বেশ কিছুদিন ধরে শামীমের মন-মেজাজ ভালো যাচ্ছে না। চার পাঁচদিন পরেই কোরবানির ঈদ। বাড়ি যাওয়া দরকার ওর। শামীমের স্যার যে ওকে ছুটি দেয়নি তা না। স্যারের বাচ্চাদের স্কুল ঈদ উপলক্ষ্যে বন্ধ দেয়ার পরপর ই ওর স্যার বলেছে ওকে বাড়ি চলে যেতে। কিন্তু ছুটি দিলেই কি যাওয়া যায়! ঈদের জন্য স্যারের কোরবানির গরু কেনা, কোরবানি দেয়া, মাংস কাটাকুটি, ভাগাভাগি, আত্মীয়দের বাড়ি পৌঁছে দেয়া এসব কাজ স্যার না বললেও ও নিজ থেকে করে দেয়। বাড়ি যাওয়ার সময় স্যারসহ তাদের আত্মীয়দের কাছ থেকে সব মাংস মিলিয়ে তেরো চৌদ্দ কেজির মত ও মাংস পায় বলেই আগে আগে বাড়ি যেতে না চাইলেও মন পড়ে থাকে বাড়ির দিকেই আর স্যারদের বোঝাতে হয় ও কত নিবেদিতপ্রাণ! নিবেদিতপ্রাণ না কচু! কদিন আগেই ওর বাবা ফোন দিয়ে বলেছে এবার বাড়ি আসার আগে হাজার পঞ্চাশেক টাকা স্যারের কাছ থেকে ধার নিতে। পচু শেখদের ষোল শতাংশ জমি নাকি তারা পানির দরে ছেড়ে দিচ্ছে!
ও বেতনের একটা টাকাও বাজে কাজে খরচ করে না। পুরো টাকা জমিয়ে স্যারের বা স্যারের বউ, তার বাবার কাছ থেকে যখন যাকে পায় খুচরা বিশ পঞ্চাশ টাকা চেয়ে নিয়ে ও মাস চালায়। মাঝে মাঝে স্যার লাঞ্চ বিল দিলেও ও সেটা না খেয়ে জমিয়ে রাখে।আর এমনিতে তো খাওয়া-দাওয়া সব স্যারের বাসাতেই করে। সেই হিসেবে মাসের বেতন পুরোটাই নেট সলিড হিসাবে রয়ে যায়। কিন্তু খিদে লাগলে সে সময় ওর খিদের চোটে মাথায় রক্ত উঠে যায়। ও খিদে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। দোষটা ওরই যে ও না খেয়ে টাকা জমায়। স্যার বা অন্য যে কেউ গাড়ি নিয়ে বের হলে শামীমকে খেতে ঠিকই টাকা দেয়। কিন্তু সে টাকা থেকে খরচ করতে ওর বুকে খচখচ করে বিঁধে। ক্যান স্যাররা যে হোটেলে খেতে ঢোকে সেখানে কোণার দিক দেখে একটা টেবিলে ওকেও যদি খেতে ডাকে কি এমন অসুবিধা হয়ে যাবে তাদের।! এক্সট্রা টাকাটাও জমলো আবার খাবারো খাওয়া হলো।
স্যার আজকে তার বউ কে নিয়ে বের হয়েছে। তার বউ এত বেশি কথা বলে শামীমের মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায়। আর এই মহিলা গাড়িতে উঠলে প্রথমে বলে "এই এসি ছাড়ো।টেম্পারেচার ঠিক করে দাও।গরম লাগে ক্যান! " এমন ভাবে কথা বলে যেন মন্ত্রী মিনিস্টার!
