আজকাল আমরা সবাই দৈনন্দিন কাজের জন্য ইন্টারনেটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল । প্রতিদিন শিক্ষা, বিনোদন, যোগাযোগসহ প্রায় সর্বক্ষেত্রেই আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। শুধু বড়রাই নয়, ছোটরাও আজকাল স্কুল এর অনেক অ্যাসান্টমেন্ট করার জন্য ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করে । এছাড়া তাদের বিনোদনের একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে কম্পিউটার গেমস, যোগাযোগের জন্য ফেসবুক । ইন্টারনেট যেমন আমাদের সামনে এক অবারিত জ্ঞানের দরাজা খুলে দিয়েছে, তেমনি এই খোলা দরজা দিয়ে কিন্তু অনেক অনাকাংখিত বিষয়ও আমাদের মাঝে প্রবেশ করছে । তাই সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে । যেহেতু ছোট বয়সে ভালো মন্দ বোঝার ক্ষমতা তুলনামুলক ভাবে কম থাকে তাই বাবা মা হিসেবে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে আপনার সন্তান ইন্টারনেটে কতটুকু নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য । বিষেজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন “অনলাইন প্যারেন্টিং” যেখানে “বাস্তব জীবনের” পেরেন্টিং এর মতোই আপনি সবসময়ই চাইবেন আপনার সন্তান কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলুক ও তার স্বাভাবিক বিকাশ হোক ।
যেমন ধরা যাক, বাস্তাব জীবনে আপনি জানতে চান আপনার সন্তান কখন কার সাথে দেখা করছে, কাদের সাথে মিশছে, কোথায় কোথায় যাচ্ছে । আপনি চান আপনার সন্তান যেন কোন কিছুতে আসক্ত হয়ে না পড়ে । যদি সন্তান আপনার কথা না শুনে তবে তাকে বুঝানের চেষ্টা করেন, তাকে শাসন করেন । তার চলাফেরা পর্যবেক্ষন করেন । অনলাইন পেরেন্টিংয়ে বিষয়গুলো প্রায় একই রকম থাকে । আপনি নিশ্চিত করতে চান আপনার সন্তান তার বয়স অনুযায়ী সামনজস্যপূর্ন ওয়েব সাইটগুলোই শুধু অ্যাকসেস করুক, কোন অযাচিত বা অ্যাডাল্ট সাইট সে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে অ্যাকসেস না করুক । আপনি চান আপনার সন্তান যাতে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে না পড়ে । অনলাইন পেরেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা যেতে পারে ।
সন্তানের সাথে ইন্টারনেটের ভালো ও খারপ দিক সম্পর্কে আলোচনা করা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো আপনার সন্তানকে জানানো যে সে যে মিডিয়ামটি ব্যবহার করছে সেটা কতটুকু উপকারী বা কতটুকু ক্ষতিকর । কিভাবে এটা তার জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে । তাকে ইন্টারনেটের প্রাথমিক নিরাপত্তা অভ্যাসগুলো সম্পর্কে তাকে জানাতে হবে । তাকে শেখাতে হবে কিভাবে ইন্টারনেট থেকে সহজে প্রয়োজনীয় সাইট বা তথ্য খুজে বের করতে হয় । তাছাড়া আপনাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, সে যখনই কোন সমস্যায় পড়বে সে যাতে আপনার কাছে নিদ্বিধায় তা বলতে পারে । তাই সন্তানের সাথে যতটা সম্ভব বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক তৈরী করুন ।
