদের এক কোনে দাড়িয়ে যেই সিগারেট ধরাতে যাব, মনে হল কে যেন কাঁদছে। "মা তুই এত স্বার্থপর ক্যান? আমারে রাইখা চইলা গেলি ক্যান?" কন্ঠ শুনেই বুঝতে পারলাম এটা রফিক। আমি চলে আসলাম। কিছু কান্না থামাতে নেই, এতে যদিও মনের কষ্ট কমেনা তবে হালকা হয়। রফিকের মা মারা গেছে আজ তিনদিন আজ চারদিন হল।
মানুষ মারা যাবে, এটা স্বাভাবিক, এটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু কেউই মানতে পারেনা, আমিও না।

রফিক আজকাল খুব বেশি টাকা ধার চায়। যদিও সময় মত দিয়ে দেয়। কিন্তু রফিককে মাথায় ওঠানো যাবেনা। মাথায় ওঠালে সমস্যা, তখন আবার ঘার মটকে দিতে পারে। ওকে আর টাকা ধার দেয়া যাবেনা। আর দিলেও পাঁচশ টাকার বেশি না। বলা তো যায় না, মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব আবার নিকৃষ্ট জীব।

এর মধ্যে ঐশি নামের মেয়েটা নাকি একবার আমাদের ম্যাচে এসেছিল। রফিকের সাথে কথা কাটাকাটি করে আবার চলে গেছে। আমি ছিলাম না। তবে মেয়েটা নাকি ভয়ংকর সুন্দরি। হাজারে না লাখেও একটা পাওয়া যাবেনা।

রফিকের সাথে অনেকদিন কথা হয় না। সারাদিন যেন কার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে। একে কথা বলা যায় না, ঝগড়া। কে জানে হয়ত ঐশি নামের মেয়েটির সাথেই। হোক ঝগড়া, তাতে আমার কি? এই শহরে ঝগড়া দেখার লোকের অভাব নেই, তবে মোবাইল ফোনে ঝগড়া করলে কেউ ফিরেও তাকায় না।

সকালে ঘুম ভাংল চেচামেচির শব্দে। বিরক্ত নিয়ে বাইরে এসে দেখলাম, রফিকের ঘরের সামনে লোকজন জটলা পাকিয়ে আছে। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আমি রফিক কে দেখে দ্বিতীয়বারের মত চমকে গেলাম। যদিও চমাকাবার কথা না।
রফিক মরে গেছে! সুন্দর মোটা একটা দড়িতে রফিকের লাশ ঝুলে আছে।
রফিক মরার আগে একটা সাদা খাতার পৃষ্ঠায় বড় করে লিখে গেছে,"মানুষ এত স্বার্থপর কেন? সবাই স্বার্থপর সবাই"।

রফিকের লাশ পুলিশ নিয়ে যায়, তাকে নিয়ে কিছুদিন হইচই হয়। আস্তে আস্তে সবাই ভুলে যায়। অনেকের হয়ত মনেও নেই। আমিও একদিন ভুলে যাব। কাউকে মনে রাখার কোন মানেই হয়না। বাস্তব জগতে সবাই স্বার্থপর।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×