somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জন স্টুয়ার্ট মিল

০৬ ই মে, ২০১৫ দুপুর ১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জন স্টুয়ার্ট মিল(১৮০৬-১৮৭৩) একজন দার্শনিক, রাজনীতিক এবং সর্বোপরি বলা হয়ে থাকে ঊনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইংরেজীভাষী দার্শনিক। তিনি দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতি, নৈতিকতা, ধর্ম, নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে লেখা লিখেছেন। তার গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে A System of Logic, On Liberty, and Utilitarianism উল্লেখযোগ্য।

জন স্টুয়ার্ট মিলের পিতার নাম জেমস মিল(James Mill)। তিনি একজন স্কটিশ। জন বিয়ে করেন হেরিয়েট বারো(Harriet Barrow) নামে একজনকে। জেমস মিল History of British India(1818) নামে একটি বই লেখেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে চীফ এক্সামাইনার হিসেবে চাকুরি করেন। জেমস মিল ১৮০৮ সালের দিকে জেরেমি বেন্থামের সাথে পরিচিত হলে তার utilitarianism দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হন এবং তারা দু’জন মিলে “philosophic radicals” নামে এক দার্শনিক গ্রুপ গঠন করেন।

১৮০৬ সালের ২০ মে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের কাছে পেন্টনভিল্যা/ভিলে নামে এক মফস্বল এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জেমস মিল ও হেরিয়েট বারো-র প্রথম সন্তান। জেমস মিল তার সন্তানকে নিবিড়ভাবে জ্ঞানার্জনের উদ্যোগ গ্রহণের দিকে মনোযোগ দেন। এক্ষেত্রে জেরেমি বেন্থাম ও ফ্রান্সিস পেলেসএর সহযোগিতা ও পরামর্শ তিনি গ্রহণ করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো একসময় তাদের এই সন্তান তাদের দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম প্রচারক হবে। জেমস তার পুত্রকে তার সমবয়সী শিশুদের সাথে মিশতে পর্যন্ত দেননি।

জন স্টুয়ার্ট মিলকে তিন বছর বয়সে তাকে গ্রীক ভাষা শেখানো হয়। আট বছর বয়সে ল্যাটিন শেখা শুরু করেন। এ সময় তিনি ইউক্লিড ও এলজেবরা বিষয়ে ধারনা অর্জন করেন। ১০ বছর বয়সেই তিনি প্লেটো ও ডেমোস্থেনেস এর গ্রন্থ পড়তে পারতেন। ১২ বছর বয়সে তিনি স্কলাস্টকের যুক্তিবিদ্যা ও এরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা দর্শন মূল ভাষায় পড়া শুরু করেন। একই বছর বয়সে এডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র পড়তে শুরু করেন। ১৪ বছর বয়সে ফ্রান্সে তাকে একবছর কাটাতে হয়। সেখানে তিনি রসায়ন, প্রাণীবিদ্যা ইত্যাদি বিজ্ঞানের জ্ঞানশাখার উপর জ্ঞান অর্জন করেন। খুব কম বয়সে এত পরিমাণ লেখাপড়া করার কারণে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারানোর মতো অবস্থা অনুভব করেন তার ২০ বছর বয়সে। তার Autobiography-তে তিনি এ বিষয়ে লিখেন। এ সময় তিনি এই মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে উয়িলিয়াম ওয়ার্ডওয়ার্থের কবিতা পড়েন। এছাড়া তার পিতা ও জেরেমি বেন্থামের ইউটিলিটারিয়ানিজম মতবাদের দর্শনের বাইরে অন্য দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ও পড়া শুরু করেন। এভাবে মানসিক ভারসাম্য ফিরাতে তাকে কয়েকমাস পরিশ্রম করতে হয়।

জেরেমি বেন্থাম ১৮৩২ সালে এবং তার পিতা জেমস মিল ১৮৩৬ সালে মারা যায়। এরপর জন স্টুয়ার্ট মিল তার নিজস্ব স্বতন্ত্র দর্শন চর্চার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি অগাস্ট কোঁতে, থমাস কার্লাইল, কোলরিজ, জন রাস্কিন, আলেক্সিস দ্য টোকুভিলে(Alexis de Tocqueville) প্রমুখ দ্বারা প্রভাবিত হন বা তাদের দর্শন বিষয়ে জানার চেষ্টা করেন।

এরই মধ্যে তিনি ১৮৩০ সালে হেরিয়েট টেইলর নামে এক মহিলার প্রেমে পড়েন। উক্ত মহিলার এক সন্তান ও তার স্বামীও ছিলো। স্বামীর নাম জন টেইলর। তারপরও জন স্টুয়ার্ট মিল ও হেরিয়ট টেইলরের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ১৮৫১ সালে তাদের বিয়ে হয়। ১৮৫৮ সালে হেরিয়েটের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একসাথে ছিলেন এবং জন স্টুয়ার্টের লেখায় হেরিয়েটের নানা প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।

এরই জন স্টুয়ার্ট মিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে ১৮২৩ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত চাকুরি করেন। পরবর্তিতে ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি নারীর ভোটাধিকার, আয়ারল্যান্ডের আইরিশদের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নপন্থীদের পক্ষে কথা বলেন। এই সময়ে তিনি ইউনির্ভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রিজের লর্ড রেক্টর পদেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৮৭৩ সালের ০৮ মে তিনি ফ্রান্সের আভিগঁ(Avignon)তে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