গাইড লাইন তৈরী: আপনার সন্তান কখন ও কতক্ষন ইন্টারনেট বা কম্পিউটার ব্যবহার করবে সেটি সন্তানের মতামত নিয়ে আপনি ঠিক করে দেন । তাদেরকে বলুন তারা অনলাইনে কি কি করতে পারবে এবং কি কি করা উচিৎ নয় । তাদেরকে ফেসবুক, চ্যাটরুম, অনলাইন গেমস ইত্যাদি সম্পর্কে ধারনা দিন । এর সুফল ও কুফল নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করুন । আজকাল ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করার চেয়ে কম্পিউটারে বা ইন্টারনেটে টাইম পাস করতে বেশি প্রেফার করে । সেক্ষেত্রে তাদেরকে বুঝাতে হবে শারীরিক পরিশ্রম যেমন, খেলাধুলা করাটাও কতটা প্রয়োজনীয় ।
আপনার সন্তান যেন আপনাদের (আপনি + আপনার সন্তান) বানানো গাইড সেজন্য প্রয়োজন হলে কিছুটা কঠোরতা অবলম্বন করুন । যেমন: সে যদি আপনাদের (আপনি + আপনার সন্তান) বানানো নিয়ম কানুন অমান্য করে তবে কিছু শাস্তির (যেমন: ৭ দিনের জন্য অফলাইন) ব্যবস্থা রাখতে পারেন ।
নিয়মগুলোর বাস্তাবায়ন করুন: এটা গুরুত্বপূর্ন যে আপনার সন্তান ঠিক মতো আপনাদের বানানো নিয়মগুলো মানছে কিনা তা খেয়াল রাখা ।
খোলামেলা জাগায় কম্পিউটারটি রাখা: আপনার সন্তান যে কম্পিউটারটি ব্যবহার করেন তা যতদূর সম্ভব খোলামেলা জাগায় রাখুন যাতে আপনি ইচ্ছা করলে তার অ্যাকটিভিটিসগুলো দেখতে পারেন । তবে তারও নূন্যতম ব্যক্তিগত বিষয় আছে সেটা সন্মান করুন ।
পড়াশুনা করুন বা অন্যের কাছ থেকে জেনে নিন: আপনার সন্তানকে তার অনলাইন অ্যাকটিভিটিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে যদি এমন কিছু বলে যা আপনি বুঝতে পারছেন না তবে সে সম্পর্কে জেনে নিন । ইন্টারনেটে নিশ্চয় এ বিষয়ে অনেক তথ্য পাবেন ।
সন্তানের সাথে অংশগ্রহন করুন: আপনি যেমন আপনার সন্তানের সাতে ফুটবল খেলেন, দাবা খেলেন তেমনি তাদের সাথে কিছু সময়ের জন্য অনলাইন গেমস খেলেন, তাদের অনলাইন অ্যাকটিভিটিতে অংশগ্রহন করেন । এটা আপনার সন্তানকে আপনার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ন বা বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করবে ।
অনলাইন পেরেন্টিংয়ের বিভিন্ন সফ্টওযার ও কৌশন ব্যবহার করুন: আপনার সন্তান অনলাইনে কি কি করছে, তা দেখা ও কন্ট্রোল করার জন্য বিভিন্ন টুলস রয়েছে; যেমন: উইন্ডোজে রয়েছে প্যারেনটাল কন্ট্রোল, ইন্টারনেট ফিল্টার, ব্রাউজার ফর কিডস । এবিষয়ে খানিকটা আলোচনা করা যাক ।
উইন্ডোজ প্যারেনটাল কন্ট্রোল: আপনি আপনার উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টমে প্যারেনটাল কন্ট্রোল সিস্টেম নামক সার্ভিসটি ব্যবহার করে আপনার সন্তানের অনলাইন অ্যাকটিভিটি ম্যানেজ করতে পারেন ।
প্যারেন্ট কন্ট্রোল
এই সার্ভিসের মাধ্যমে আপনি নিয়ন্ত্রন করতে পারেন
১. আপনার সন্তান কখন ও কতক্ষন কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারবে ।
২. কোন কোন ওয়েব সাইটে যেতে পারবে ।
৩. কোন কোন গেমস খেলতে পারবে ।
৪. কোন কোন প্রোগ্রাম চালাতে পারবে ।

