somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরীচকাি ও নক্ষত্র

২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছে নিল। তারপর সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল, "নীল, আমি প্রেগন্যান্ট!"
আমি তখন চায়ের কাপে সবেমাত্র একটা অসতর্ক চুমুক দিয়েছি। গরম তরলে জিবটা পুড়ে যাওয়ার তীব্র অনুভূতিতে মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেলাম। তূণীর কথাটা যেন ঠিক কানে পৌঁছাল না। আমি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে টেবিলের ওপাশে থাকা জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়ালাম। কিন্তু তূণী আমার কাঁধ ধরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, "কী বলছি, শুনতে পাচ্ছিস?"
আমি শূন্য দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম। "কী?"
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বুকটা সামান্য কেঁপে উঠল ওর। বলল, "দুই মাস হলো। আমার ভেতরে অনিমেষের সন্তান।"
আমি তূণীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই সেই তূণী—আমার শৈশবের প্রথম যৌথ খাতার পাতা, আমার কৈশোরের অবাধ্য রোদ। প্রতিদিন অভিমানে ঠোঁট ফোলানো সেই মেয়েটা, যে দুটো বেণী দুলিয়ে আমার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে স্কুলে যেত। যার সম্মানের জন্য পাড়ার বখাটেদের সাথে মারামারি করে একবার ডান হাতটা ভেঙে প্লাস্টার করিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে না পেরোতেই সেই শান্ত, চঞ্চল মেয়েটা আজ এই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি?
আমার চোখের সামনে অনিমেষের চিবুক ভাঙা, খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা মুখটা ভেসে উঠল। সেই ধূর্ত, কুতকুতে, সন্দেহপ্রবণ চোখ দুটো যেন আমাকে দেখে উপহাস করছে।
আমি কি তূণীকে ভালোবাসতাম? কোনোদিন নিজেকে এই প্রশ্নটা করার সাহস পাইনি। ওর সাথে প্রেম করার চিরাচরিত ধারণাটা কখনো আমার মস্তিষ্কে প্রশ্রয় পায়নি। ওর প্রতি আমার অনুভূতিটা হয়তো প্রচলিত 'ভালোবাসা' শব্দের চেয়েও অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি পবিত্র ছিল। সারাটা জীবন আমি সেই অনুভূতিকে খুব সাবধানে, একটা গোপন সিন্দুকে আগলে রেখেছি। কিন্তু আমি সবসময় ছিলাম। তূণী যখনই ডেকেছে, কোনো শর্ত ছাড়া, কোনো অজুহাত ছাড়া আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি ছিলাম ওর জীবনের সেই ধ্রুবতারা, যে অবলীলায় ওকে সমর্থন জুগিয়ে গেছে।
ও যখন ঢাকার বাইরে একটা নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে গেল, আমার বুকের ভেতরটায় একটা চাপা কষ্ট দলা পাকিয়েছিল। ও যখন একদিন লাজুক হেসে ফোনে বলেছিল, "জানিস নীল, আমি না একজনের সাথে জড়াচ্ছি," তখন একটা হালকা ধাক্কা খেয়েছিলাম। পরে ফেসবুকে ওদের যুগল ছবিতে হাহা-হিহি করে শুভেচ্ছাবার্তাও দিয়েছিলাম। তখন তো এতটা পুড়ে যাইনি। তবে আজ কেন ভেতরটা কয়লার মতো দাউদাউ করে জ্বলছে?
সেদিন রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে নিজেকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। আমি কি তবে ঈর্ষাকাতর? অনিমেষের প্রতি তীব্র কোনো আক্রোশ? আমি কি মনের অজান্তে কল্পনা করছিলাম—অনিমেষ কীভাবে চরম তৃপ্তিতে তূণীর ওই সুকোমল, অনাস্বাদিত শরীরটাকে নিজের করে ভোগ করেছে? তূণীর সেই চেনা কণ্ঠের তীব্র উত্তেজনা কি আমার কানে বাজছিল? নাকি আমার ক্ষোভের আসল কারণ অন্য কোথাও—যেখানে অনিমেষের জায়গায় একটু সাহসী হলে আমি নিজেও থাকতে পারতাম?
আচ্ছা, ওদের স্বাভাবিক নিয়মে বিয়ে হওয়ার পর যদি বাচ্চা হতো, আমার কি খারাপ লাগত? না, লাগত না। আমি হয়তো আনন্দেই মাতোয়ারা হতাম। আসলে, সামাজিক স্বীকৃতির আগেই একটা ছেলে আমার এত কাছের, এত পবিত্র একটা মেয়েকে এভাবে অধিকার করে নিল—এই আদিম পরশ্রীকাতরতা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। রাগে-ক্ষোভে দেয়ালটাতে একটা ঘুসি মারতে ইচ্ছে করছিল।
