somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আধুনিক বর্ণপ্রথা বা শ্রেণি বৈষম্যে বর্তমান সাহিত্য আঙিনা

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১০:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একজনকে ব্লগে সাহিত্য চর্চার পরামর্শ দিয়েছিলাম, সে এমন ভাব করেছিল যেন ব্লগে লেখে নিকৃষ্ট অস্পৃশ্য নমশূদ্র কিংবা মুসলমান শ্রেণির লেখক আর পত্রিকার সাহিত্যপাতায় লেখে উৎকৃষ্ট বিশুদ্ধ কুলীন ব্রা‏‏‏‏হ্মণ গোত্রের লেখকরা; কুলিন ব্রা‏হ্মণদের লেখা বনেদী অথবা ভুঁইফোঁড় পত্রিকার সাহিত্যমন্দিরেই মানায়, ব্লগের মতো আস্তাকুঁড়ে কখনও নয়! যদিও তার কয়েকটি লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে সে নিজেকে কুলীন ব্রা‏হ্মণ ভাবলেও তার এখনো পৈতা-ই হয়নি!

এবার অস্পৃশ্য নমশূদ্র আর মুসলমান সম্পর্কে নিজের জীবনের সরাসরি অভিজ্ঞতার কথা বলি। যদিও এসব পুরনো কথা, কেবল অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকম, তবু বলি। নমশূদ্র আর মুসলমান যে নিচু স্তরের মানুষ এবং তাদের গমনাগমনের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আছে সেটা আমি জেনেছিলাম ছয় বছর বয়সে, যখন আমার বাবা বদলি হয়ে ঠাঁকুরগাও থেকে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দী থানায় এলেন আর আমরাও গ্রামে নিজেদের বাড়িতে ফিরে এলাম। এর আগে জাতপাত কি আমি বুঝতাম-ই না! আমার জন্ম রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে মুসলমান ডাক্তার-নার্সদের হাতে, আবার জন্মের পর আমাকে শহরের সজ্জনকান্দার যে বাড়িতে নিয়ে তোলা হলো সেটাও মুসলমানের বাড়ি। একই জেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ি থাকলেও দূরত্বের কারণে বাবা-মা তখন শহরেই ভাড়া থাকতেন। জন্মের চারদিনের মাথায় গ্রাম থেকে ঠাকুমা আমার চার বছর বয়সী দিদিকে নিয়ে এসেছিলেন আমাকে দেখতে। মায়ের কোলে আমাকে দেখেই দিদির চক্ষু চড়কগাছ! বলেছিল, ‘উডা কী?’

বাড়িওয়ালী চেলি ভুটকি (অত্যাধিক মোটার কারণে তাকে এই নামেই ডাকতো সবাই) বলেছিলেন, ‘শিয়ালের বাচ্চা, তোমার মায়ের পেটে একটা শিয়ালের বাচ্চা হইছে।’

কান্না আর মন খারাপের পর্ব চুকার পর দিদি নাকি তক্কে তক্কে ছিল কখন শিয়ালের বাচ্চাটাকে ফেলে দেবে! তারপর একদিন ঘর ফাঁকা পেয়ে আমাকে বিছানা থেকে মেঝেতে নামিয়েছে, দুই ঠ্যাং ধরে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে টেনে বারান্দায় নিয়ে গেছে ছুড়ে ফেলে দেবার জন্য, শিয়ালের বাচ্চা সে কোনোভাবে-ই ঘরে রাখবে না! যখন একেবারে বারান্দার কোনার দিকে নিয়ে গেছে তখনই নাকি চেলি ভুটকির নজরে পড়ে আর তিনি দৌড়ে এসে আমাকে রক্ষা করেন। আমি রক্ষা পাই একজন মুসলমান নারীর জন্য। নয়দিনের মাথায় আমি ম’রে গেছি ভেবে বারান্দায় নামিয়ে রাখা হয়েছিল, নিউমোনিয়া হয়েছিল আমার। একদিকে যখন কান্নাকাটি চলছে তখন-ই আমার দিদিমা কি মনে করে একটা পেঁপের নল কেটে এনে আমার মুখে ঢুকিয়ে ফুঁ দিতে থাকেন এবং একসময় নাকি আমি ক্যাঁক করে কেঁদে উঠে নিশ্বাস নিতে থাকি। এ যাত্রায় আমি রক্ষা পাই একজন ভয়ানক রকম ধর্মবাতিকগ্রস্ত হিন্দু নারীর উপস্থিত বুদ্ধির কারণে অই মুসলমান বাড়িওয়ালীর বাড়িতেই!