কিভাবে এই সার্ভিসটি সেটআপ করবেন তা জানতে দেখুন
১. Click This Link
২. Click This Link.
বাচ্চাদের জন্য ওয়েব ব্রাউজার: কিডস বান্ধব ওয়েব ব্রাউজার স্বয়ক্রিয় ভাবে কোন ওয়েব সাইটের আন অ্যাপ্রোপিয়েট কনটেন্ট ফিল্টার করে দেয় । এটা ছেলে মেয়েদেরকে তাদের জন্য ইন্টারেস্টিং সাইটগুলোকে সহজেই খুজে বের করতে সাহায্য করে । মূলত এটি ছেলে মেয়েদের জন্য তাদের জন্য উপযোগী ভাবে সবকিছু উপস্হাপন করে । KidZui হলো তেমন একটি ওয়েব ব্রাউজার । আপনি ফায়ার ফক্সের অ্যাডঅন হিসেবেও এটি ব্যবহার করতে পারেন । আরো বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন ।
ব্রাউজার সেটিং : আপনি ইচ্ছা করলে আপনার সন্তান কি কি সাইট দেখতে পারবে আর কি কি সাইট দেখতে পারবে না তা ঠিক করে দিতে পারেন । আরো বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন ।

তাছাড়া আপনি ইচ্ছা করলে ব্রাউজারের হিস্ট্রি, ক্যাশ এবং কুকি দেখতে পারেন । আমি একথা কোনভাবেই বলছি না যে আপনি আপনার সন্তানের উপর অহেতুক নজরদারি করুন । বরং তার স্বাধীনতাকে তার ব্যক্তিগত বিষয়কে সন্মান করুন এবং একই সাথে তার অনলাইন অ্যাকটিভিটিতে চোখও রাখুন । আপনি সার্চ ইন্জিনে গিয়ে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন তারা কি কি করছে ।
সতর্ক হতে হবে কখন : যদি আপনার ছেলে মেয়ে তাদের অনলাইন অ্যাকটিভিটি নিয়ে আপনার সাথে কথা বলতে না চান, আপনাকে দেখলে মনিটর অফ করে দেয় বা স্ক্রিন চেন্জ করে ফেলে । আপনার হঠাৎ উপস্থিতিতে অস্বস্তিবোধ করে । যদি দেখেন তারা মাত্রাতিরিক্ত সময় অনলাইনে থাকছে । আমি বলছি না, এসব করলেই এটা বোঝায় আপনার সন্তান খারাপ কিছু করছে । বরং আমি বলবো এটা নির্দেশ করে আপনার সন্তানের সাথে আপনার খোলামেলা কথা বলার সময় হয়েছে ।
কিছু প্রাথমিক নিরাপত্তা অভ্যাস: আপনার সন্তানেকে কিছু প্রাথমিক নিরাপত্তা অভ্যাস সম্পর্কে অভিহিত করুন । যেমন :
১. কারো সাথে পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না ।
২. পাবলিক প্লেসে পাসওয়ার্ডযুক্ত ওয়েব সাইট (যেমন ফেসবুক) ব্যাবহার যতটা সম্ভব কম করতে হবে ।
৩. পাবলিক প্লেসে কম্পিউটার ব্যবহার করলে অবশ্যই ঠিক মতে সাইন আউট করতে হবে ।
৪. কখনোই শুধু অনলাইনে পরিচিত হয়েছে এমন কারে সাথে দেখা করতে যাবে না । যদি যেতে হয় তবে অবিভাবক কাউকে নিয়ে যেতে হবে ।
৫. কোনভাবেই ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে পাবলিকলি দেয়া যাবে না ।
৬. ইন্টারনেটে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা (যেমন: সাইবার বুলিং) ঘটলে অবশ্যই তা অবিভাবককে জানাতে হবে ।
৭. ইন্টারনেটে কোন কিছু প্রকাশ/শেয়ার করার আগে ভালো করে ভাবে নিতে হবে কারন একবার তা প্রকাশ করে ফেললে তা আর রিভোক করা সম্ভব নয় ।
৮. তাকে অনলাইন প্রতারনা সম্পর্কে ধারনা দিতে পারেন তার বয়সের সাতে সামঙ্জস্য রেখে ।
রিসোর্স: অনলাইন প্যারেন্টিং বা সেফ ইন্টারনেট বিষয়ে বেশকিছু সাইট আছে যা আপনাকে ও আপনার সন্তানকে সাহায্য করতে পারে ।
১. http://www.cybersmart.gov.au/Parents/Guide to online safety/Guide to online safety.aspx
২. http://www.staysmartonline.gov.au/
৩. http://www.cyberpatrol.com/
৪. http://www.netnanny.com/
৫. http://www.cybersmart.gov.au/Young Kids.aspx
৬. http://www.youtube.com/watch?v=H5XZp-Uyjsg
বাবা মা হিসেবে আপনার সন্তানকে নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানানো ও তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা আপনার কর্তব্য । এজন্য তাদের সাথে বেশি বেশি সময় কাটান এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে তোলুন । তাদেরকে এই বিশ্বাস দিন যে তাদের উপর আপনি আযাচিত নজরদারি করছেন না বরং তাদেরকে ইন্টারনেটের অজানা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করছেন । বাবা মায়ের এই প্রয়াস আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক বেশি নিরাপদ ও কার্যকরী করবে । ধন্যবাদ সবাইকে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