এসিটা নষ্ট ছিল, সেটাই ভাল ছিল। এত ঠান্ডা করে এসি চালাতে হয়, শামীমের শীত লাগে। শামীমের দিকে তাকিয়ে তার বউ হাসতে হাসতে স্যারকে বলেছে শামীমকে বলতে পারো না , গাড়িতে পাতলা দেখে সোয়েটার রাখতে! আমি গাড়িতে ওঠার আগে গাড়ি ঠান্ডা করে রাখবা শামীম।পরের কথাটা শামীমের দিকে তাকিয়েই বলে। শামীমের বলতে ইচ্ছা করে আমি আপনার চাকর নাকি। কিন্তু বলা সম্ভব না। শামীম তো এখানে চাকরি করতেই এসেছে।
টাকার চিন্তায় শামীমের কদিন ধরে রাতে ভালো ঘুমও হচ্ছে না। প্রত্যেকদিন ওর বাপ ফোন করে একই কথা জানতে চায় -
টেকা টুকা যোগাইসস নি। পঁচু শেখ কিন্তু জমিডি ছাইড়া দিব।
ওর মেজাজ টা খারাপ হয় ওর বাপের কথা শুনে। এমন ভাবে বলে যেন টেকা টুকা বলদের গোয়া দিয়া বাইর হয়।
হ হ, স্যারেরে কইছি হাওলাত দিতে। পরে মাসে মাসে বেতন থন কাইট্যা রাখবো।
শামীম কিপ্টামি করে যে কয়টা টাকা জমিয়েছিল, গত পাঁচ মাসে ডাক্তারের পিছনে ছয় সাত হাজার টাকা হড় হড় করে বেরিয়ে গেছে। যত গন্ডোগলের মূল এই স্মার্ট ফোনটা। ওর এই নতুন ফোন দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায়।ওর বন্ধুর কাছ থেকে শিখেছে কোন জায়গায় উল্টা পাল্টা বিদেশি আর দেশি মেয়েদের ছবিও দেখা যায়। ফোনের জন্য সাড়ে চার হাজার আর ইন্টারনেট এর প্যাকেজ কিনতে গিয়েও ওর টাকা খরচ হয়েছে। শামীমের বাপ কেন যে বোঝে না ওর বিয়ের বয়স হয়েছে! ঐসব উল্টা পাল্টা জিনিস দেখে দেখে ওর একটা নেশার মত হয়ে গেছে। বিদেশি মেয়েদের চেয়ে দেশি জিনিসই ওর বেশি ভাল লাগে।
এরপর থেকেই শুরু হলো সমস্যা। উল্টা পাল্টা স্বপ্ন দেখে দেখে ওর শরীর খারাপ হওয়া শুরু করলো। জ্বর জ্বর ভাব, হাত পা ছেড়ে দিচ্ছে এমন লাগতো। ওর স্যারটা ভালোই। অনেকদিন ও ডিউটি করতে পারেনি। স্যার নিজেই গাড়ি চালিয়ে অফিসে যেতো, বাচ্চাদের স্কুল ডিউটিও করতো। কিন্তু এক নাগাড়ে এতদিনের অসুস্থতা দেখে যখন ওর স্যার চেপে ধরলো কি সমস্যা, ভালো ডাক্তার দেখানো লাগবে কিনা এসব জিজ্ঞেস করলো, তখন বলতেই হলো স্বপ্ন দোষের কথা। কি যে লজ্জায় পড়েছিলো। না বলেই বা উপায় কি, টাকা তো স্যারের কাছ থেকেও নিতে হয়েছে।
আজকে গাড়ি চালিয়ে শামীম জুত পাচ্ছে না তেমন। খুব খিদে লেগেছে। স্যার আর তার বউ যে হারে গল্প গুজব করছে, খিদের নামগন্ধও তাদের মুখে নেই। সেই থেকে ওর মেজাজ খারাপ হতে শুরু করেছে। আজকে স্যার সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়েছে বলে নাস্তাটাও বাইরে করতে হয়েছে। দুইটা পরোটারর দামই বারো টাকা, ভাজির প্লেট দশ টাকা, চায়ের কাপ আট টাকা। সকাল সকাল ত্রিশ টাকা নাই। দুইটা পরোটায়য় কি পেট ভরে! স্যার ওকে পঞ্চাশ টাকাই দিয়েছিল কিন্তু পুরো টাকা খরচ করতে ওর বাঁধছিল বলে পেট ভরে ও খায়নি। দুপুর তিনটা বাজতে চললো। কখন যে তাদের খিদে লাগবে!
শামীম গুলশান ১ এর কাছে এসে বাঁ দিকে মোড় নিও তো। আমরা হেঁটে পার হচ্ছি। এই জ্যামে বসে থাকলে কপালে খাবার জুটবে না। তুমি গাড়ি পার্ক করে ফখরুদ্দিনে এসে ঢোকো।
স্যারের কথা শুনে মনে হলো শামীমের খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠলো।
শালার জ্যাম আর ছুটে না জানি। শামীমের ইচ্ছে করছে লাত্থি মেরে গাড়ি থেকে নেমে আগে দুই প্লেট তেহারি মেরে দেয়। শামীম যেই বাঁয়ে মোড় ঘুরবে আবার স্যারের ফোন।
শোনো শামীম ফখরুদ্দিন বন্ধ। তুমি সোজা সামনে আগাও। এইচ এসবিসি ব্যাংকের এখানে রাখো। একটা কাজ সেরে আসছি আমরা।
শামীম মনে মনে গালি দেয়, হালার খাচ্চর।নামনের আগে কয়ডা টেকা দিলে কি হইতো! নিজেরা তো ঠিকই অন্য জায়গায় গিয়া খাইবো।
শামীম ঠিকই তক্কে তক্কে থাকে স্যার আর ম্যাডাম কই যায় দেখার জন্য। ও যা ভেবেছে তাই। ইমাম বাড়ি রেস্টুরেন্ট থেকে তারা বের হয়ে দোকান থেকে কি যেন কিনল। আইল্যান্ডে উঠে ম্যাডাম এদিক সেদিক গাড়ির খোঁজে তাকায়।গাড়িতে উঠে ওর স্যার খুব হায় আফসোস করে, ইশ দুপুর তিনটা বেজে গেছে।কখন বাসায় যাবো আর খাবো।
ইসশ কি মিথ্যুক। ও ব্যাক মিরর দিয়ে ঠিকই দেখছে একটু পর পর স্যার টুথ পিক দিয়ে দাঁত খোচাচ্ছে। ও আগেও খেয়াল করেছে খাওয়ার পর স্যার দাঁত খোঁচায়। স্যার আবার জিজ্ঞেস করে, শামীম কোন দিক দিয়ে যাবা? ফার্মগেট না হাতিরঝিল? ফার্মগেট দিয়ে গেলে মনে হয় জ্যাম কম পড়বে। শামীমের স্যারের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না।মনে মনে বলে যেখান দিয়া জ্যাম বেশি অইদিক দিয়া যামু। আমারে বলদ পাইছস?
