‘কোথাও কেউ নেই’ নামের একটি নাটক লিখেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বিটিভিতে ব্যাপক জনপ্রিয় সেই নাটকের চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে ঢাকাসহ সারাদেশে মিছিল হয়েছে। কল্পকাহিনীর নাটকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে দেশের মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে সেই মানুষ এখন গুম, খুন, অপহরণ, অনিশ্চয়তায় ঘরের মধ্যে বসে থাকে। চোখের সামনে আগুন দিয়ে জনপ্রিতিনিধিকে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য দেখে চোখের পানি ফেলে ঘরে ঢুকে কপাট বন্ধ করে নিজের অনুরূপ পরিণতির আশঙ্কা করেন।
কবি-সাহিত্যিকরা রাজনীতির বাইরে নন। হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখা রচনা করেছেন। লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও ‘আয়না’ নামের উপন্যাস। হুমায়ূন আহমদ যদি বেঁচে থাকতেন এবং তাকে রাজনীতি নিয়ে কোনো লেখা লিখতে বলা হতো তাহলে তিনি অনায়াসে লিখে ফেলতেন ‘কোথাও নেই বিএনপি’ নামের রাজনীতির নয়া উপন্যাস। মানুষ গোগ্রাসে গিলতো সে লেখা। বই মেলায় লাইনে দাঁড়িয়ে পাঠকরা বই কিনতেন। দেশে ৪২টি নিবন্ধিতসহ দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক দল দু’টি হলো আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে আওয়ামী লীগ এখন সরকারে। অন্য দল বিএনপি? কোথায় আছে বিএনপি? সরকারে নেই, নেই জাতীয় সংসদের বিরোধী দলে। বোঝার সুবিধায় মাঠের বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে ধরা হলেও মাঠে তারা নেই। ১৯ দলীয় জোট গঠন করা হয়েছে আন্দোলন গড়ে তুলতে; সেই শরিক দলগুলোর বিশ্বাসের মধ্যেও নেই। জনগণ, আলেম-ওলামা, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী এমনকি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের ‘মনের’ মধ্যেও নেই। দেশের নৈরাজ্যকর অবস্থায় খুন-গুম বেড়ে যাওয়ায় তাঁতিয়ে রাস্তায় নামা মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশেও নেই। ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী আর মন্ত্রী-এমপিদের খিস্তি-খেউরের জবাব দেয়ার ক্ষমতাও দলটির নেই। কর্মসূচি দিয়ে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে সরকারের অনুমতির অপেক্ষায়। অফিসিয়াল টাইপের সংবাদ সম্মেলন আর প্রেস বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে দলটির সব কার্যক্রম। নিত্য সংবাদ সম্মেলন (পরিশ্রমহীন) আর প্রেস রিলিজের মধ্যেই কী আটগে গেলো বিএনপি? অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশে প্রেস রিলিজনির্ভর অনেক দল রয়েছে। সেগুলো নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা নেই। আবার রাজনীতির মাঠ কখনো ফাঁকা থাকে না। সময় নেতা বানায় রাজনীতিতে জোয়ার ভাটার সৃষ্টি করে।
দেশের সার্বিক অবস্থা কী? গতকাল (৩১ মে) ৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মানুষ কি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন তা নারায়ণগঞ্জের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সেভেন মার্ডারের পর অসংখ্য মানুষ নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় বসবাস করছেন। যাদের ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে নিরাপদে (!) বসবাসের আর্থিক সংগতি নেই তারা নিজ বাসায় কুঁকড়ে মরছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়; সারাদেশে প্রায় একই অবস্থা। মানুষ স্বাভাবিক মুত্যৃর গ্যারান্টি চায়। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে মাঠে নামতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু দেশের শতকরা ৭০/৭৫ ভাগ মানুষ যে দলের পক্ষে থাকতে চায় সেই দলের নীতি নির্ধারকরা কী জনগণের সেই ভাষা বুঝতে পারছেন? দেশে শত শত কবি সাহিত্যিক রয়েছেন। তারা প্রতিবছর হাজার হাজার বই রচনা করেন। সবার লেখা পাঠকরা পড়েন না। পড়েন হুমায়ূন আহমেদের লেখা। বই মেলায় হাজার হাজার গ্রন্থ থাকলেও পাঠকরা খোঁজ করেন হুমায়ুনের বই। কারণ ওই বইয়ের লেখায় মানুুষের হৃদয়ের কথা থাকে। মানুষের মন ছুঁয়ে যায়, মনকে নাড়া দেয়। মানুষের কথা-ভাবনা, সমাজের চিত্র হুমায়নের বইয়ে তুলে ধরায় পাঠকরা সেদিকেই ছোটেন। কিন্তু বিএনপি কী জনগণের ভাষা বুঝতে পারছে না? শীর্ষ নেত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে রাজধানীর নেতাকর্মীরা না নামলেও সারাদেশের মানুষ তো নেমেছিল। স্বর্তঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নামার খেসারত তাদের দিতে হবে কেন? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সৈনিক ছিলেন। রাজনীতি করতেন না। তিনি যখন রাজনীতিতে নামেন এবং ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ধারা নিয়ে রাজনীতি করে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জিয়াউর রহমান জনগণের ভাষা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে দলীয় কর্মকা-কে একাকার করে ফেলেছিলেন। জনগণ তাকে সে ভাবেই গ্রহণ করে। সেই শহীদ জিয়ার গড়া বিএনপির এখন একী হাল? কৃষকদেরও ফসলের চাষাবাদের আগাম পরিকল্পনা থাকে। কোন জমিতে ধান কোন জমিতে পাট লাগাবেন সেটা পরিকল্পনা করেন তারা। ’৯০ এর পট পরিবর্তনের পর তিন বার সরকার গঠন করা রাজনৈতিক দল বিএনপির আগামী দিনের পরিকল্পনা কী? জনগণকে নিয়ে তাদের ভাবনা কী? জনগণের কল্যাণ বাদ; শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি হলেও সে রাজনীতির ছক লাগে, পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে। নেতানেত্রীদের রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রয়োজন হয়। বিএনপির কী সেটা আছে?