দিনের বেশিরভাগ সময়ই আমার কাটতো চেলি ভুটকি আর তার ছেলে-মেয়েদের কোলে চড়ে। আমি কাঁদলে চেলি ভুটকি নাকি সইতে পারতেন না, মাকে বকে আমাকে কোলের মধ্যে ফেলে রান্না করতেন, কাঁখে নিয়ে সংসারের নানা কাজকর্ম করতেন। তার ছেলে-মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে নাকি আমাকে কোলে নেবার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করতো।

এরপর থেকে যখন যেখানে আমরা থেকেছি মুসলমানের সাহচার্য পেয়েছি, তাদের কোলে-কাঁধে চড়ে বেড়ে উঠেছি। কিন্তু যখন গ্রামে ফিরে এলাম তখন দেখলাম মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয় না, নমশূদ্রদের রান্নঘরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। যদিবা ভুল করে তারা কোন গৃহস্থের ঘরে ঢুকে পড়ে তো তাদেরকে সাতকথা শুনিয়ে ঘরের কালি-ঝুলি ভাঙা হয়, রান্নাঘরের মাটির হাঁড়ি-পাতিল আদাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আর যতোদিন হাঁড়ি-পাতিল ফেলা হয় না, ততোদিন সেই বাড়ির ভাত কিংবা ঝোল-তরকারি অন্যবাড়ির মানুষ তাদের ঘরে তোলে না। পেটে অবশ্য তোলে!

বারোমাস-ই আমাদের একজন বাঁধা কাজের লোক থাকতো বছর চুক্তিতে। কালাম, সেকেন্দার, ইদ্রিস ভাই, রফিক, বাবলু ভাই। ওরা সবে বরাত আর রমজানের ঈদে আমাদের দাওয়াত দিতো আর আমরাও যেতাম। মা আর আমরা দু’ভাই-বোন ভ্যানে, বাবা আমাদের পিছন পিছন সাইকেলে চেপে। খেয়ে-দেয়ে বেশ রাতে আমরা ফিরতাম। আর এদিকে পাড়া-পড়শিদের কাছে আমরা হতাম জাবর কাটার উপাদান। আমাদের কোন ‘ঘিন্না-পিত্তি’ নাই, ‘নাড়ে’র বাড়ি খাই ইত্যাদি আলোচনা হতো, কেউ কেউ মুখের ওপর বলেও দিতো, টিটকারী করতো! এই কাজটি যারা করতো তারা সবাই কিন্তু অশিক্ষিত ছিল না, শিক্ষিত আর শিক্ষকও ছিল। এই প্রথম নয়, শবে বরাতের রুটি-হালুয়া আর মাংসের সাথে আমরা শহরে থাকতেই পরিচিত, সুতরাং পাড়া-পড়শির কথায় আমরা কান দিতাম না। নব্বই দশকের গোড়ার এই সময়টাতে আমাদের গ্রামে কোন মুসলমান ছিলনা, এক-দু কিলোমিটার দূর থেকে পায়ে হেঁটে কাজ করতে আসতো নিন্মবিত্ত মুসলমানরা।

আমি সৌভাগ্যবান যে আমার বাবা-মা স্বাভাবিক ধর্ম-কর্ম পালন করলেও অই রকম ধর্মবাতিকগ্রস্ত ছিলেন না। আমি আর কালাম একই বয়সের ছিলাম, মা কয়েকদিন পরপর-ই পুকুরে নিয়ে আমার আর কালামের গা ড’লে দিতেন। পরের দিকে দেখেছি ঘরের মাচায় উঠে ধান পেড়ে দিতো ওরা। আমি আর আমার নমশূদ্র বন্ধু পাশাপাশি রান্নাঘরে বসে ভাত খেয়েছি, রাতে একসাথে ঘুমিয়েছে। আমার আর দিদির মুসলমান বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে এসেছে, ঘরে বসেছে। বাবার অফিসের লোকজন, বন্ধু-বান্ধব এসেছেন। তাদেরকে আপ্যায়ন করা হতো থাকার ঘরে, রান্নাঘরে কখনো নেওয়া হতো না। মাকে বলতাম, ‘মুসলমানদের থাকার ঘরে ঢুকতে দাও কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকতে দাও না কেন?’
মা বলতেন, ‘সমাজে বাস। সমাজের মানুষ নিয়ে বাস, আমরা ঢুকতে দিলে আমাদের রান্নাঘরের কোন জিনিস (তেল, লবন, হলুদ, কখনো ভাত-তরকারি। বাড়ন্ত হলে এসব আদান-প্রদান চলতো) কেউ নেবে না।’

