দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে অর্ধ শতাব্দীরও আগে, কিন্তু এখনও যে সব দেশ আক্রানত্দ হয়েছিল কিংবা সশস্ত্র বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল তারা সেই জ্বলজ্বলে ৰত (মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ের দগদগে ৰত আবার আমাদের তরম্নণ প্রজন্মের হৃদয়ে কোনও ব্যাথাই জাগায় না, তারা ব্যাথা-বিমুখ) এখনও শুধু বয়েই বেড়ায় না, তা জনসম্মখে প্রকাশ করে গর্বের সঙ্গে। পূর্ব ইউরোপিয় দেশগুলিতে যারা গিয়েছেন তারা দেখতে পাবেন প্রতিটি ছোট্ট শহরেও দ্বিতীয় বিশ্বুযুদ্ধের স্মৃতির মিনার, শিখা অনির্বাণ। এমনকি যারা জার্মানীতে আছেন তারাও দেখবেন যে, হিটলারের সেই আগ্রাসী আর হত্যা-তিয়াস তাদেরকে কতোখানি নতজানু করে রেখেছে। এখনও এসব দেশগুলির স্কুলের পাঠ্য বইতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূল। পোল্যান্ডের সপ্তম শ্রেণীর স্কুলপাঠ্য বইয়ের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি ক্রাকাউ শহরে হিটলারের ইহুদি-নিধনের ওপর। এখনও এইসব দেশের অধিকাংশ সাহিত্য, কবিতা আর সিনেমা নির্মিত হচ্ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে ঘিরে। যারা জার্মানীতে রয়েছেন তারা গত বছর বার্লিনের থার্ড রাইখ খ্যাত ভ্থগর্ভস্থ বাঙ্কারে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের শেষ দিনগুলি নিয়ে নির্মিত ডাউনফল ছবিটি দেখে থাকবেন। এই ছবিটিতে নাৎসিদের প্রতি কৌশলে মমত্ব প্রদর্শন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে, রাশিয়া সহ পুরোনো সোভিয়েত দেশগুলি এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছবিটিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি ব্রিটেনেও ছবিটি হলে প্রকাশের আগে একটি তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, এই ছবির বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং আপনার বিবেকের বিবেচনায় এটি দেখার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ, এরই মাঝে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীরা জাতীয় পতাকার দখল নিয়েছে আর যুদ্ধোত্তর প্রজন্মকে পেয়ে বসেছে ইতিহাস-বিমুখতায়। এখনও পর্যনত্দ বেঁচেবর্তে আছে মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম, তাই তারা এর ইতিহাস নিয়ে অবশ্যই টানাটানি করবেন, সেটাই সঙ্গত। এখনও পর্যনত্দ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি বড় নিয়ামক, এটাই সত্য কারণ শিৰিত ও বিভ্রানত্দ প্রজন্মের কাছে এর আবেদন না থাকতে পারে কিন্তু তারাই তো বাঙালি জাতির সর্বাংশ নয়, কিয়দংশ মাত্র, সবচেয়ে বৃহৎ যে অংশটি এখনও থাকে গ্রামে, যাদের কাজ এই কিয়দংশের মুখের গ্রাস জোগানো, দেশটির অর্থনীতি সচল রাখা - তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব সীমাহীন। কারণ তাদের স্বজন হারানোর ৰতটি এখনও দগদগে, কিশোর বাবা কিংবা কিশোরী মায়ের লাল শাড়ি না হারানোর কষ্ট দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে জানা কারো মুখ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই বেরিয়ে আসবে মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার কথাই কারণ এদের কাছে শহুরে চাকচিক্য, বিলাসি জীবন আর সেই সঙ্গে সেই জীবনের অর্জিত পাপৰয়ের জন্য ধর্মটাই আসল, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জাতীয় ইতিহাসের আলোচনা 'কিইশে' লাগাটাই স্বাভাবিক।
শেষকথার শেষ কথাটি হলো, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মাত্র পয়ত্রিশ বছরের নয়, আটচলিস্নশে ভাষার দাবীতেও যদি এর শুরম্ন হয় তাহলে হিসেব কষে বের করুন এর বয়স কতো?
পুনশ্চ ঃ হাজার বছরের বাঙালি ইতিহাস ঘেঁটে দেখার সময় থাকলে সেখানেও ঝাঁক মেরে দেখুন, বাঙালি স্বাধীন কখনও ছিল না, ইতিহাসের এই উপাত্ত জানা না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ-বিমুখতা আসবেই, আসতে বাধ্য - দোষ আসলে কারো নয়, দোষ বাঙালি জাতির কপালের!!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