ড্রাইভিং সিটে বসা ব্যক্তির ডেসটিনিটি ঠিক থাকলে উঁচু নীচু, পাহাড় পর্বত, সাগর বন ডিঙ্গিয়ে ঠিকানায় পৌঁছা সম্ভব। দেশের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সবাই অবগত। এ অবস্থায় জাপান থেকে ফিরে এসে ৩১ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে অবলিলায় বললেন, ‘জামায়াতের বিচার নিয়ে এতো হৈচৈ ও অস্থিরতার কী আছে? ‘বিএনপিকে আমরা ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি। মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলে খুনি ও দুর্নীতিবাজরাই লাভবান হবে।’ ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি যাতে কার্যকর না হয় সে জন্য বান কি মুন, জন কেরি ফোন করেন। দেশে কে আছে এসব ফোনের পর ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে? জীবনের প্রতি মায়া রেখে রাজনীতি করি না। দেশের জন্যই রাাজনীতি করি’। ‘মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা দেয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই হঠাৎ কিছু লোক ক্রেস্টে সোনা না দেয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে মায়ের গহনা বানালেও স্বর্ণকার সেখান থেকে একটু সোনা চুরি করে। বিদেশি বন্ধুদের দেয়া ক্রেস্টে সেনা কতটুকু ছিল সেটা বড় কথা নয়; ওনাদের এনেছি সম্মান দিয়েছি সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, ফেনীর নৃশংস ঘটনা, র্যা ব তিন সদস্যকে আদালতের গ্রেফতারের নির্দেশনা, নূর হোসেনকে পালিয়ে যেতে শামীম ওসমানের সহায়তা, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে না পারায় উল্টো বিএনপিকে দোষারোপ করলেন। বিএনপিকে হাইব্রিড দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কথাও বললেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ়চিত্ত বক্তব্য আর অভিযোগের জবাব বিএনপি কিভাবে দিল? বাঘের গর্জন কী বিড়ালের মিউ মিউ ছাপিয়ে ফেলতে পারে? মিউ মিউ করে দেয়া এ জবাবে দেশবাসী দূরের কথা বিএনপির নেতাকর্মীরাও আশাহত। সেনাবাহিনীর সৈনিক জিয়া রাজনীতিতে এসে জনগণের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। তার দলের প্রায় অর্ধেক নেতা এখন জনগণ দূরে থাকুক একে অন্যকে চেনেন না। জনগণের ভাষা বোঝেন না। মিয়ানমারের বিজিপি বাংলাদেশের এক সীমান্ত রক্ষীকে হত্যা করলো। সীমান্তে গোলাগুলি হলো। বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে প্রায় নিত্যদিন গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। তিনবিঘা করিডোর, তিস্তার পানি, বিদ্যুৎ ট্রানজিট, সিটমহল সমস্যা, টিপাই মুখে বাঁধ, ফাঁরাক্কা ইস্যুসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদের অমিমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বিএনপির অবস্থান কোন পর্যায়ে রয়েছে, দেশের মানুষ দূরের থাক দলের নেতাকর্মী ও ১৯ দলের শরীক দলগুলোও তা বুঝতে পারছে না। অথচ ‘বিএনএফ’র মতো ভুঁইফোড় দলও ভারত সম্পর্কে নিজেদের ‘শক্ত অবস্থান’ তুলে ধরেছে। নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দনের প্রতিযোগিতা কী বিদেশীদের অনুকম্পায় শুধু নিছক ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য? ভারত বাংলাদেশ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী অনেককিছু সাফল্যের দাবি করেছেন। এসব দাবির অধিকাংশ যে ‘উড়ো’ সে অভিযোগও করার সাহস