26শে মার্চ ইয়াহিয়া খান পাকিসত্দান রেডিওতে পাকিসত্দানী জাতির উদ্দেশ্যে (এরকম কোনও জাতি আদৌ আছে কি না সেটা আজকের পাকিসত্দানীরাও জানে না) ভাষণে বলেছিল, "শে মুজিবুর রহমানের অসযোগ আন্দোলন ছিল দেশদ্রোহীতা। সে আর তার দল তিন সপ্তাহব্যাপী পাকিসত্দানী কতর্ৃপৰকে অস্বীকার করেছে। তারা সন্ত্রাস করে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। সে যে ঘোষণাসমূহের প্রসত্দাব করেছিল তা নিছক ফাঁদ। তার জানা ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলে এগুলো শুধু কাগুঁজে ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। প্রকৃতপৰে তখন পূর্ণভাবে স্বাধীন ৰমতা প্রতিষ্ঠা করতো। তার ঔদ্ধত্য, একগুয়েমি ও কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ একটি শর্তই পূরণ করে আর তাহলো ওই ব্যক্তি ও তার পাকিসত্দানের শত্রম্ন, কারণ তারা পাকিসত্দান ভাঙতে চায়। তারা পূর্ব পাকিসত্দানকে সার্বিক ভাবে স্বাধীন করতে চায়। সে ট্রেটর, এই অপরাধ উইল নট গো আনপানিশড" _ পাকিসত্দানী সামরিক জানত্দা এমনকি সাধারণ মানুষের মনের কথাই ছিল এটি, এমনকি আজও পয়ত্রিশ বছর পরেও এর হেরফের হয়নি। আশ্চর্য লাগে ভাবতে যে, স্বাধীন বাংলাদেশে এই পঁয়ত্রিশ বছর পরেও একটি গোষ্ঠী ইয়াহিয়ার ভাষাতেই কথা বলে, তার মানে কি এটাই যে, বাঙালিকে আবার এই পাকিপন্থী বাঙালির বিরম্নদ্ধে অস্ত্র ধরতে হবে?
তিন আর ত্রিশে এখানে বেশ হচ্ছে দেখে মনে হলো আজ যারা তিন নিয়ে কথা বলছে তারা জানে না যে, ত্রিশ লাখের মধ্যে নিহত হিন্দুর তালিকা দীর্ঘ। আর বাংলাদেশের নয়া-মুসলমানেরা জৈষ্ঠ মাসে নতুন পানি পাওয়া হাঁসের মতোই খলবল করে নিজেদের অতি মাত্রায় মুসলমান প্রমাণ করে লাখে লাখে হিন্দুদের এই দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো, ৰতিগ্রস্থ হওয়া কিংবা ধর্ষিতা হিন্দু নারী নেই আজ বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে সাৰ্য দেওয়ার জন্য - আর এই সুযোগে পাতি শেয়ালেরা প্রশ্ন তুলছে। এক শেয়াল বলছে, " ক্যায়া হুয়া, ক্যায়া হুয়া?"
