somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে ভরা দৃশ্য দেখলাম। নিজের কলিজার টুকরো, তরুণী মেয়ে কারিনা কায়সারের নিথর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে একজন মাকে বারবার বলতে হচ্ছে—"আমরা চুরি করিনি।আমরা জুলাই যোদ্ধা না। আমরা গণভবনে সেদিন যাইনি। আমাদের কে অপবাদ দেবেন না।" একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষিকাকে যখন নিজের মেয়ের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সততার প্রমাণ দিতে হয়, তখন বুঝতে হবে এই সমাজের কোথাও একটা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেছে।
​ক্যাপ্টেন কায়সার হামিদের পরিবার এদেশের কোনো সাধারণ নাম নয়। এই নামের পেছনে জড়িয়ে আছে এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বলতম ইতিহাস। যার মা রানী হামিদ এই উপমহাদেশের দাবা জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, সারা বিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। কায়সার হামিদ নিজে বাংলাদেশ ফুটবল দলের সাবেক সফল অধিনায়ক এবং কোটি মানুষের প্রিয় তারকা। আর উনার স্ত্রী লোপা হামিদ দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। এই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান কারিনা কায়সার, যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের কনটেন্ট ও অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিত ছিলেন।
​যেকোনো সরকারের পতনের আন্দোলনে যেকোনো নাগরিক অংশ গ্রহন করতে পারে সেটা তার সাংবিধানিক অধিকার। অন্যন্য নাগরিকের মতো সরকার বিরোধী আন্দোলনে এই পরিবারেরও সংহতি প্রকাশের অধিকার ছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, ভাংচুর করা এগুলো ফৌজদারী অপরাধ। এই পরিবার সেই ফৌজদারী অপরাধ কে উপজীব্য করে উৎসাহিত করে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করেছিল।
কিন্তু ৫ই আগস্টের পর গণভবনে সাধারণ মানুষের প্রবেশের স্রোতে গা ভাসিয়ে এই পরিবারটি যে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করেছিল, তা এক চরম ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। হয়তো নিছক কৌতূহল বা দুষ্টুমির ছলে, আনন্দের আতিশয্যে তারা সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। কিন্তু একটি সম্ভ্রান্ত ও সমাজকে পথ দেখানোর মতো পরিবারের কাছ থেকে সংকটকালীন মুহূর্তে এই ধরনের অপরিপক্ব আচরণ কাম্য ছিল না।

​যে সময়ে রাষ্ট্র অভিভাবকহীন, যখন চারদিকে থানা, উপজেলা, ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে একদল সুযোগসন্ধানী লুটেরা তাণ্ডব চালাচ্ছিল—তখন সমাজের আইকনদের প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল সতর্ক ও দায়িত্বশীল। দেশের সম্পদ রক্ষা করা, আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের সেই আনন্দঘন ভিডিওটি অবচেতনভাবেই হোক কিংবা পরোক্ষভাবে, সাধারণ অপরাধপ্রবণ মানুষকে এক প্রকার লাইসেন্স বা উৎসাহ জুগিয়েছিল। সাধারণ মানুষ ভেবে বসেছিল—কায়সার হামিদের মতো পরিবারের মানুষেরা যদি সেখানে যেতে পারে, তবে আমাদের অপরাধ কোথায়? এই মনস্তত্ত্ব ফৌজদারি অপরাধকে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক করে তোলার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

