somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাইকতপাড়ায় একদিন

১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাইকতপাড়ায় একদিন

আমাদের তিন পার্বত্য জেলায় যতগুলো আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোক আছে তাদের প্রায় সবাই বান্দরবান জেলায় বসবাস করে। তাদের সবারই রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্রপূর্ন জীবনধারা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আদিবাসীদের মধ্যে মারমা আর ত্রিপুরারা সাধারণত নদী ও ঝিলের ধারে থাকে। তেমনি বম, খুমী, ম্রো(মুরং) আদিবাসীদের গ্রামগুলো বেশ উচুঁ জায়গায় হয়। কোন এক অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে উচুঁ গ্রামগুলোতে বম আদিবাসীদের বাস। বাংলাদেশের সবচেয়ে উচুঁতে অবস্থিত গ্রামের নাম সাইকতপাড়া। এটি বান্দরবান জেলার রুমা থানায় অবস্থিত। পেশাগত কারনে আমার বহু দিন এই পাহাড়ী এলাকায় অবস্থান। যার কারনে ট্রেকিং আমার নতুন নেশা! পাহাড়ে ট্রেকিং-এ আমার এবারের গন্তব্য সাইকতপাড়া। আমার অপর দুই সঙ্গী অভিযাত্রী জামিল ও মাহবুব এপথে নতুন বলে অভিযানকে আকর্ষনীয় করার জন্য বগালেক ও কেওক্রাডং পাহাড় চূড়াকে এই ট্রেইলে অর্ন্তভুক্ত করি।

বেলা দু'টায় রুমা বাজারে পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে প্রয়োজনীয় কেনা-কাটা সেরে ফেলি। লাইরুনপিপাড়া দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সাফ্রু অং নামে বগামুখপাড়ার এক মারমা পুরুষের সাথে দেখা। আমাদের আজকের গন্তব্য বগামুখপাড়া। সাফ্রু অং মারমাকে আমাদের গাইড হওয়ার অনুরোধ করা মাত্রই সে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। লাইরুনপিপাড়া পার হয়ে আমরা ঝিলের ধারে চলে এসেছি। অন্ধকার হওয়ার আগেই আমাদের বগামুখে পৌঁছতে হবে। একেতো শীতের দিনের বেলা খুব ছোট, তার উপর সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলে অন্ধকার নেমে আসে। আমরা ঝিলের কাঁচের মত স্বচ্ছ পানির মধ্য দিয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটতে লাগলাম। এখানকার প্রকৃতির রূপ দেখে জামিল ও মাহবুব বিমোহিত। রুমা বাজার থেকে দু'ঘন্টা হেঁটে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় আমরা বগামুখ পৌঁছি। পুর্বে বহুবার বগামুখ অতিক্রম করলেও কখনও এখানে রাত্রিযাপন করা হয়নি। বগামুখের তিন পাশে তিনটি গ্রাম। দু'টি মারমা ও একটি ত্রিপুরা গ্রাম। আমরা ত্রিপুরা গ্রামের পূর্ব পরিচিত সুভাষ ত্রিপুরার বাসায় উঠি। পাড়াটির নাম ভাগ্যমনিপাড়া। পাহাড়ে সাধারনত কারবারীর (গ্রাম প্রধান) নাম অনুসারে গ্রামের নামকরণ হয়। প্রায় বাইশ পরিবার এখানে বাস করে। পাহাড়ীদের আতিথীয়েতার কথা যতই বলা হোক কম হবে, তা আরেকবার প্রমানিত হল সুভাষ ত্রিপুরার ঘরে।

কথামত পরদিন খুব ভোরে সূর্য উঠার আগেই হাজির আমাদের গাইড। শীতের সকালে বগামুখকে মনোরম লাগছিল। প্রায় ঘন্টা তিনেকের পদযাত্রায় আমরা বগালেক এ পৌঁছি। বগালেকের সৌন্দর্য্যে রনি আর অম্লান মুগ্ধ। রনি বিস্ময়ে বলল, এত উচ্চতায় এত চমৎকার একটি লেক আমাদের দেশে, ভাবতেই ভাল লাগছে। বগালেকের পানিতে গোসল করতে নামার সাথে সাথে আমাদের পাহাড়ে হাঁটার কান্তি নিমিষেই দূর হয়ে গেল।

পরদিন ভোরে প্রায় দু'ঘন্টা হেঁটে আমরা দার্জিলিংপাড়া পৌঁছি। দার্জিলিংপাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় উচ্চতম জনবসতি। এর উচ্চতা প্রায় ২৫০০ ফুট। এটিও একটি বম আদিবাসীদের গ্রাম। পাড়ায় ব্যাগ-প্যাক রেখে একটু জিরিয়ে আমরা পচিশ মিনিটে কেওক্রাডং চূড়ায় পৌঁছে যাই। পরদিন ভোরে দেড় ঘন্টা হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম সাইকতপাড়া। চড়াই-উৎরাই কম বলে দার্জিলিংপাড়া থেকে সাইকতপাড়া যাওয়ার পথ অনেকটা সহজ। সাইকতপাড়া সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ২৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত একটি বম পাড়া। আমরা পাড়ার কারবারী (গ্রাম প্রধান) সাংচুয়ান বমের ঘরে উঠি। পাড়াটি বেশ ছিমছাম ও গোছানো। এমনিতে পাহাড়ীদের মধ্যে বমরা বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। এত উচ্চতায়ও বেশ বড় একটি খেলার মাঠ আছে। সারাক্ষণই বেশ জোরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। এখান থেকে কেওক্রাডং পাহাড় চূড়া দেখা যায়। পাড়ার কারবারীর কাছ থেকে জানতে পারলাম ১৯৬১ সালে এখানে পাড়াটি স্থাপিত হয়। তলাংচাতপাড়া থেকে প্রথমে ছয়টি পরিবার এখানে এসে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে গ্রামটিতে ৩৫টি পরিবারে প্রায় দুইশত জন লোক বাস করছে। পাহাড়ে এমনিতেই পানির সমস্যা, তার উপর এত উচ্চতায় পানি সংগ্রহ করা বেশ কষ্টসাধ্য। পাড়ার এক পাশে পাহাড়ের ফাটল দিয়ে পানি বেরিয়ে একটি প্রবাহ বয়ে চলছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ একেবারে কমে যায়। পাড়ায় বেশ কিছু কমলা ও কফি গাছ আছে। পাড়ার বাসিন্দারা জানে না যে, তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত গ্রামে বাস করে। এ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যাথাও নেই। পরদিন ভোরে যখন পাড়া থেকে ফিরতি পথ ধরলাম, তখন পাড়ার সবাই আমাদের বিদায় জানাতে এলো। মনটা একটু খারাপই হলো। এই একদিনে পাড়ার সবাই আমাদের বেশ আপন করে নিয়েছিল। তারা প্রতি নিয়ত প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে টিকে আছে। তা সত্তেও তাদের মন পাহাড়ের মত বিশাল এবং প্রকৃতির মত সুন্দর।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:২৩



তাহসিফের মৃত্যু: খাতা আর টাওয়ার খুললেই যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলে-

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন রহস্যের আরেক নাম। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

DNA — ঈশ্বর এবং প্রশ্ন ?

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১২



১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×