উত্তরে আরেক শেয়াল বলছে, "হুক্কা হুয়া, হুক্কা হুয়া"।
দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেও যেখানে দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ছিল প্রায় মোট জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা এসে ঠেকেছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত শতাংশে। এই তথ্য মনগড়া নয়, বাংলাদেশের আদমশুমারী দেখেই সেটা যে কেউ প্রমাণ করতে পারেন। প্রশ্ন হলো, কেউ মারা গেলে তার তো একটা নথি থাকবে, অথবা কেউ নিখোঁজ হলে থানায় তা নিয়ে মামলা হবে, রেকর্ড থাকবে, কিন্তু এই যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবিশ্বাসীদের একটি বিরাট অংশ দেশ থেকে কোনও কারণ ছাড়াই নিখোঁজ হলো, তার কিন্তু কোনও রেকর্ড নাই। বিষয়টি স্যাটায়ার করে হয়তো আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর বংশবৃদ্ধির ৰমতা লোপ পেয়েছে!! কিন্তু সেটা যেমন সত্যি নয়, তেমনই এটাই ধ্রম্নব সত্যি যে, তারা নিখোঁজ হয়েছে। ঢালাও ভাবে কেউ বলবেন যে, তারা ভারতে চলে গেছে; কিন্তু প্রমাণ আর এর পেছনে কারণ না উলেস্নখ করে ভারত যাওয়া নিয়ে সন্দেহ করার অধিকার যে কোনও গবেষকের রয়েছে এবং থাকবে।
আমি বিশ্বাস করি, সুমন চৌধুরীর আলোচ্য দ্বি-জাতি তত্ত্ব আর আমাদের আজকের বাঙালি-বাংলাদেশী বিতর্কের মাঝেই রয়েছে এর উত্তর। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশী হিসেবে জাতীয়তার সারকামসাইজড্ করা হয়েছে, তারপর এখন ধীরে ধীরে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং এরপর আসত্দে আসত্দে বাংলাসত্দানে বিশ্বাসী হওয়ার দাবি উঠবে এবং তারপর কি হবে সেটা ভবিতব্যই জানে।
তাই এই মুহূর্তে এটাই বাসত্দবতা যে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরে একচোখা জিন্নার দ্বি-জাতি তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ করলেও সেই বিষবৃৰের ফল বাঙালি এখনও খেয়ে চলেছে, জেনে এবং না জেনে; তিন আর ত্রিশ লাখের প্রশ্নটা তাই এই গাছেরই বীজদের মুখেই আমরা শুনি। এই রক্তবীজের বংশধরেরাই মারের হুমকি দেয়, রগ কাটে, জবাই করে, বোমা মারে, বাংলাকে আফগান বানাতে চায়; এটা করতে পারলে তাদের সুবিধা কি জানেন? তারা তখন ধর্মের তাবিজ বেচতে পারবে দুই হাতে, নইলে রাষ্ট্র ৰমতা দিয়ে একজন প্রকৃত ধার্মিকের কি দরকার? কবরে তো আর ৰমতা যাবে না, কিন্তু তারা তো পার্থিব ৰমতায় বিশ্বাস করে, পরকালে তাদের বিশ্বাসই নাই, নইলে নিজামী কিংবা মুজাহিদ ইমাম হইয়া জুম্মার নামাজ পড়াবে, মানুষরে ধর্মের বাণী শুনাবে আর দিন শেষে এক গৃহসত্দের বাড়িতে খানা খাইয়া, দাঁড়ি চুলকাইতে চুলকাইতে গিয়া বউয়ের সঙ্গে বিছানায় ঢুকবে, আর বছর বছর আলস্নায় তাগোর ঘরে 'মাল' দেবে _ কিন্তু তারাতো তা করছে না, তারা ৰমতা চাইতেছে, একাত্তরে চেয়েছিল, পায় নাই; এখন আবার চাইতেছে, এবং ৰমতার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতাছে।
অবশ্য এসব নিয়ে কথা বললেই, আমাকে পায়ে পা পঁ্যাছিয়ে (?) ঝগড়া করার অপরাধে অপরাধী করে বস্নগ-গড়ায় তুলবেন। কিন্তু তাতে আপত্তি নাই, কারণ আমি জানি যে, এখনও পর্যনত্দ বঙ্গপুঙ্গবের অনেকেরই সেই বুকের পাটা হয়নি, যে বুকের পাটায় কোনও নারীর যুক্তিকে শুধু যুক্তি হিসেবে দেখতে পাবেন। একই প্রশ্ন, একই যুক্তি কোনও পুরম্নষ তুললে সেটা হয়ে যায় তর্ক কিংবা বিতর্ক, কিন্তু সেটা কোনও মেয়ে তুললে হয় ঝগড়া। আমি সেই ঝগড়ুটে-র খেতাব মাথা পেতে নিলাম কিন্তু তাতে কি সত্য মিথ্যা হবে? হবে না।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




