তুমি আসছো, আনন্দে তাই
খুলিনি নতুন শাড়িটির ভাজই।
এইমাত্র জেনেছি, তুমি আসছো
এখনও তুমি পড়ে আছো আমার জরায়ুর কোনও এক কোণে
অথচ তুমি ছিলে, সুপ্ত
আজ তুমি হলে, উপ্ত (যা বোনা হয়েছে)
আজ ছাবি্বশে মার্চ, তুমি জন্মানোর ঠিক আগ মুহূর্তে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওরা, সশস্ত্র
অপ্রস্তুত ঘুমন্ত্র বাঙালি, নিরস্ত্র
এসো, তোমায় সেই গল্প শোনাই
ব্যাধের শিকারের নেশা, রক্ত চাই লাল তাজা রক্ত
জলপাই রঙা ট্যাঙ্ক
সবুজ মর্টার
দ্রিম দ্রিম ছুটে আশা শেল
মাটি চাই, মানুষ চাই না ওদের
ওদের কাছে মানুষের লিস্ট আছে
সেই লিস্ট হাতে নিয়ে ওরা মানুষ মারে
রাজসূয় কিংবা অশ্বমেধ নয়
এ মানুষ-নিধন যজ্ঞ, বাঙালি হত্যা-যজ্ঞ
তারপর, তারপর কি হলো?
নেতাকে ওরা নিয়ে গেলো
যাবার আগে নেতা দিয়ে গেলেন নির্দেশ
তোমাদের কাছে অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে
দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে
তাই নিয়ে শত্রম্নর মোকাবিলা করো
আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো
আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আর আমাদের
দাবায়ে রাখতে পারবা না।
রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো
এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশালস্নাহ্
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম আমাদেও স্বাধীনতার সংগ্রাম
জয় বাংলা।
তোমার মতো বাংলাদেশ নামে যে ভ্রম্নণ ছিল জাতির জঠরে
সেদিন তার অবয়ব হলো
সেদিন তার কায়া দাঁড়ালো
তাজা রক্তে তার হলো সূর্যস্নান।
আজ তোমার বয়স প্রায় এক মাস
আমি তোমায় এখন এক আম বাগানের কথা বলবো
যে খানে একদিন, অসত্দমিত হয়েছিল স্বাধীনতা
তারপর সেই স্বাধীনতা নিতে কতো শকুন এলো
তাদের ডানায় শবের গন্ধ
তাদের ঠোঁটে শুকনো রক্ত, পঁচা মাংস
তারা ঠুকরে খেয়েছে
তারা খুবলে খেয়েছে
তারা অাঁচড়ে উপড়ে নিয়েছে
তারা ব্যবচ্ছেদ করেছে মানচিত্র
এক বুড়ো শকুন পাতলুন পরে
শরাব পিয়ে ধর্মের কুলকুচি করে
নতুন এক দেশ দিলো
সে দেশ পোকায় কাটা
সে দেশ বাজে পোড়া
সে দেশ ফুটি ফাটা
রাজা গেলো রাজা এলো
ৰমতা খাকি বর্গিরা নিলো
পূব থেকে পশ্চিমে
সব যায় লুট হয়ে
পূবে মানুষ মরে
পশ্চিমে ইমারত গড়ে
পূবের ধান পূবের পাট
পশ্চিম নিলো করে লুটপাট
পূব পায় এক তো পশ্চিম পায় নয়
এতো বৈষম্য কি আর বাঙালি সয়?