জন স্টুয়ার্ট মিলের কাজ ও দর্শন

উপযোগবাদ বা ইউটিলিটারিয়ানিজম

তার পিতা জেমস মিল ও জেরেমি বেন্থামের “greatest-happiness principle” বা পরম সুখবোধের নীতি সংক্রান্ত ধারণাকে তিনি নিজের মতো বর্ণনা করেন। জেরেমি বেন্থামরা সুখ বা আনন্দকে পরিমাপ করার প্রচেষ্টা করতেন (Bentham treats all forms of happiness as equal, whereas Mill argues that intellectual and moral pleasures (higher pleasures) are superior to more physical forms of pleasure (lower pleasures). । কিন্তুু তিনি এর বিপরীতে বলেন, মুর্খের সুখবোধের চেয়ে তিনি বরং সক্রেটিসের মতো জ্ঞানীর সুখবোধ অপ্রাপ্তির আকাঙ্খা করেন। অর্থাৎ তিনি বৌদ্ধিকতা বা জ্ঞানার্জন ও নৈতিকতাবোধ বা মরালিটির উপর এবং তার মাধ্যমে সমাজের মঙ্গলের সাধনকে গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

উপনিবেশবাদের সমর্থক জন স্টুয়ার্ট মিল

জন স্টুয়ার্ট মিল স্বাধীনতা বা লিবার্টি বিষয়ে লিখলেও তৎকালীন সময়ে যে সকল এলাকায় উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছে সে সকল এলাকার জনগণকে এক অর্থে তিনি প্রাক-সভ্য বা বর্বর হিসেবে পরিগণিত করে এও বলেছেন যে, সকল সমাজের জন্য স্বাধীনতা বা লিবার্টি প্রযোজ্য নয়। প্রাক-সভ্য বা বর্বরদে শাসন করতে তিনি সার্বভৌম প্রশাসকের প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন। তবে তিনি বলছেন, সেই শাসককে ‘সদাশয় বা কল্যাণকামী শাসনবাদী’ (benevolent despotism) হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেছে, শিশু ও সমাজের যারা পশ্চাৎপদ তাদের জন্য স্ব-শাসন প্রযোজ্য হতে পারে না।

নারী অধিকার সংক্রান্ত

জন স্টুয়ার্ট মিল The Subjection of Women বইটি লেখেন ১৮৬১ সালে। এ্টি প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। এতে তিনি বিবাহ ব্যবস্থা বিষয়ে কথা বলেন এবং তার পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মত দেন। তিনি নারীর অধিকারহীনতার ক্ষেত্রে তিনটি বাধার কথা বলেন।এগুলো সমাজ ও সমাজ কর্তৃক জেন্ডার বিনির্মাণ, শিক্ষা ও বিবাহ। নারীর উপর নির্যাতন যা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে তা মানবিকতার বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলতে চেয়েছেন, নারীকে কখনোই তার স্বাভাবিকতাকে স্বীকার করা হয় না।

অন লিবার্টি

জন স্টুয়ার্ট মিলের অন লিবার্টি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তা চেতনাকে প্রকাশের অন্যতম একটি গ্র্ন্থ বলা যায়। এই বইয়ের বিশদ আলোচনা যে কাউকেই জ্ঞানালোকের দিকে সমাজ কল্যাণকামী চেতনার দিকে ধাবিত করবে বলেই প্রত্যাশা।

তিনি বলছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র’ও এক ধরণের ‘সংখ্যা লঘিষ্ঠের’ উপর নিপীড়নের মতো যাকে তিনি বলেছেন tyranny of the majority।

তিনি তার এই গ্রন্থে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শাসনচক্র বা সরকার ব্যবস্থা অবশ্যই সীমাহীন স্বাধীনতার উপর স্থাপন হতে পারে না, বরং সরকার যত কম পরিমাণে জনগণের চিন্তা কাজে হস্তক্ষেপ করবে ততই মঙ্গল।

এমনিক ভুল মতামত তা প্রচারের সুযোগ পেলেও বিতর্কের কারণে ভুল চিন্তাধারা সংশোধনের সুযোগ থাকে এবং যদি মতামত বা চিন্তা সঠিকও হয় তবে তা আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাইয়ের সুযোগ থাকে । তিনি এমনকি এও বলছেন, সঠিক একটি মত তা নিয়ে বিতর্ক বা আলোচনা না হলে তা গ্রহণীয় হতে পারে না।

তিনি বলছেন, সরকার তখনই কারো ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে যখন দেখা যাবে যে উক্ত ব্যক্তিগত অধিকার চর্চার কারণে কারোর চরম ক্ষতি হচ্ছে, তার আগে নয়।

লেখাটি লিখতে যে সকল লেখার সাহায্য নেয়া হয়েছে-

দ্রষ্টব্যঃ মূলত জানার জন্য এই লেখালেখি। জানা বিষয়কে আরো ভালোভাবে যেন আত্মস্থ করা যায় তার জন্য লেখা। সুতরাং, পান্ডিত্য চর্চা এতে পাওয়া যাবে না।

এছাড়া বাংলায় এ বিষয়ে ওয়েবসাইটে কম লেখা খুঁজে পাওয়ায় মূলত এই লেখাটি লিখতে চেষ্টা করেছি।

ভুল থেকে থাকলে বা কোথাও জন স্টুয়ার্ট মিলের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করলে লিখে জানালে এ বিষয়ে জানা আরো বাড়বে বলে মনেকরি।

০১. উইকিপিডিয়া

০২. স্ট্যান্ডফোর্ডডটএডু

০৩. বায়োগ্রাফিডটকম

০৪. Socrates to Sartre-A History of Philosophy by Samuel Enoch Stumpf

০৫. John Stuart Mill-On Liberty and The Subjection of Women Edited by Alan Ryan.

- See more at: Click This Link
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×