​আজ সেই ভুলের, সেই সাময়িক অসতর্কতার এক চরম এবং নির্মম প্রায়শ্চিত্ত করতে হলো পরিবারটিকে। চোরের অপবাদ যে কতটা ভারী, চোরের অপবাদ যে কতটা কলঙ্কজনক—তা আজ একটি সম্ভ্রান্ত পরিবার তাদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তারা আজ চিৎকার করে বলছেন তারা লুণ্ঠন করেননি, কিন্তু ডিজিটাল যুগের নির্মম বাস্তবতা হলো—ভিডিওর সেই ফ্রেমগুলো সমাজ সহজে ভুলে যায়নি। কোথায় থামতে হবে, আবেগের রাশ কোথায় টানতে হবে—এই বোধটুকু সময়মতো জাগ্রত না হলে নিয়তি কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, কারিনার অকাল মৃত্যু আর তার মায়ের এই আর্তনাদ আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল।
​সবচেয়ে ঘৃণ্য ও কুৎসিত বিষয় হলো, এই লাশের রাজনীতি। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিবর্গ আজ 'জুলাই বিপ্লব'কে নিজেদের পকেটে পুরে আখের গোছাতে ব্যস্ত, যারা সাধারণ মানুষের এই তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণাকে সস্তা চশমা দিয়ে আড়াল করতে চায়, তারা আজ সহমর্মিতার ভান করে কায়সার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে আসছে। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়ার পর, তাদের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা নতুন করে নিজেদের স্বার্থের 'ধান্ধাবাজি' করতে চায়, তাদের প্রতি রইল তীব্র ধিক্কার ও ঘৃণা। এরা সহমর্মী নয়, এরা লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়া রাজনীতির শকুন।
​কারিনা কায়সারের এই অকাল ও রহস্যময় চলে যাওয়া এবং তার পরবর্তী জানাজায় পরিবারের এই আকুতি আমাদের সমাজের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আভিজাত্য কিংবা তারকাখ্যাতি কোনো কিছুই সমাজের কাছে দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।
​আমরা কারিনা কায়সারের আত্মার শান্তি কামনা করছি। ভুলভ্রান্তি ও অপবাদের ঊর্ধ্বে উঠে পরম করুণাময় যেন তাকে ক্ষমা করেন। আর তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দগ্ধ এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। এই নির্মম ট্র্যাজেডি যেন আমাদের সবাইকে আবেগ আর বিবেকের মধ্যকার সীমারেখাটা চিনে নিতে শেখায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৪
৬টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হাতছানি

লিখেছেন আহমেদ রুহুল আমিন, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:২২

বাঁশবনের উপরে গোধূলীর আকাশে
কি'যে অপরুপ লাগে একফালি চাঁদ,
কাশবনের দুধারে মৃদুমন্দ বাতাসে
ঢেউ খেলে যায় সেথা জোৎস্নার ফাঁদ-
আহা..., কী অপরুপ সেই 'বাঁশফালি চাঁদ' ।

পাখিদের নীড়ে ফেরা কল-কাকলীতে
শিউলী-কামিনী যেথা ছড়ায় সুবাস,
আজানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিচ্ছু চাই না আমি, আজীবন ভালোবাসা ছাড়া!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:৫১



অতি তুচ্ছ বিষয় গুলোতে আমি আনন্দ পাই।
পথে ঘাটের সব রকম দৃশ্য আমি উপভোগ করি। পথে হেটে যাচ্ছি, একসাথে অনেক গুলো কাক কা কা করতে করতে উড়ে গেলো! এটা দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভবিষ্যতের স্পষ্ট বার্তা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:১৭



কারিনা ইস্যুতে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের আত্মপক্ষ সমর্থন না- এটা জনমতের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই হেটস্পিচ আসতো, তাহলে কারিনার মা জানাজার পর... ...বাকিটুকু পড়ুন

রক্তের দাগে ধুয়ে যাওয়া আভিজাত্য: কারিনা কায়সারের বিদায় এবং আমাদের কিছু নির্মম শিক্ষা

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯



​বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত নিয়মে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ সব বৈরিতা ভুলে যায়। জানাজার খাটিয়া সামনে রেখে স্বজনরা কেবল ক্ষমা চান, চিরবিদায়ের প্রার্থনা করেন। কিন্তু গতকাল আমরা এক অভূতপূর্ব ও হাহাকারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

×