এটা অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতাব্দীর কথা নয়, বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের কথা বলছি। অবস্থার আজও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
এই ধরনের পরিবার থেকে যারা উঠে আসে, বিশ্ববিদ্যায়ের সর্বোচ্চ শিক্ষা নিয়েও তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই কোন পরিবর্তন হয় না। এই শতাব্দীর প্রথম দশকের কথা, আমি গ্রামে গিয়ে কোন অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবি পরলে সেটাও যে সমালোচনার বিষয় হতো তা আমি জেনেছি আমার ঢাকার এক বন্ধুর কাছ থেকে। আমার বন্ধুটি শান্তিবাগের বাসায় এসে আমাকে না পেলে পাশের বাসায় আমার গ্রামের এক বন্ধুর কাছে আমার জন্য অপেক্ষা করতো। তখন আমার গ্রামের প্রবল মুসলমান বিদ্বেষী এবং দেশবিরোধী (বাংলাদেশ-ভারত খেলা হলে সে ভারতকে সমর্থন করতো, আজো করে।) বন্ধুটি শহরের বন্ধুকে বলতো, ‘জানিস ও শেখের ব্যাটাদের মতো গ্রামে গিয়ে পাঞ্জাবি পরে। মানুষ তো ওকে নিয়ে হাসে! আরে বাবা তুই কি শেখের ব্যাটা যে তুই পাঞ্জাবি পরবি? আমি তো শুনছি ও গুরু খায়, তুই জানিস নাকি কিছু? হিন্দু সমাজের কুলাঙ্গার একটা!’

আমি ওকে কি করে বোঝাব যে, আমি হিন্দু ধর্ম রক্ষার মহান দায়িত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসিনি। একটা বয়সের পর আমি উপলব্ধি করেছি, আমার জন্ম হয়েছে প্রথাগত ধর্মবিশ্বাসের বাইরে বসে সাহিত্য সৃষ্টির জন্য।

হায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বন্ধু (!) আমার! হায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট, চাকরি ছাড়া তুমি আর কিছুই দিতে পারলে না!

আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। তখন আমি প্রথম ঢাকায় এসে মেসে উঠেছি। মেসটির দায়িত্বে একজন ব্রা‏হ্মণপুত্র। মেসে তখন একটা সিট খালি। একদিন সাদা চুলের চিকন এক লোক দরজায় নক করলে আমি দরজা খুলে দিই, লোকটা মেস দেখতে এসেছে, তার এক আত্মীয় থাকবে। ঘরে এসে বসার পর আমার নাম জিজ্ঞাসা করলে আমি শুধু নামটি বললাম।
সে বললো, ‘তুমি তো ব্রা‏হ্মণ, না?’
আমি বললাম, ‘না।’
‘তুমি ব্রা‏‏‏‏‏হ্মণ না!’

লোকটা যেন আঁৎকে উঠলো! আমার আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি মাত্র টাট্টিখানা থেকে উঠে এসেছি, আমার সারা গায়ে গু, পোকা থিক থিক করছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে!
‘অমুক যে বললো, ব্রা‏হ্মণ!’
ততক্ষণে এই লোকটাকেই আমার গু-পোকা বোধ হচ্ছে, রুঢ়ভাবে বললাম, ‘যে বলেছে সে ব্রা‏হ্মণ, আর আমরা বাকি সবাই অব্রা‏‏হ্মণ।’
‘না, তাইলে তো আমার ভাগ্নেকে রাখা যাবে না। আমি ব্রা‏হ্মণ মেস খুঁজছি!’
সে বেরিয়ে গেল, আমিও স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে শব্দ করে দরজা লাগালাম।

অবস্থাটা একবার বুঝুন, এই একবিংশ শতাব্দীতে ঢাকা শহরে আদর্শ ব্রা‏হ্মণ মেস খুঁজছে!