দেখাতে পারছে না বিএনপি। রমজান আসছে। শতকরা ৯০/৯২ ভাগ মুসলমানের এই দেশে রমজানকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ে। সে সুযোগ কী নিতে পারবে বিএনপি? ‘সময় দিলাম’ ‘আন্দোলনের মৌসুম আসুক’ ‘দল গুছিয়ে নিই’ ‘আরেকটু পঁচুক’ এগুলো ভেক কথা। ১৯ দলীয় জোটের শরীক দলের এক সিনিয়র নেতা দুঃখ করে বলেছেন, বিএনপির তরুণ নেতাকর্মীরা কিসের রাজনীতি শিখবে? ওদের অফিসে রাজনীতি নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। অফিসে যা হয় সেটা হলো একে অন্যকে ল্যাং মারা, অন্যের বিরুদ্ধে কুৎসা, চাঁদাবাজি, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে থাকার কর্মকৌশল, আর নেতানেত্রীদের গুণকীর্তন। দলের অফিসে সর্বদা এসব চর্চা করে আর যাই হোক রাজনীতি শেখা যায় না।
আবেগ দিয়ে যেমন ‘আইনের শাসন চলে না’ তেমনি সরকারের অনুমতি নিয়ে ‘রাজপথের আন্দোলন হয় না’। এই দৃঢ় সত্য যেন উধাও হয়ে গেছে। সরকার খেয়াল খুশিমতো আবেগ দিয়ে দেশ শাসন করছে; আর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বিএনপি মিটিং মিছিল করতে সরকারি অনুমতির কাঙ্গাল হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো শেখ হাসিনা আর বেগম খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে দেশে গড়ে উঠেছে রাজনীতির দুটি বৃত্ত। মাঝেমধ্যে পরিবর্তন, তৃতীয় ধারা, বিকল্প শক্তি ইত্যাদি উচ্চবাচ্য শোনা গেলেও এখনো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মানুষ দুই শীর্ষ নেত্রীকে নেতা মানেন চেনেন। নির্বাচন এলে তাদের ভোট দিয়ে পালাক্রমে মসনদে বসান। ’৯০ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই চিত্রই দেখে আসছে মানুষ। এখনো টেলিভিশনের টক শো থেকে শুরু করে ব্লগ, টুইটার, ফেসবুক এবং গ্রামগঞ্জের মানুষ দুই নেত্রীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন বিতর্ক করেন। অনেক বাঘা বাঘা নেতা চেষ্টা করেও এর ব্যত্যয় ঘটাতে পারেননি। ব্যাপক জনপ্রিয় এবং দেশের শতকরা প্রায় ৭০/৭৫ ভাগ মানুষের সমর্থন থাকার পরও কৌশলের অভাব আর সিদ্ধান্তের দৃঢ়তার অভাবে বিএনপিকে সভা সমাবেশের জন্য সরকারের করুণার উপর নির্ভর করতে হয়। গার্মেন্টস কর্মীরা রাজপথে মিছিল করে, শিক্ষাবিদ জাফর ইকবাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শহীদ মিনারে অনশন করেন, অথচ বিএনপি পথে মিছিল করার সাহস পায় না। বিক্ষোভ করে প্রেসক্লাবের হলরুমে। ‘শক্তের ভক্ত নরমের জম’ বহুল প্রচারিত প্রবাদটির কথা যেন ভুলে গেছেন বিএনপির নেতারা। রাজনীতিতে ‘সাহস’ যে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেয় তা নিত্যদিন বুঝিয়ে দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাহস না থাকলে, জনগণের প্রত্যাশা বুঝতে না পারলে শাসকদের অনুকম্পায় আন্দোলনের চেষ্টা আর যাই হোক মাঠের রাজনীতি হয় না। ঢাকার সিনেমার একটি গানের কলি ‘তুমি আছো সব আছে/ তুমি নেই কিছু নেই’। বিএনপিকে জনগণকে বুঝতে হবে; জনগণের ভাষা বুঝে কর্মসূচি দিতে হবে। জনগণের ভাষা বুঝতে না পারলে জনগণ বিএনপির পাশে থাকবে না। ‘সময় হলে দেখে নেব’ মানসিকতা থেকে ‘আওয়ামী লীগের পচন’ ধরার অপেক্ষায় বিএনপি থাকলে দলটির অবস্থা ঢাকাই ছবির গানের মতো ‘তুমি আছো ---- নেই’ হবে। কারণ জোয়ার ভাটার এই দেশে জনগণের প্রত্যশা কোনো একটি দলের প্রতি স্থির থাকে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




