পুরনো এ্যালবাম ঘাটছিলাম । পেয়ে গেলাম আজ থেকে আট মাস তিনদিন আগের একখানা ছবি ।
প্রথম দেখার দিনের ছবি । যখন আমরা দুজনেই বেশ ঝরঝরে ছিলাম । সুখ আমাদের শরীরের মাংসপেশিতে তখনও আস্তানা বাধেনি । ড্রাইভ করে আনতে গিয়েছিলাম তাকে । ভীষণ ভয় আর উত্তেজনা , স্কুলের শেষ পরীক্ষার থেকেও বেশী ।
তাপমাত্রা ছিল সেদিন মাইনাসের অনেক নিচে । তবুও কি ভীষণ ঘামছিলাম আমি । প্রেইরি ল্যান্ডের সোজা রাস্তায় স্টিয়ারিং এ কাঁপছিল আমার হাত ।পাশে তো সে । এক্সিডেন্ট ঘটে যাবে নাতো ।
সেও উঠেছিল জীবনের ঝুকি নিয়ে আমার গাড়িতে । করে গিয়েছিল অনর্গল বকবক যার কিছুই মাথায় ঢোকেনি । সেটা হয়ত আমাকে স্বাভাবিক করতেই । জীবনের ভয় কার না আছে , যদি এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলি । তখনও তো আমাদের জীবনের বিনিময় হয়নি ।
সে আমাকে জীবন দিয়েছিল ডাকোটার এক পার্কিং লটে। আমার পুরো পৃথিবী তখন ঝন ঝন করে উঠেছিল । অনেকটা স্টীলের বাসন পড়ার মত ।সে আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল । পুরুষেরা ছুলে কেমন লাগে , মাথার গনগনে সূর্য কি তখন নরম চাঁদ হয়ে যায় ! সেদিন জেনেছিলাম আমি।
আমিও নিশ্চয়ই মনে মনে খুব চেয়েছিলাম ঝন ঝন করতে । তাই আগের রাতেই হাতে মেহেদী পরা । আমার মেহেদী পরা হাত ছিল তার হাতের মুঠিতে । ছাড়াতে পারিনি আমি । কিছুটা কপট অভিনয়ও করেছিলাম হয়ত ।
সবার চোখের শান্ত নির্বাক ছেলেটি সেদিন বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছিল । কেউ একজন আসছিল , তার চঞ্চল চোখ সে ফিরিয়ে নিয়েছিল ।
আমাদের বাবা-মাও বড্ড চঞ্চল ছিল সেদিন । ওর পৌঁছানোর সময় আগেই তাদের জানা ছিল । মুঠোফোনে কলের পর কল ।
আমরা তো কেউ কাউকে দেখিনি । শখের বশের, সামান্য লেখালেখির অভ্যাস দুজনেরই । একদমই সেটা ছাইপাশ । তবু সেই ছাইপাশ পড়েই তো সে আমাকে খুঁজেছিল । এরকম তো কেউ এর আগে করেনি ।
এরকম বার্তা তো এর আগে আর কখনও আসেনি , “কবিতা চাই “।
ভেবেছিলাম পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি ,অন্তত একজন গুণমুগ্ধ পাঠক , আকালের দিনে পাঠক পাওয়ায় যেখানে ভার । আসল উদ্দেশ্য জেনেছিলাম দু ‘দিন পর । সেদিন রাতে বাইরে জোস্না ছিল কিনা মনে নেই । তবে নিয়ন আলোয় জোস্না নেমেছিল আমার ঘরে ।
সাথে সাথে আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী মাকে জানিয়েছিলাম জোস্না নামার কথা । তিনি জানিয়েছিলেন আপত্তি নেই হয়ত , তবু সন্তানের বিয়ে , খোঁজ খবর করা যাক । ছয়দিন পর শ্বশুর –শ্বাশুড়ী আমাকে দেখলেন স্কাইপে । সব কিছু খুব দ্রুত ঘটছিল যেন । আশীর্বাদ পেয়েছিলাম অনেকের । অনেকে নাক সিটকেছিল , করেছিল বিদ্রুপ ।
ফেসবুকে পরিচয় । সেতো মিথ্যের আর ছলনার আখড়া ।অথচ কি অদ্ভুত, আমার জানামতে আমার তো এরকম একটি বন্ধুও সেখানে নেই ।
আমাদের বাবা –মারা তখন পরস্পরের বাড়ীতে যেয়ে পোলাও বিরয়ানী খেয়ে ফেলেছেন । বিরিয়ানি খাওয়ার সময় হুজুগের মাথায় বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন । সেজ মামা তো বলেই বসলেন এরা আমাদের অতি আপনার লোক , ওদিকে ওর খালুরও একি কথা । আমাদের অমুকের খালার তমুক ওদের চাচার সমুকের অমুক হয় ।
এত পরিচিত লোক ! অথচ আমার জীবনের এতগুলো বসন্ত পেরিয়ে গেছে ।ছেলেটির নামটিও কোনদিন শুনিনি ।
বাবা –মার খেয়াল হয়েছিল অবশ্য বিরানি খাওয়ার পর । ভুল করলেন নাতো ? মান-সম্মান সব যাবে নাকি শেষে । এযুগের ছেলেমেয়ে , দেখে পছন্দ হবে তো ?
আমাদের দুজনেরই এ পৃথিবীর কাছে দাবী ছিল খুব সামান্য । পৃথিবীর সব জোস্নার শুধু একসাথে সাক্ষী হতে চেয়েছিলাম আমরা । রাতে সে একটা টেক্সট করেছিল আমাকে । তারপর জেনে গেছি উত্তরখানা দুজনেই , আমাদের বাবা –মাও ।
আজ আমাদের বিয়ের ছয়মাস পূর্ণ হচ্ছে। এই আমাদের সম্পর্কের গল্প ।
প্রত্যেকটি সম্পর্কের গল্পই তো আলাদা । সেই পজিটিভ আর নেগেটিভ চার্জের মিলে যাওয়া তবু কত আলাদা ভাবে । কত রকম বন্ধন যেন সেই অনেকটা রসায়ন ক্লাসের মত । কেউ এসে তীব্র বেগে মিলে গেছে । কেউ কেউ ধীরে ধীরে । কারো কারো তো প্রভাবক ও লেগেছে । এত ভাল লাগা তবু তৃতীয় শক্তিকে এসে মিলাতে হয়েছে ।
কত রকম গল্প । বিষয়বস্তু একই । তবু কত আলাদা । কত স্পেশাল ।
তাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম আমিতো এখন বেশ মুটিয়ে গিয়েছি । তুমি কি সেই আগের মত করে আর আমাকে নিয়ে ভাবো ......... ?
সে আমাকে বলেছিল সেই প্রথম দিনের মত
“ তুমি আমার কবিতার মত মেয়ে “ ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