যাইহোক, এই যে পুরনো বর্ণপ্রথা বা শ্রেণি বৈষম্য এটা আধুনিক মোড়কে ঢুকে পড়েছে আমাদের সাহিত্য আঙিনাসহ আরো নানা মাধ্যমে নানাভাবে। তবে আমরা শুধু সাহিত্য আঙিনার বর্ণপ্রথা নিয়েই আলোচনা করবো। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা এবং টেলিভিশনের টক শো’র কল্যাণে তথাকথিত খ্যাতি পাওয়া এবং ইদানিং ফেসবুকের কল্যাণে হঠাৎ খ্যাতিমান বনে যাওয়া অনেক লেখকই ব্লগের লেখকদের এইরকম নিচু শ্রেণির অস্পৃশ্য নমশূদ্র কিংবা মুসলমান গোত্রের লেখক ভেবে নাক সিঁটকান। লেখকের সংখ্যা নিয়ে কিংবা তাদের লেখার মান নিয়ে নেতিবাচক এবং হতাশাজনক উক্তি উগড়ে দেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো এই ছেলেটি বা মেয়েটি তো কোন অন্যায় করছে না। লেখালেখির এই সময়টা সে মাদকসেবন করতে পারতো, সীসা পার্টিতে ভিড়তে পারতো, ছিনতাই করতে পারতো বা অন্য যেকোন অন্যায় কাজে ব্যয় করতে পারতো; কিন্তু তা না করে আজকের এই ডিজিটাল যুগে যেখানে একটু কায়দা করে কোমর দুলিয়ে হাঁটলেই টাকা পাওয়া যায়, বিলাসী জীবনযাপন করা যায়, সেখানে সেসব কিছু না করে তারা গল্প-কবিতা লিখছে। নাইবা হলো গল্প-কবিতা, চেষ্টা তো করছে। শুধু এজন্যই কি তারা বাহবা পেতে পারে না?

ব্লগ উন্মুক্ত জায়গা, এখানে যার যেমন খুশি লিখে প্রকাশ করে। নতুন লেখকরা এখানে লিখে হাত পাকায়। সঙ্গত কারণেই এই নতুন লেখকদের শুরুর লেখা ততোটা মানসম্পন্ন হয় না। এই লেখাটি বাংলা সাহিত্যের জন্য কিংবা পাঠকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ না হতে পারে কিন্তু লেখকের কাছে তার প্রতিটি লেখাই গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চাশটি খারাপ মানের লেখার পরই হয়তো একদিন সে ভাল মানের একটি লেখা লিখতে পারবে। সুতরাং ভাল সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ওই পঞ্চাশটি খারাপ লেখা খুব প্রয়োজনীয়। আপনি এটা মাথায় রেখেও এই নতুন লেখককে উৎসাহ দিতে না-ই পারেন, নিজে থেকে তাকে ডেকে কিছু পরামর্শ দিতে কিংবা তাকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে সাহায্য করতে না-ই পারেন কিন্তু এটা মনে রাখবেন এইসব নতুন লেখকদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরানোর ঠিকাদারীও কেউ আপনাকে দেয়নি। আপনি বলতেই পারেন, আমার লেখার কিংবা বলার স্বাধীনতা আছে। হ্যাঁ, অবশ্যই আপনার বলার স্বাধীনতা আছে, আপনি অবশ্যই বলবেন, কেউ আপনাকে বাধা দেবে না; কিন্তু এইসব লিখে বা বলে আপনি নিজেকে কোন স্তরে নামিয়ে আনছেন, সেটাও ভেবে দেখতে পারেন। সারাদিন নেতিবাচক জাবর কাটার আগে এ-ও ভেবে দেখতে পারেন যে, আপনি নিজে ক’খানা ঝরাপালক, রূপসী বাংলা, তিতাস একটি নদীর নাম, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, পুতুলনাচের ইতিকথা, পথের পাঁচালী, চিলেকোঠার সেপাই, কালো বরফ, আগুনপাখি উপহার দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের পাঠককে।

আর এরা লিখছে বলেই আপনাদের মতো তথাকথিত বড় লেখকদের বই বিক্রি হচ্ছে, নইলে আপনাদের বই পোকায় কাটতো নয়তো অঙ্কুরিত হবার পরপরই বাদামের ঠোঙা হতো!

তাছাড়া এই যে প্রতি বছর বইমেলায় শত শত লেখকের হাজার হাজার বই প্রকাশিত হচ্ছে, এর বড় অংশটি-ই কিন্তু ব্লগার নয়। এরা সাহিত্যের নামে যা লিখছে তার সবই কি উত্তম সাহিত্য? এদের কেউ বছরে হাফ ডজন, কেউবা পৌনে এক ডজন বই লিখে প্রকাশ করছে। নানান রকম মিডিয়ার কাভারেজের বদৌলতে বিক্রিও হচ্ছে ভাল। ব্লগের বয়স মাত্র দশ বছর, অথচ ব্লগ আসার আগেও কিন্তু এদের উৎপাত ছিল এবং এখনও বহাল তবিয়তে আছে।