অথচ, ক্যাফেতে বসা তূণীর চোখে-মুখে আমি সেদিন কোনো অপরাধবোধ বা দ্বিধা দেখিনি। ওর মুখে কেমন একটা অদ্ভুত, মায়াবী আভা ছিল। সেটা কি মাতৃত্বের অহংকার? এই বয়সে, এই পরিস্থিতিতে তা কীভাবে সম্ভব?
আমি শুষ্ক গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, "কীভাবে এটা হলো তূণী?"
"কীভাবে আবার কী হবে?" ও অবাক হওয়ার ভান করল।
"মানে... অনিমেষ কি তোকে জোর করেছিল?"
"না।"
"না?"
"উঁহু। ও তেমন ছেলেই না।"
"তাহলে?"
"আমিই ওকে চেয়েছিলাম। ওর পুরোটা। ছেলেটা আমাকে বড্ড ভালোবাসে রে, নীল।"
"ওহ। তা... এখন কী করবি?"
"কী আবার করব? অনিমেষ খুব শিগগিরই ওর পরিবারকে আমাদের বাসায় পাঠাবে। দুই মাসের মধ্যে বিয়ের ধুমধাম শেষ করে ফেলব, বুঝলি? আর হ্যাঁ, তুই হবি আমার বিয়ের প্রধান অতিথি। তোকে অন্তত এক সপ্তাহ আগে এসে আটকে থাকতে হবে, কোনো অজুহাত শুনব না!"
আমার সেই এক সপ্তাহ আর কোনোদিন আসেনি। তবে একটা রাত হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে। মর্গের ঠান্ডা করিডোরে দাঁড়ানো সেই অভিশপ্ত রাত।
পাঁচতলার ছাদ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মেয়েটা কী ভেবেছিল? আমি এখন প্রায়ই নিঝুম রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সেটা ভাবার চেষ্টা করি। একটা সম্পর্ক যে কয়েকটি অদৃশ্য সুতোর ওপর টিকে থাকে, তার সবচেয়ে প্রধান সুতোটির নাম বোধহয় 'রহস্য'। সামাজিক ও আত্মিক বন্ধনের আগেই যদি লালসার সবটুকু উজার করে দেওয়া হয়, তবে অনেক পুরুষই সেই নারীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আনন্দ-উল্লাসের জোয়ার ফুরিয়ে গেলে, যখন কঠিন দায়িত্ব নেওয়ার সময় আসে, তখন কাপুরুষেরা সুকৌশলে গা ঢাকা দেয়।
আর কত হাজার বার এই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের চারপাশের তূণীরা তা বুঝতে পারবে, আমি জানি না। বারবার একই ভুল, আর ভুলের মাশুল দিতে হলো আমার শৈশবকে। ও বিদায় নেওয়ার আগে কাউকে কিছু বলে যায়নি, কোনো সুসাইড নোট রেখে যায়নি।
অনিমেষ হয়তো এখন অন্য কোনো শহরে, নতুন কোনো 'তূণী'র হাত ধরে ক্যাফেতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। আর আমি?
আমি আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বন্ধুটিকে এখন মাঝরাতে ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে তারাদের ভিড়ে খুঁজি। একসময় গভীর রাতে ও যখন খুব মন খারাপ করে ফোন দিত, বলত—"এই হারামি, ছাদে আয় না! দেখ, আকাশ ভেঙে তারা খসছে, কী সুন্দর!"
আমার আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটা যে সেদিন রাতে খসে পড়ে মাটির বুকে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, তার খবর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর কেউ রাখেনি।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:২৫
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানেনা

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪২


কেউ জানেনা
আমার একটা জগৎ আছে,
খুব গহীনে, সংগোপনে,
বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা
একটা জগৎ....
নিজের জগৎ, নিজের মত
আমার একটা জগৎ লাগে।

রোজ বিকেলে কাজের পরে
একটু যখন অবসরে,
একটু সময় চায়ের কাপে
নিজের মত, নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদীরের জুলাই আন্দোলন: কারণটা কি একান্ত ব্যক্তিগত ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:০১


সালমান মুক্তাদীর বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েশন জগতের পথিকৃৎ। তার হাত ধরে এদেশে কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে কত তরুণ, তার কোনো হিসাব নেই। তার ভক্তের সংখ্যা অগণিত। তবে কাজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে পর্ণ এটাকের জনককে পাওয়া গিয়েছে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:০৮



ব্লগার চারাগাছ সামুতে মডারেটর নেই বলে সন্দেহ করছেন। নিজের ধারণা পাকাপোক্ত করতে সামুতে পর্ণ এটাকের প্ল্যান করছেন। ইহা কি ব্লগার?

সামুতে পর্ণ এটাকের কারণে পর্ণ সাইটের ধুয়া তুলে বিগত সরকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×