রবীন্দ্রনাথের কবিতায় চোখ পড়লে প্রথমেই যে দৃশ্যকল্প আমাদের টানে তা হলো ভাব, ভাষা ও ভাবাবেগের অপরূপ মেলবন্ধন। তারপর যদি কেউ আরও একটু গভীরে তলিয়ে যেতে চান, তাহলে তিনি এই অতলানত্দে ডুবে গিয়ে কুড়িয়ে আনতে পারবেন তার যা ইচ্ছে তাই, মুক্তো হলে মুক্তো, প্রেম হলে প্রেম, প্রকৃতি হলে প্রকৃতি কিংবা তার কাঙ্খিত ঈশ্বর। এই অচতৈন্যে ডুবে যাওয়ার কোনও কানত্দি নেই, নেই শ্বাসরম্নদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কিংবা তেমন সম্ভাবনাও নেই যে কেউ খালি হাতে এই মগ্নচৈতন্য থেকে ফিরে আসবেন। রবীন্দ্রনাথ পাঠে এইখানেই প্রশানত্দি, এখানেই কানত্দিহরা দীর্ঘ প্রণতি।
যে সব কবিতাগুচ্ছকে কবি নিজেই বলেছেন, ডিমের ভেতর পৰিশাবকের মতো সুপ্ত সেইসব কবিতারাশি যেমন, নির্ঝরে স্বপ্নভঙ্গ কিংবা রাহুর প্রেম-এর কথাই যদি ধরি, তাহলে প্রেমময় মগ্নতার কোনও সূঁচাগ্র ফাঁকও কি আমরা খুঁজে পাই?
কী জানি কী হলো আজি, জাগিয়া উঠিলো প্রাণ
দূর হতে শুনি যেনো মহাসাগরের গান।
ওরে, চারিদিকে মোর
একি কারাগার ঘোর
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি
এসেছে রবির কর।
এখানে রবির কর সূর্যরশ্মি নয়, এখানে বোধকরি মহাজাগতিক প্রেমের কথাই বলেছেন কবি। যে প্রেম উদ্বেলিত করে, জাগিয়ে রাখে, দূরাভাসে ডাকে কাছে।
হেথা হথে যাও পুরাতন,
হেথায় নতুন খেলা আরম্ভ হয়েছে _
রবীন্দ্রনাথ বার বারই এভাবে জরাজীর্ণকে, সভ্যতার আবর্জনাকে এমনকি তার নিজের ভেতরের যা কিছু পুরনো সবকিছু দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। যে কোনও কবির জন্যই যা অত্যনত্দ প্রয়োজনীয়, শুধু কবি কেন, যে কোনও মানুষের জন্যই কি সেটা প্রয়োজনীয় নয়? প্রেমে যদি জাড্যতাই আসবে তাহলে আর সেই প্রেমে কি বা আৰেপ, কি বা সনত্দাপ। অধরের কানে যদি অধরের ভাষাই শোনা না যায়, তবে সেখানে ইঁটপাথরের কাঠখোট্টা শব্দের পরিধি জীবনকে কষ্টদায়ক এক গর্তেই ঠেলে দেবে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে প্রেম, পূজা, প্রকৃতি ইত্যাদি নানাপর্বে ভাগ করা হয়ে থাকে কিন্তুু সাধারণ পাঠকের কাছে এই বিভক্তি পীড়াদায়ক, কেননা রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি কবিতায়ই মানুষ প্রেম চাইলে প্রেম, পূজার্ঘ্য চাইলে তাও কিংবা কেউ যদি প্রকৃতিকে খুঁজতে চান তাহলে তাও পাবেন। গবেষকের কাছে হয়তো এরকম পর্ব ভাগের মূল্য রয়েছে কিন্তু সাধারণ্যের কাছে এই বিভক্তি নিতানত্দই গৌন।
প্রথম দিকককার রচনাকে যদি কবি নিজেই উড়িয়ে দিয়ে থাকেন তাহলে কড়ি ও কোমল, মানসী ও সোনার তরীকে কবির প্রেমময় কবিতাবলী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন গবেষকগণ।
"সমাজ সংসার মিছে সব
মিছে এ জীবনের কলরব
কেবল অাঁখি দিয়ে, অাঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি-অনুভ
অাঁধারে মিশে গেছে আর সব"
আসলে অল্পকথায় রবিকে ধরা অসম্ভব, আমি সেই চেষ্টাও করবো না। আজকে রবি কবির জন্মদিনে নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া কিছু ভাবকে ভাষা দিতে চাইছি মাত্র। তাও রবিরই ভাষায়_
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে
সব সঙ্গীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া
যদিও সঙ্গী নাহি অননত্দ অম্বরে
যদিও কানত্দি আসিছে অঙ্গে নামিয়া
মহা-আশঙ্কা যপিছে মৌন মনত্দরে
দিক্-দিগনত্দ অবগুন্ঠনে ঢাকা
তবু বিহঙ্গ বিহঙ্গ মোর
এখনই, অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা
রবি ঠাকুর এভাবেই তার কবিতার পাঠককে প্রেমে প্রাজ্ঞ করে তোলেন। শুধু মানবিক প্রেম নয়, প্রকৃতি ও ঈশ্বরকেও তিনি প্রতিষ্ঠা করে দেন মানবাত্মার মাঝে।
তোমারেই যেনো ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শতবার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।
চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার
কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার
জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার _ এই প্রেমের পাত্রখানি প্রিয় হয়ে প্রিয়, প্রেয়সী হলে প্রেয়সী, কিংবা জন্মভ্থমি হলেও কি কারো আপত্তি থাকবে কিংবা যদি ঈশ্বর হয়? তাহলে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের মাঝে যে দেশপ্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করে দেন তার তুলনা পাওয়া ভার। বিশেষ করে নিজের দেশের মাটিকে তিনি সোনার চেয়েও খাঁটি বলে যখন তাতে সুরারোপ করেন তখন সেই সত্যিকে ঠেকিয়ে রাখা কারো পৰেই আর সম্ভব হয় না।
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
ওগো মা তোমায় দেখে দেখে অাঁখি না ফেরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে
ওগো মা.....
রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে খুলে দেন অনত্দরাত্মার সমসত্দ আকুতি, সমসত্দ দরোজা। আমরা সেই দরোজা দিয়ে প্রবেশ করে দেখতে পাই অপূর্ব এক সাজানো বাগান। যেখানে রঙ খেলা করে অপরূপ সমন্বয়ে, প্রকৃতি সেখানে উচ্ছল, প্রেম সেখানে দেহাশ্রিত ও দেহাতীত এবং দোঁহে মিলে যে জীবন আমরা পাই তা এক কথায় অভ্থতপূর্ব। যে কারণে রবীন্দ্রনাথ পাঠে আমাদের কানত্দি আসে না কখওনই।
তাইতো তিনি আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেন এভাবে
ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছো বারে বারে
দয়াহীন সংসারে
তারা বলে গেলো ৰমা করো সবে বলে গেলো ভালোবাসো
অনত্দর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো
বরনীয় তারা স্মরণীয় তারা তবুও বাহির দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমালোচকদের মুখে সবচেয়ে বড় যে সমালোচনাটি শোনা যায় তাহলো তিনি হচ্ছেন ভ্থস্বামী কবি, অর্থাৎ তাকে বুর্জোয়া আখ্যা দিয়ে সাম্যবাদীরা এক ধরনের বিমল আনন্দ লাভ করে থাকেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে কিংবা প্রবন্ধে বার বার মানুষের মাঝের সীমাবদ্ধ সামাজিক সম্পর্ককে অস্বীকার করেছেন। আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি দুই বিঘা জমি কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন ক'টি
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি
রাজার হসত্দ করে সমসত্দ কাঙালের ধন চুরি
কোনও সাম্যবাদী কিংবা বামপন্থীর উক্তি হিসেবে হয়তো অনেকেই কথাটিকে ধরে নিতে পারেন অনায়াসে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার জন্ম পরিচয়ের জন্য জমিদারশ্রেনীর প্রতিভ্থ হলেও তিনি যে সাধারণ্যেই ছিলেন আজীবন, ব্যক্তিগত বিলাস-বসন তার কাছে তুচ্ছ ছিল বলেই তিনি আজীবন শুধু লিখেই গিয়েছেন, জমিদারির ব্যবসা তার দ্বারা হয়নি, বরং তিনি ধীরে ধীরে সমসত্দটাই খুইয়েছেন।
জীবন সায়াহ্নে এমনকি মৃতু্যর বিছানায় শুয়েও রবি ঠাকুর আমাদেরকে শুধু দিয়েই গিয়েছেন। প্রথম দিনের সূর্য কবিতাটি স্মরণ করি আসুন।
প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নতুন আবির্ভাবে
কে তুমি?