তারপর সেই আম বাগানে রচিত হলো নতুন কাব্য এক
যার নাম বাংলাদেশ। এ মঙ্গলকাব্য নয়, নয় চর্যাপদ
নয় এ চতুর্দশপদী, নয় কোনও হাইকু
মহাকাব্যের বৈদুর্যও মস্নাণ হয় এর বর্ণচ্ছটায়
আর কোটিপ্রাণ সমস্বরে উচ্চারে যার প্রতিটি শেস্নাক।
তোমার বয়স আজ সাতমাস
আমার ফোলা পেটে হাত রেখে তোমার স্পর্শ পাই
তোমার বিদ্রোহী পা আমার গর্ভের শরীরে দেয়
গর্বের লাথি। তুমি কি জানো, তোমারই মতো বাংলা মায়ের
গর্ভে যে বীজ সেদিন লালিত হচ্ছিলো তারাও এমন করে
পাকিসত্দানীদের হত্যা করেছে, তোমাকে যেমন মেরে ফেলতে
নষ্ট করে দিতে বাইরে ঘুরছে বদ-বাতাস তেমনই ওই পশুরাও
বাংলার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বিশাল গর্ভাধারে
কখনও ট্যাঙ্ক নিয়ে কখনও কামান কখনও গানবোট নিয়ে
গর্ভনষ্টের তাণ্ডব চালিয়েছে, জ্বালিয়েছে আগুন
ধরে নিয়ে গেছে কুমারী যুবতী অথবা ঋতু দেখা-না দেখা নারী
কুরক্ত ঢেলেছে, দাঁতে ছিঁড়েছে মানচিত্রের সত্দন
অথচ কি প্রতিবাদী, কি এক প্রগতিতে তাদের চিত্ত ছিল স্থির
বর্ষা কেটে যায়, শরত আসে কাঁশের বনে
দানবদলনী দূর্গা আসেন মর্তে, সৃষ্টির পালনে
মা হয়ে তিনি সইতে পারেন না আরেক মায়ের কষ্ট
তার খড়গ কুপিত হয় হানাদারের ওপর
তার ত্রিশূল নিৰিপ্ত হয় পিশাচের ওপর
তার শংখগদাচক্র একত্রিত হয়ে ছুটে যায় বাজের মসত্দক লৰ্য করে
বিদীর্ণ হয় ওরা
জীর্ণ হয় ওরা
শীর্ণ হয় ওরা যেনো হেঁজে-মজে যাওয়া নর্দমা
বিবমীষা হয় ওদের দেখে
ঘৃণার থুথু নিৰিপ্ত হয় ওদের মুখে
অস্ত্রের জোরে ইতিহাস বদলের পাপ
অভিশাপ হয়, ওরা তাতে জ্বলেপুড়ে খাক্ হয়।
আজ তুমি পৃথিবীতে আসছো
আমি বুঝতে পারি, চিরচিরে ব্যাথা অহসনীয়, অথচ
কতো আনন্দের। তুমি আসছো, জানো তোমারই মতো
সেও এসেছিল, একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ব্যাপী গর্ভ বিদীর্ণ করে সেও
তোমারই মতো এসেছিল, ভ্থমিষ্ঠ হয়েছিল রেসকোর্সের ময়দানে
বিশ্ব তাকিয়ে ছিল, কি মহান ছিল সেই জন্ম
আর সেই তীব্র আকাঙ্খার, তীব্রতর কামনার
পবিত্র সনত্দানের নাম কি ছিল জানো?
স্বাধীনতা স্বাধীনতা স্বাধীনতা স্বাধীনতা।
পৃথিবীতে আসার আগেই তোমায় শুনিয়ে দিলাম সেই মহাকাব্য
যে নাড়ী তোমায় জুগিয়েছে খাদ্য, জেনো তাতে ছিল মুক্তিযুদ্ধের রসদ
যে শোনিত তোমায় করেছে পুষ্ট, জেনো তা মুক্তিযোদ্ধার
তুমি ভুলো না, কখনও বিচু্যত হয়ো না
তোমার সামান্য অবহেলায় স্বাধীনতার সতেজ সবুজে
বসবে পঙ্গপাল, ধ্বংস করবে নিঃশ্চিহ্ন করবে হত্যা করবে
মনে রেখো, তুমি পাণ্ডব নও, তুমি কর্ণ কিবা দুর্যোধন হয়ো
বিনা যুদ্ধে দিও না স্বাধীনতার সূঁচাগ্র ভ্থমি
জেনো সেটুকুই তোমার মায়ের শরীর আব্রম্ন সম্মান
এও যেনো যে মা জন্ম দেয় তারই অধিকার বিনাশে
এই সত্য জেনে, এই তথ্য জেনে তুমি এসো
রক্তের অবিরাম ধারার সঙ্গে তুমি এসো পৃথিবীতে
আমি তোমায় বহনকারী ফুল পুঁতে দেবো এ মাটিতে
স্বাধীনতা যাকে পবিত্রতম করেছে - মনে রেখো এর কাছেই তোমার জন্মঋণ
(26শে মার্চ 2006)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



