
রিফ্লেক্সন জার্নাল- ০১.১১.২০১৫
রাত- ৮:৪০
সামিরা চৌধুরী
পার্থ আজ আমাকে বললো,
-সামিরা আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভীষন ভালোবাসি। তোমাকে যে আমি এত ভালোবাসি, আমি আগে সেটা বুঝিনি। আমি জানতাম না। আসলে আমি এইভাবে আগে কখনও ফিল করিনি বা বুঝতে পারিনি, যে তোমাকে আমি এত ভালোবাসি। সামিরা তোমার এতটুকু কষ্ট বা দুঃখ আমি মানতে পারবোনা।
পার্থ গড়গড় করে বলেই চললো আরও কত কিছু। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে। এইভাবে কখনও কোনোদিন পার্থ আমাকে বলেনি যে সে আমাকে ভালোবাসে। বরং ওর উদাসীন্যতা, নিরাবেগ, কথায় কথায় আমার সব কিছুতেই অনিচ্ছা, অনীহা আমাকে শুধু কনফিউজ করে তুলেছিলো। আমি ভাবতাম আমার ভালোবাসাটা এক তরফা। পার্থ আমাকে কখনই ভালোবাসেনি, ভালোবাসেও না। ও যদি আমাকে ভালোবাসতো তো আমার আবেগের মূল্য দিত। আমার পছন্দ অপছন্দ দুঃখ বেদনাকে সে এইভাবে অবহেলা বা উপেক্ষা করতে পারতোনা। না পার্থ এসব এখন আবেগের বশে বলছে। আসলে পার্থ কখনও আমাকে ভালোবাসেনি। কোনদিনও না।
আমার মনে পড়ে সেবার মাসুদ আর নীতু যেদিন কোর্টে গিয়ে বিয়ে করলো। পার্থ ওদের সাক্ষী হয়েছিলো। সারাটাদিন উধাও হয়ে ছিলো সে। শুধু সে দিনটিই নয় গুনে গুনে আড়াইটাদিন পর শেষ পর্যন্ত ফোন রিসিভ করেছিলো পার্থ। দুঃশ্চিন্তা আর উদ্বেগে তখন আমি আধা পাগলপ্রায়। আড়াইদিন পর ফোন ধরে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম। আমার সে কান্নায় ছিলো অভিমান, কষ্ট, একরাশ অপেক্ষা আর এক হৃদয় ভালোবাসা। কিন্তু পার্থ সেসব পাত্তাই দেয়নি। আমলে নেয়নি আমার কোনো রকম আবেগকেই। সে একটাবারের জন্যও ভাবেনি আমি যে এত দুশ্চিন্তা করতে পারি। এ ঘটনা নিয়ে এর পরেও অনেকবার আমি ওকে বলেছি। ওর ভেতরে দুঃখবোধ বা দোষী ভাবটা যাচাই করতে চেয়েছি। কিন্তু না, ওর আচার আচরণ, হাব ভাব বা ব্যবহারে ছিলোনা কোনো অপরাধবোধ বা আমার প্রতি ভালোবাসা। আমি অবাক হয়ে ভাবি, কি করে পার্থ এত উপেক্ষা করে আমাকে?
আমার মনে পড়েনা আমার জীবনে কখনও কোনোদিন কেউ আমাকে এতটুকু উপেক্ষা করেছে। খুব ছোটবেলায় মাকে হারানোর কারণে বাবার ভালোবাসার বাড়তি উপচে পড়া বাড়াবাড়িটুকু ছাড়া বরং কোনোদিন তাতে কোনো কমতি ছিলোনা আমার। দাদাবাড়ি, নানাবাড়ি এমনকি স্কুল, কলেজের টিচাররা হতে বন্ধু বান্ধবীরা কেউ কখনও উপেক্ষা করেনি আমাকে। অবহেলার তো প্রশ্নই ওঠেনা। অথচ পার্থ কি উদাসীন নির্লিপ্ততায় উপেক্ষা করে যায় আমাকে। আমি এর আগে অনেকবার ওর সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে থেকেছি। পার্থ কোনোদিন আসেনি আমার রাগ ভাঙ্গাতে। সে কোনোদিন যেচে কথা বলতে আসেনি, ও ধরেই নিয়েছে, ভালোবাসা ব্যাপারটা শুধুই আমার থেকে ওর প্রাপ্য। আমার জন্য ওর কোনো দায়িত্বই নেই।