যারা ব্লগ সাহিত্যকে কটাক্ষ করে কথা বলছেন, যদি তাদেরকে প্রশ্ন করা হয় আপনি বর্ণপ্রথা বিংবা শ্রেণি বৈষম্যে বিশ্বাস করেন? তারা হয়তো একবাক্যে না-বোধক উত্তর দেবেন। কিন্তু তারা হয়তো বুঝতেই পারছেন না ব্লগ সাহিত্যকে খাটো করে কথা বলে তারা পুরনো বর্ণপ্রথার ওপর মোড়ক লাগিয়ে আধুনিক বর্ণপ্রথা কিংবা শ্রেণি বৈষম্যের মতো ঘৃণ্য অপরাধ-ই করছেন। ব্লগ লেখালেখির একটা নতুন এবং আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, এখানে লঘু-গুরুর হিসাব মেলাতে যাওয়া নির্বুদ্ধতিার কাজ।

সাহিত্যে এই বৈষম্য আগে কী ছিল? হয়তো ছিল। বনেদী পত্রিকার মাধ্যমে জনপ্রিয় পাওয়া লেখকরা হয়তোবা লিটলম্যাগের লেখকদেরকে নিয়ে কিঞ্চিত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। হয়তো এখনো করেন কেউ কেউ যেমনটি করেন ব্লগের লেখকদের ক্ষেত্রে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না বনেদী পত্রিকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নপুংসক সাহিত্যের চর্চা হয়। শুধু নপুংসক সাহিত্যই নয়, বার্ধক্যের জরাগ্রস্থ সাহিত্যের চর্চা হয় আর শোনা যায় বয়সী অন্ডকোষ চুলকানোর খসখস শব্দ! দাঁত নেই, নখ নেই, গলায় জোর নেই, হাঁটুতে বল নেই, কোমরে তাগদ নেই; আছে কেবল মাথা নিচু করে শাসকের তোষণ আর আপোষকামীর তৃপ্তির ঢেঁকুর!

কিন্তু লিটলম্যাগ কিংবা ব্লগ সাহিত্যে আছে যৌবন, কারো সাথে আপোসের বালাই নেই, ছড়ি ঘুরানোর কেউ নেই, কাউকে পরোয়া করার সময়ও নেই। আর আছে বৈচিত্র্য। উন্মুক্ত বিধায় বৈচিত্রপূর্ণ লেখায় ব্লগ ভরপুর। এখন ভাল লেখা খুঁজে বের করে পড়ার দায়িত্ব পাঠকের, যেমনটি বইমেলার রাশি রাশি বই থেকে পাঠক তার কাঙ্ক্ষিত ভাল লেখকের মানসম্পন্ন বইটি খুঁজে নেন।

আর ব্লগের বয়স কতো? মাত্র দশ বছর। এরই মধ্যে কেউ কেউ আলো ছড়িয়েছেন, কেউ ছড়াতে যাচ্ছেন। সময়ের সাথে সাথে ইন্টারনেটের গতি যতো দ্রুত হবে এবং প্রসার যতো বাড়বে ব্লগের লেখকের সংখ্যাও ততো বাড়বে। ২০৫০-৬০ সালে হয়তো দেখা যাবে সকল প্রতিষ্ঠিত লেখকই লেখালেখি শুরু করেছেন ব্লগে। তাই আজ যারা ব্লগের লেখকদেরকে অস্পৃশ্য ভাবছেন, তারা বাসি চিন্তার জাবর কাটছেন। কারণ আজকের এই অস্পৃশ্যরা অথবা এদের উত্তরসূরীরাই একদিন বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নেবে এবং দাপটের সঙ্গে সাহিত্য রাজ্যের রাজত্ব করবে। তাই পিছু লোকের কিছু কথা শুনে হতাশ নয় বন্ধু, আলোর রশ্মিটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা যদি নাও পারি, আজকে যৌবনে পা দেওয়া নতুন ব্লগাররাই একদিন ঐ আলোর সিংহাসনে বসে রাজত্ব করবে।


ফেব্রুয়ারি, ২০১৬।


সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:০১
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাটারিচালিত রিকশা , তিন-চাকার যানবাহন ব্যবস্থাপনা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবিকা সুরক্ষা এবং সিসা-দূষণরোধ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাব।

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮


বাংলাদেশের নগর ও শহরতলির পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি-বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন-চাকার যান ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম খরচের পরিবহন, বিপুলসংখ্যক চালক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৭



ধানমন্ডি ৩২: মানুষের হৃদয়ে যে বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি কেনা ও নির্মাণের টাকা কোথা থেকে এসেছিল-এই প্রশ্নটা মাঝেমধ্যেই অনলাইনে ঘুরেফিরে আসে। উত্তরটা আসলে লুকিয়ে নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয় - দরকার বিকল্প সরকার

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪



জামাতকে সংগঠন হিসেবে নিখুঁত বলা যায়, আলেম হতে হলে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় - মানে নেতা হবার আগে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে, বিএনপি-লীগের এমন কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×