
গাওয়াল
‘গাওয়াল’ গল্প লিখে ব্লগে প্রকাশ করেছিলাম ২০০৯ সালে। পাঁচ হাজারের বেশি শব্দে গল্প লিখেও তৃপ্ত হতে পারিনি তখন। আরও কিছু চরিত্র উঁকি-ঝুঁকি মারছিল মনের জানালায়। গল্পের মূল চরিত্র নীলকান্ত ওরফে নীলু এবং পার্শ্বচরিত্র ডালিম আরও বিস্তৃতি দাবি করছিল; আমি হাঁটলে ওরা আমার পাশে পাশে হাঁটতো, বসে থাকলে ওরা এসে খুনসুটি করতো, ঘুমোলে ওরা ঘরময় পায়চারি করতো, অন্য লেখায় হাত দিতে গেলে জামা ধরে টানতো ওদেরকে নিয়ে আরও লেখার জন্য! গল্পের আরেক চরিত্র রাঙাবউ মুখ ভার করে বসে থাকতো, অতো অল্পকথায় তার অন্তরের জ্বালা জুড়োয়নি যে! এই তিন চরিত্রের কাছ থেকে নিস্কৃতি পেতে এবং নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য ২০১১-১২ সালে গল্পটা গল্প হিসেবে রেখেই আলাদাভাবে লিখে ফেলি উপন্যাস ‘গাওয়াল’। এরপর ২০১৪ সালে শব্দনীড় ব্লগের গল্প প্রতিযোগিতায় ‘গাওয়াল’ গল্পটি প্রথম পুরস্কার লাভ করে।
উপন্যাসের মূল চরিত্র নীলকান্ত বা নীলু, তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই; জীবনে অনেক নীলকান্ত’র দেখা পেয়েছি। তাদের সাথে কথা বলেছি, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তাদের অন্তর্গত বেদনা বোঝার চেষ্টা যেমনি করেছি, তেমনি তাদের আনন্দটাও ছুঁতে চেয়েছি। নীলকান্ত নিয়ে আলাদাভাবে কিছু বলতে চাই না, যা বলার লেখাতেই বলেছি। কিন্তু ডালিম চরিত্রটি নিয়ে কিছু কথা বলতেই হবে। কেননা আমি যে জনপদে বেড়ে উঠেছি সেখানে ডালিম নামে রক্ত মাংসের একজন মানুষ আছেন, যারা তাকে চেনেন, তারা বিভ্রান্ত হতে পারেন। তিনি বৃহন্নলা; আমি আর আমার দিদি তাকে পিসি বলে ডাকতাম। ডালিম পিসিও আমাদের স্নেহ করতেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও যখন বাড়ি গিয়েছি, তখন ডালিম পিসি আমাদের বাড়িতে এলেই বলতেন, ‘বাবা কবে আলি?’ বলে আমার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে কী যেন বলে আশির্বাদ করতেন। আর প্রতিবারই মা তাকে দশটি টাকা এবং চাল দিতেন।
ছেলেবেলা থেকেই ডালিম পিসি আমার কাছে এক বিস্ময়! চারপাশে প্রাপ্ত বয়স্ক যাদেরই দেখেছি সবারই ঘর-সংসার আছে বা পরে হয়েছে, কেবল ডালিম পিসির-ই ঘর নেই, বর নেই, সংসার-সন্তান নেই! মাঝে মাঝে কোথা থেকে যেন উদয় হন, আবার কোথায় উধাও হয়ে যান! ডালিম পিসি যেন এক পরিযায়ী মানুষ! তিনি নরম স্বভাবের, তার এই নরম স্বভাবের কারণেই লোকে তাকে ঠকাতো, তাকে নিয়ে অসভ্য কথা বলতো, আবার অনেকেই তাকে ভালবাসতো।
আমার এই ডালিম পিসি আর উপন্যাসের চরিত্র ডালিম সম্পূর্ণ এক নয়। ডালিম চরিত্র নির্মাণে আমি কেবল ডালিম পিসির অন্তরের কিছুটা নিয়েছি আর শরীর নিয়েছি সাগরিকার। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরী বৃহন্নলা সাগরিকা। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ, লম্বা আর সুন্দর স্বাস্থ্য। তাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল- হায়! এর তো সবই আছে, সঙ্গে স্ত্রী লিঙ্গ যোগ হলে পৃথিবীর কোন ক্ষতিটা হতো! পৃথিবী এতো এতো অবাঞ্ছিত জিনিসের ভার বহন করছে আর একজন মানুষের স্ত্রীলিঙ্গের ভার বহন করতে পারতো না!