প্রথম বছরে ওর সাথে সম্পর্কের শুরুতেই কিছুদিনের মাঝে আমার বার্থডে ছিলো। সেদিন রাত ১২টা হতেই জন্মদিনের উইশে ভরে গিয়েছিলো আমার ফেসবুক ওয়াল, টেক্সট, এমনকি ভার্সিটিতে বন্ধুরা কেক কেটেছিলো পরদিন সকালে। অথচ পার্থ কোনো উইশও করেনি আর সেই কেক কাটবার আরও অনেক পরে সে সেই আড্ডায় উপস্থিত হয়েছিলো। আমার চোখ ফেটে সেদিন জল এসে গিয়েছিলো। তবুও আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করেছিলাম। নিজেকে সান্তনা দিয়েছিলাম। পার্থ আর সবার মত না। আর দশটা মানুষ থেকে সে স্পেশাল আর তাই তো হি ইজ সো স্পেশাল টু মি। নিজেকে আজ প্রচন্ড বোকা মনে হয় । প্রচন্ড বোকা একটা মেয়ে আমি। আমার লজ্জা হওয়া উচিৎ।
আমি আমার জীবনে এমন বোকার মত কাউকে ভালোবাসবো কখনও ভাবিনি আগে। পার্থকে দেখার পর আমার কি যে হলো। ওর অদৃশ্য নিরাবেগকে আমার ভালোবাসার জালে আটকে ফেলার এক অদম্য আগ্রহ জন্মালো। আমার ধারণা ও যদি আমাকে এত উপেক্ষা না করতো বা আমার প্রতি ওর ঔদাসিন্যতা না দেখাতো তো আমি নিজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলতাম ওর উপরে। আমার মাথা কাজ করেনা। ভাবি আমি কি তবে ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলাম?
পার্থ আজ কাঁদছিলো। যা এত বেশী বৈপরীত্য মানে ওর চরিত্রের সাথে বেমানান যে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিলোনা। আজ যে কফিশপটাতে বসেছিলাম আমরা একটু পরে সেখানে সিলভিয়া আসলো। পার্থ হয়তো ওকেও ডেকেছিলো। সিলভিয়া এসে আমাকে কি সব বলতে চাচ্ছিলো। কোনদিন কি হয়েছে না হয়েছে । আমি অনেক হাসছিলাম। আমি সিলভিয়াকে বললাম, বোকা মেয়ে কবে কার কোন স্বপ্নের কথা বলতে এসেছো তুমি? সিলভিয়া আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলো যেন আমি কোনো ছিটগ্রস্ত মানুষ। কিংবা আমার সাথে উনি আগের আমিকে মিলাতেই পারছেন না। আমি মনে মনে খুব হাসছিলাম । কেনো হাসছিলাম সে কথা না হয় কেউ কোনোদিন নাই বা জানলো। মানুষের কিছু একান্ত কথা থাকা উচিৎ যা শুধু থাকবে তার একান্ত আপন। নিজের সাথে নিজের কথা। যা সে কখনও কাউকে বলবেনা, যা সে কখনও নিজের ডায়েরীতেও লিখবেনা । পৃথিবীর কোথাও প্রকাশিত হবেনা সেই গোপন দুঃখ বা সুখের ছোট গল্প বা বৃহৎ উপন্যাস।
আমারও এমন কিছু দুঃখ আছে। বা একান্ত নিজের কথা। যা আমার একান্ত লজ্জা, ভয় বা অকৃত অপরাধবোধ। হ্যাঁ নিজে অপরাধ না করেও আমাদের বাংলাদেশের মেয়েরা, না শুধু বাংলাদেশ বলছি কেনো তাবৎ বিশ্বের মেয়েরাই নিজে অপরাধ না করেও অনেক ধরণের অপরাধবোধে ভোগে। ভুল অপরাধবোধ। সমাজ তাদের মুখে এমনই এক কুলুপ এটে দেয়। দ্বিধা, দ্বন্দ বা সামাজিক বিধি নিষেধের কুলুপ। তারা সেসব গোপন দুঃখ বা অপরাধবোধ একান্তে পুষে রাখে। যা কখনও কোথাও প্রকাশ পায়না বা যা কখনও কোনোদিন তারা মুখ ফুটে বলতে পারেনা। প্রতিবাদ, সে তো অনেক দূরের কথা।
আমার একান্ত কথাগুলোও অপ্রকাশিত থেকে যাক এই পৃথিবীর তুচ্ছ এবং ক্ষুদ্র এক অণু পরিমান ধুলিকনার কাছেও। হোক সেসব অপ্রকাশিত কথন। সে শুধু জানবো আমি আর জানবে আমার তৃষিত হৃদয়।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