ওর মেজাজ খারাপ হলে তার ছাপ চেহারায় পড়ে। শামীম কপাল কুঁচকে আছে
হঠাৎ শোনে স্যার ম্যাডাম কে বলছে, হি হ্যাজ সাম ইস্যুজ এবাউট ফুড! ডিড ইউ নোটিশ?
শামীম ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে।স্যার ভাবছে ও কিছুই বুঝে না! রাগে ওর গা জ্বলছে। শামীম একটু একটু ইংরেজি বোঝে, টুকটাক দুই তিনটা ইংরেজি অ নিজেও বলতে পারে। ম্যাডামও বললো -
হোয়াই ডু হি লাইক দিজ বিহেভিওর! স্ট্রেঞ্জ! বিসাইডস হিজ স্যালারি, হি অলওয়েজ টেকিং ফিফটি অর হান্ডড়্রেড ফর মোবাইল ফ্লেক্সি পারপোজ অর আদার ইস্যু। সারভেন্ট, ড্রাইভার অল আর সেইম ক্যাটাগরির, হোয়াটেভার ডু ফর দেম,দে নেভার স্যাটিস্ফায়েড! বুল শিট!
এদিকে শামীমের খিদেয় পেট জ্বলছে আর তারা আসছে ইংরেজি মারাইতে। শামীমের মুখ খারাপ করে গালি দিতে ইচ্ছে করে। আরও ইচ্ছে করে নতুন কাজ করে আনা গাড়িটা কোনো রিকশা বা অন্য গাড়ির সাথে ঘষা লাগিয়ে স্পট ফেলে দিতে। তারপর রিকাশাওয়ালা বা অন্য ড্রাইভারকে কয়েক ঘা লাগাতে। শামীম ওর রাগটা কমাতে পারছে না। আমারে কয় বুল শিট! বুল শিটের মায়রে বাপ!
গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে ম্যাডাম বলে,
শামীম তোমার মেজো ভাইয়ার কিন্তু চারটায় কোচিং আছে। আমাদের বাসায় নামিয়ে দিয়েই ওকে নিয়ে তুমি কিন্তু কোচিং দিয়ে আসবে।
এই হইলো আরেক মুশকিল, সারাটা দিন কুত্তার মতো স্কুল আর কোচিং এ দিয়ে আসা, নিয়ে আসা নিয়েই আছে। সারাদিন কাকরাইল আর বেইলি রোডের জ্যামে থাইক্যাই আমার জীবনডা গেলো। শামীমের ইচ্ছা হলেও এসব নিয়ে কিছু বলার থাকে না দীর্ঘশ্বাস ছাড়া। স্যারের বাসার কাছাকাছি চলে এসেছে প্রায়। গাড়ি থেকে নেমে ম্যাডাম শামীমের দিকে একশো টাকা বাড়িয়ে দেয়।
টাকাটা রাখো শামীম, ফাযানকে কোচিং এ নামিয়ে দিয়ে তুমি দুপুরে খেয়ে নিও।
টাকাটার দিকে তাকিয়ে শামীমের খপ করে নিয়ে নিতে ইচ্ছে করে আবার পাশাপাশি রাগও ওঠে। ইচ্ছে করে টাকাটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বাতাসে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু টাকার এতো ক্ষমতা শামীমের সেই শক্তি নেই টাকা ছিঁড়ে ফেলে দিবে। পরক্ষণে শামীমের ভেতর পৈচাশিক ইচ্ছে কাজ করে। ম্যাডাম গাড়ি থেকে নেমে শামীমের দরজাটা খুলে টাকাটা বাড়িয়ে আছে ওর দিকে। নেইলপলিশ লাগানো ম্যাডামের চিকন চিকন আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ওর মনে হয় দরজাটা আটকে দিয়ে তার আঙুলগুলো থ্যাতলে দিতে। যদি জোরে একটা বাতাস আসতো আর দরজাটা ক্যাঁচ করে এসে আপনাআপনি লেগে যেতো, বেশ হতো। শামীমের জ্বলজ্বলে চোখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায় না ও টাকা নাকি দরজাটা লেগে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