সাগরিকাকে জীবনে দু’বার দেখেছি, ফরিদপুর অথবা মাগুরার ওদিকে কোথাও থাকতো সে। এই দু’জন ছাড়াও ডালিম চরিত্রটিকে সমৃদ্ধ করেছে মাধুরী, বিপাশা, রিয়া, প্রিয়াংকাসহ নাম না জানা আরও অনেক বৃহন্নলা। তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। যদি জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতাম তবে বলতাম, পরজন্মে তোমাদের সবার যেন ঘর হয়, বর হয়, সন্তান-সন্ততি হয়। তা যখন করি না, এটুকু বলি, ভাল থাকো তোমরা। রাষ্ট্র এবং সমাজ তোমাদের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করুক।
ডালিম চরিত্রটি কোনোভাবেই ডালিম পিসির সম্পূর্ণ জীবন নয়, পরিণতি তো নয়-ই। অন্য নামে লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ডালিম পিসি আমার মনে এতোটাই রেখাপাত করেছেন যে লেখার সময় মনের ভুলে বারবার ডালিম লিখে ফেলছিলাম! যা সহজাতভাবে আসে তার ওপর জোর করে কিছু আরোপ না করে সেটাই মেনে নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তাছাড়া নামটি আমার বেশ পছন্দও। সঙ্গত কারণেই ডালিম নামটি রেখেছি।
তোমার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা ডালিম পিসি। ভাল থেকো।
রচনাকাল: ২০১২-১৩ সাল
নাগরী
‘নাগরী’ উপন্যাসের আখ্যান মৌলিক নয়, পৌরাণিক ঋষ্যশৃঙ্গ’র আখ্যান অবলম্বনে রচিত। মৌলিক আখ্যানকে ভিত্তি করে রচিত হলেও আখ্যান বিন্যাসে এসেছে বিস্তর পরিবর্তন। ‘নাগরী’র মধ্যে মূল আখ্যানের প্রচলিত ধর্মীয় ও অলৌকিক ঘটনা বা বিশ্বাস না খুঁজে এটিকে একটি বাস্তবধর্মী উপন্যাস হিসেবে পড়াই যুক্তি সঙ্গত, কেননা বর্তমানের এই বিজ্ঞানের যুগে বসে যদি একই আবর্তে থেকে সে-কালের অলৌকিক ঘটনা বা বিশ্বাসে আস্থা রাখি বা অবাস্তবতাকে মেনে নিই, তবে আর এই পুরোনো আখ্যান নতুন করে লেখার কোনো অর্থ হয় না। বাস্তবের পথে হেঁটে লেখক-স্বাধীনতা নিয়ে উপন্যাসের আখ্যান বিন্যাস করা হয়েছে অলৌকিকতা বর্জন করে। সঙ্গত কারণেই আখ্যানের পরিণতিও হয়েছে ভিন্নভাবে।
তবে মূল আখ্যানের ভেতরে তৎকালীন সমাজ-সভ্যতার যে গুপ্ত ঐতিহাসিক সত্য আছে; তা খুঁড়ে কিছুটা বিস্তৃত রূপ দিতে গিয়ে প্রাচীন ভারতের মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি তুলে ধরতে হয়েছে। আর তা করতে গিয়ে মূল আখ্যানের নির্দিষ্ট চরিত্রের বাইরেও অনেক কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করতে হয়েছে এবং চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসে গড়েপ্রাণ প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন সমাজ-সভ্যতায় লালন করে মূল চরিত্রগুলোর সঙ্গে একই সুতোয় গাঁথতে হয়েছে।
রচনাকাল: ২০১৬ সাল
লৌকিক লোকলীলা
জয়ন্ত ফেরিওয়ালার হাতুরির ঘায়ে তোবড়ানো ভাঙারি সিলভারের গামলার মতো আধখানা চাঁদ আকাশে, নির্জন রাতে তারক বৈরাগীর হাতের খঞ্জনির মতো আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে একনাগাড়ে ডাকতে থাকে ঝিঁঝিপোকা, উঁচু কোনো গাছের অন্ধকারাচ্ছন্ন ডালে বসা কোকিলের সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা যায়। গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে নগ্ন পায়ে দৌড়তে থাকে পরিমল, অমল আর বিলাস। তিনজনের পরনেই কাছা মারা লাল ধুতি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। পথ চলতে চলতে ওরা কখনও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে, কখনো পুরোনো কবর, পোড়ো ভিটে, হ্যাজাকবাতি দেখে, কিংবা কোনো গন্ধ বাতাসে ভেসে ঘ্রাণান্দ্রিয়ে আসায় ওদের একেকজনের স্মৃতিতে চাগাড় দিয়ে ওঠে বিভিন্ন ঘটনা। আর স্মৃতির ঘোড়ায় চড়ে ফিরে আসে মহি মৌয়াল, বিনোদ চক্রবর্তী, তেজরাজ রুংটা, দেবী বৈষ্ণবী, তারাপদ দাস এবং আরও কেউ কেউ। তবে ওরা তিনজনই স্মৃতিযাপন করে আশালতার সঙ্গে, তিনজনের কাছে ভিন্ন ভিন্নরূপে ফিরে আসে আশালতা।
মাঠ ভেঙে, ধুলোমাখা পথ ভেঙে, অন্ধকার ফুঁড়ে ওরা কখনও দৌড়ে কখনও হেঁটে সামনে এগোয়। কোথায় যায়?
বাংলাদেশের ফরিদপুর-রাজবাড়ী অঞ্চলের এক লোকসংস্কৃতিকে উপজীব্য করে লেখা এই আখ্যান।
রচনাকাল: ২০১৯ সাল
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