মেলেনি উত্তর।
বৎসর বৎসর চলে গেলো
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিলো
পশ্চিম সাগর তীরে
নিসত্দব্ধ সন্ধ্যায়
কে তুমি?
মেলেনি উত্তর।
সত্যিই তো কে আমরা , কি আমাদের পরিচয়, কোনও কিছুই প্রশ্নের অতীত নয়, সবই প্রশ্নাধীত। আসুন আমরা রবি ঠাকুরের জন্মদিনে নিজেদের এই পরিচয়টিই খোঁজার চেষ্টা করি।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শৌমচৌ-এর লেখাটি পড়ে বলতে চাই, আসলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চর্চায় বিরক্তি উৎপাদনের কি আছে? বিরক্তি তো হীনমন্মন্যতার জন্ম দেয়, তবে সুখের কথা হলো শৌমচৌর বিরক্তি স্থায়ীত্ব পায়নি, তার সাময়িকত্ব শেষ হয়েছে প্রেমে। কিন্তু দুঃখজনক সত্যি হচ্ছে, তথাকথিত বাংলাদেশী নামক নব্য মুসলিম শ্রেণীজ রবীন্দ্রনাথকে যেনো ঠিক ধরতে পারেন না, অধরাকে ধরতে না পারার কষ্টেই হয়তো তারা রবীন্দ্রনাথকে খানিকটা অবজ্ঞা করতে চান। কিন্তু তাতে তাদের অজ্ঞতাই ফুলেফেঁপে ওঠে। তাদের এই অজ্ঞতা আসলে সাতচলিস্নশের ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদী চরিত্রের লেগেসি, তাদের পাকিসত্দানী ভায়েরা মেরে ও মারখেয়ে চলে গেলেও এই নব্য বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদীদের মাঝে বেশ সুন্দরভাবেই সেই বীজটি বপন করে গিয়েছেন। যে কারণে এখন সরকারীভাবে রবীন্দ্রজয়নত্দী পালিত হয় বেশ অবহেলাভরেই। তবে দুর্জনের অবহেলায় কি বা এসে যায়!!
শুরম্নতেই যা বলেছি, শেষও করছি সেখানেই _ যদি কোনও ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাস স্থাপন করতাম, তবে সেটা নির্ঘাত সঞ্চয়িতাই হতো; যদি কোনও প্রেরিত পুরম্নষের বাণীতে আস্থা জন্মাতো তবে তাও হতো গীতবিতান; শত কষ্ট আর অযুত আঘাতে এখনও এর কাছেই হার মানি, নিজের আত্মাকে বন্ধক রেখেছি এদেরই কাছে। এতে যদি রবীন্দ্রপ্রেমের বাড়াবাড়ি ঘটে, তবে তাই-ই হোক।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০০৬ বিকাল ৫:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




